ফাঁদ / তারিফ আলম

20th September 2023 7:15 pm তারিফ আলম
ফাঁদ / তারিফ আলম


ফাঁদ
লেখা – তারিফ আলম


তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।
হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।
বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।
বাস টা ১ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।
কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?
বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।
রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।
রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।
রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।
আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।
ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।
রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।
...........................সমাপ্ত ......................





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?