বেদনা / তারিফ আলম

20th September 2023 7:12 pm তারিফ আলম
বেদনা / তারিফ আলম


বেদনা
লেখা – তারিফ আলম

 


আজকে সুনিতা বাড়ী আসতে পারবে না তা ফোন করে মৃণালকে জানিয়ে দিয়েছে । হাসপাতালে এমনিতে ডাক্তার এর অভাব , তাই নার্স হয়েও সুনিতাকে অনেক সময় ডক্টরদের কাজ করতে হয় । রোগী এত বেশি আর নার্স এত কম যে সুনিতাকে বেশির ভাগ সময় নাইট এও ডিউটি করতে হয় । ৬ বছরের ছেলে বুবাই কে একদম টাইম দিতে পারে না , মা হিসাবে ঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করে নি বলে মনে খুব কষ্ট হয় । কিন্তু হাসপাতালে আসা দুঃস্থ রোগীদের সেবা করে নিজের আপনজন ভেবে । মৃণাল এর সাথে কলেজ থেকে প্রেম । সুনিতা নার্স এর চাকরিটা পেয়ে যাওয়ার পর মৃণালকে বিয়ে করে । তখন মৃণাল অবশ্য বেকার ছিল । কিন্তু মৃণাল ২০১৬ তে এ শিক্ষক এর চাকরি পেয়ে যায় । তারপর থেকেই মৃণাল চাপ দিতে থাকে সুনিতাকে নার্স এর চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার জন্য । কিন্তু সুনিতা মানুষের সেবা করার এই কাজটা কিছুতেই ছাড়তে চাই নি । হাসপাতালে আসা অসুস্থ মানুষ জন যখন কষ্টে থাকেন তখন তাদের সেবা করে সুস্থ করে তাদের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিয়ে এক অজানা আনন্দে মন ভরে যায় সুনিতার । অবশ্য স্বামী আর ছেলেকে টাইম দিতে পারে না বলে মনে কষ্টও হয় তার ।
হাসপাতাল এর চেয়ারম্যান কে বলে রেখেছে সুনিতা ৭ দিনের ছুটির জন্য । ছেলের চার দিন পর বার্থ ডে । তাই কিছুদিন পরিবারের সাথে সময় কাঁটাতে চায় । 
কিন্তু কয়েকদিন থেকে একটি নতুন মারন ভাইরাস এর প্রকোপ দেখা দিয়েছে । মানুষের মধ্যে জ্বর হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে তার দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে । ফলে রোগী মারা যাচ্ছে । একে নিপা ভাইরাস বলে । এটি খুবই ছোঁয়াচ্ছে অর্থাৎ এক জনের দেহ থেকে অন্য জনের দেহে ছড়িয়ে যায় খুব সহজে । তাই ডক্টর রা সকলে পুরো শরীর ঢেকে রোগীর চিকিৎসা করে । 
একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে । ডক্টর রা অনুমান করছেন যে সে নিপা ভাইরাস এ আক্রান্ত হয়েছে । ১৭ বছরের একটি ছেলে । নাম দিনু । পরিবারের লোক জন সবাই হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে । কেউ আর আসে নি । দিনু কে একটি ঘরের মধ্যে রাখা হয়েছে সব জানালা দরজা বন্ধ করে ।
গভীর রাতে সুনিতা শুনতে পেল পাশের ঘর থেকে কেউ চিৎকার করছে । ওখানেই দিনুকে রাখা হয়েছে । বেচারা কষ্টে চিৎকার করছে । জানালা টা একটু খুলার চেষ্টা করে সুনিতা । কিন্তু পারলো না । খুব শক্ত করে লাগানো । অগ্যতা চাবি নিয়ে দরজার তালা খুলে জিজ্ঞাসা করে কি কষ্ট হচ্ছে ।
দিনু কাঁদতে কাঁদতে বলে-“ একটু জল দেবেন দিদি , আর পারছি না। গলা শুকিয়ে গিয়েছে ।“
সুনিতার খুব মায়া হল । সে নিজের রুম এ গিয়ে ভালো করে সারা শরীর ঢেকে পোশাক পরে একটা বোতলে জল নিয়ে দিনুর রুম এর মধ্যে প্রবেশ করলো । দিনু ব্যাডে শুয়ে কাঁদছিল । 
সুনিতা খুব যত্ন করে তাকে জল খাওয়াতে লাগল । এমন সময় হটাত দিনু দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে সুনিতাকে , আর বলতে থাকে – “ দিদি আমাকে এখন থেকে বের করুন । এখানে থাকলে আমি মরে যাবো “। 
সুনিতা দিনুর কাছে ছাড়া পেতে চেষ্টা করতেই টানা – টানিতে মুখের মাক্স খুলে গেল । কোন রকমে সুনিতা নিজেকে ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দরজায় তালা লাগিয়ে দিল । 
সুনিতা জানে দিনু কে বাঁচান সম্ভব নয় , সকালেই ডক্টর সরকার বলে দিয়েছেন । এখন শুধু তার মরার অপেক্ষা করা ছাড়া ঊপায় নেই । কারন কোন অসুধ এখনও আবিস্কার হয় নি এই রোগের । 
পরদিন সকালে সুনিতা খবর পেল যে দিনু মারা গিয়েছে । মন টা কষ্টে ভরে গেল । স্নান সেরে খাওয়া দাওয়ার পর আবার হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পূর্বে স্বামী মৃণালকে ফোন করলো । কিন্তু ফোন তুলল না কেউ । সুনিতা জানে মৃণাল এর একটু দেরি তে ঘুম থেকে উঠার স্বভাব । হাসপাতাল থেকে পরে ফোন করে নেবে ভাবল । 
হাসপাতালে পৌঁছে দ্রুত নিজের কাজে লেগে পড়ল সুনিতা । তার পাশের রুম টা এখন ফাঁকা । দিনুর শরীর এখন অন্য কোথাও রাখা হয়েছে । আজ সুনিতারও শরীর ভালো নেই । জ্বর এসেছে । তাই ওষুধ খেয়ে কাজে লেগে পড়েছে রোগীদের সেবায় । 
ডক্টর সরকার সুনিতাকে ডেকে বললেন , “ তোমার জ্বর এসেছে শুনলাম । রুপালী বলল”।
সুনিতা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো ।
ডক্টর সরকার সুনিতাকে পরীক্ষা করলেন । তারপর বললেন, “ তোমার ব্লাড টা টেস্ট করা খুব দরকার । যাও ব্লাড টা দিয়ে এসো “।
সুনিতা বলল , “ কেন স্যার , মেডিসিন নিয়েছি । ভালো হয়ে যাবে “।
ডক্টর সরকার কি একটা ভেবে নিয়ে বললেন – “ রক্ত টা পরীক্ষা করে নাও একবার । কিছু হয় নি , তবুও সাবধানতার জন্য “। 
যথারীতি ব্লাড পরীক্ষা করা হল সুনিতার । রিপোর্ট দেখে ডক্টর সরকার এর মুখটা শুকিয়ে গেল । অন্য নার্সদের আদেশ দিলেন সুনিতাকে যেন দ্রুত দিনু যে রুমে ছিল তাকে নিয়ে যাওয়া হয় । নার্স রা তাই করলো । সুনিতা খুব অবাক হয়ে ডক্টর কে জিজ্ঞাসা করলো – তাকে এই রুমে এনে রাখা হল কেন ?
ডক্টর সরকার খুব দুঃখের সঙ্গে জানালেন যে সুনিতার দেহে নিপা ভাইরাস ধরা পড়েছে ।
সুনিতা কথা গুলো শুনে চিৎকার করে কেঁদে উঠল – “ না , এ হতে পারে না স্যার , ভালো করে রিপোর্ট দেখুন “।
ডক্টর কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন । অন্য এক নার্স রুমে তালা লাগিয়ে দিল । 
এই রোগের পরিনতি যে মৃত্যু তা তার ভালো করেই জানা সুনিতার । ব্যাড এ শুয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগল ।
এমন সময় মোবাইল টা বেজে উঠলো । মৃণাল এর ফোন । সুনিতা অনেক কষ্টে কান্না থামিয়ে ফোন টা রিসিভ করলো ।
মৃণালঃ এই কোথায় আছো , ফোন রিসিভ করতে এত দেরি ।
সুনিতঃ ( ধীর গলায় ) হাসপাতালে । কাজ করছিলাম ।বুবাই কি স্কুল এ চলে গিয়েছে ?
মৃণালঃ না যায় নি , এই নাও বুবাই এর সাথে কথা বল। 
বুবাইঃ মা কেমন আছো ?
সুনিতা ছেলের গলার আওয়াজ পেয়ে নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না । কান্না বেরিয়ে এল । অনেক কষ্টে বলল – “ ভালো আছি “। 
বুবাইঃ মা , আমার জন্মদিনে আসছ তো । তুমি ছুটি নিয়ে আসবে বলেছিলে । আসছ না কেন ? তোমাকে ছাড়া আমার কিছু ভালো লাগে না । তুই চলে আসো না মা । 
ছেলেকে কি উত্তর দেবে তা বুঝতে পারছে না । ছেলের জন্মদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে । এই রোগ যাদের হয়েছিল তারা খুব তাড়াতাড়ি মারা গিয়েছে তাদেরই হাসপাতালে । নিজে নার্স , তাই রোগীদের সেবা করার কারনে তার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে । 
কাঁদতে কাঁদতে সুনিতা বলল –“ বুবাই , আমার বুবাই রে , আমি যদি না আসতে পারি তোর জন্মদিনে , তুই দুঃখ করিস না , তোর বাবাকে নিয়ে আর বন্ধুদের নিয়ে জন্মদিন পালন করিস “। 
বুবাই মায়ের কান্নার আওয়াজ পেয়ে নিজেও কেঁদে ফেলে । তারপর বলে , “ তুমি কেঁদো না মা , আমি জানি তুমি হাসপাতালে সব অসুস্থ মানুষদের সেবা করে তাদের ভালো করে তুলছ । গতবারের জন্মদিনে তুমি আসতে পারো নি বলে আমি খুব কেঁদেছিলাম সে দিন । এবারে আর কাঁদবো না । মা তুমি কেঁদো না প্লিজ । আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি “। 
সুনিতা আর কথা বলতে পারছে না , গলা শুকিয়ে আসছে । ফোন কাটার পূর্বে শুধু বলল – “ বুবাই , আমিও তোকে অনেক ভালোবাসিরে । তুই তোর বাবার সব কথা শুনবি । ভালো করে পড়াশুনা করবি যাতে একদিন তুই অনেক বড় ডাক্তার হতে পারিস “।
বুবাই কান্না জড়ানো গলায় বলে , “ হ্যাঁ মা, আমি ডাক্তার হবো , তোমার মত সকলের সেবা করবো “। 
সুনিতা ফোন টা কেটে দিল । গলা শুকিয়ে যাচ্ছে , কিন্তু রুমে একটুও জল নেই । এদিকে মোবাইলে চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় মোবাইল টাও সুইচ অফ হয়ে গেল । চিৎকার করে জল চাইলেও যে কেউ জল দিতে আসবে না তা বুঝতে পারলো । তাই সুনিতা ব্যাডে শুয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগলো ।
******************
................. ডক্টর সরকার ফোন করলেন মৃণালকে এবং দ্রুত হাসপাতালে আসতে বললেন । মৃণাল সুনিতাকে ফোন করলে সুনিতার মোবাইল সুইচ অফ বলল । বুবাইকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে এসে ডক্টর সরকারের সঙ্গে দেখা করে জানতে পারলো যে সুনিতার দেহে নিপা ভাইরাস প্রবেশ করেছে । তাকে আর বাঁচানো সম্ভব নয় ।
ডক্টর সরকারের কথা গুলো শুনে মৃণাল এর মাথায় যেন বাজ এসে পড়ল । সে মাটিতে সেইখানে বসে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ।
বাবার কান্না দেখে বুবাই কিছু বুঝতে না পেরেও সেও কাঁদতে লাগলো । 
ডক্টর সরকার মৃণাল এর কাছে এসে বলল ,” নিজেকে আপনি সামলান , আপনার ছেলের কথা ভেবে । আর আসুন শেষ বারের মত সুনিতার সাথে দেখা করে নেন “। 
কোন রকমে নিজেকে সামলে বুবাইকে কোলে নিয়ে ডক্টর সরকারের পিছন পিছন এসে থামল একটা বদ্ধ ঘরের কাঁচের জানালার সামনে । রুমের মধ্যে প্রবেশ করা যাবে না । ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে অন্য জনের দেহে । 
মৃণাল দেখল রুমের মধ্যে সুনিতা শুয়ে শুয়ে কাঁদছে । জানালার সামনে মৃণালকে দেখে অনেক কষ্টে বিছানা থেকে উঠে এসে জানলার পাশে এসে দাঁড়ালো , শরীরের সব শক্তি যেন শেষ হয়ে এসেছে সুনিতার , নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ।
মৃণাল আর বুবাই কে দেখে কাঁদতে লাগলো সুনিতা জোরে জোরে । কিন্তু আওয়াজ আসছিল না । ছয় বছরের ছেলে বুবাইও মাকে দেখে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কাঁদতে লাগলো । মৃণালও নিজের চোখের জল আটকাতে পারছিল ণা । 
ওইখানে উপস্থিত সকল নার্স আর ডাক্তারদের চোখেও জল চলে এল । কিন্তু কোন উপায় যে নেই । সবই বিধাতার লেখা । এই মারন রোগের কোন ওষুধই যে নেই । 
মৃণাল দেখল সুনিতা রুমের মধ্যেই পড়ে গেল । মৃণাল ছুটে এসে ডক্টর সকারের পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল , “ ডক্টর আমার সুনিতা কে বাঁচান । যত টাকা লাগবে আমি দেব । প্লীজ ডক্টর “।
ডঃ সরকার কিছু না বলে নার্সদের বললেন মৃণাল আর বুবাই কে বাইরে নিয়ে যেতে । তারা তাই করলো । 
বাইরে মৃণাল বুবাই কে নিয়ে বসেছিল অধীর অপেক্ষায় ।
ডক্টর সরকার কিছুক্ষন পর গম্ভীর মুখ নিয়ে এসে বললেন “ sorry “
মৃণাল বুবাইকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ভেউ ভেউ করে  কাঁদতে লাগলো । 
বিধাতার কাছে মানুষ যে কত অসহায় – তা আর একবার প্রমান হয়ে গেল ।
.............................. সমাপ্ত ..................

 





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?