টিউশন ( ছোটগল্প ) / তারিফ আলম

3rd September 2023 11:22 am তারিফ আলম
টিউশন ( ছোটগল্প ) / তারিফ আলম


গল্প -- টিউশন 

লেখা - তারিফ আলম 

 

তরুন দা যখন টিউশন পড়াতে আসতো তখন একটু বেশিই দুষ্টুমি করতাম । আমাদের বাড়ীর নীচের রুমে পড়াত আমায় । তরুন দা খুব ধৈর্য ধরে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে পড়াত । যতক্ষণ না সব পড়া করে দি ততক্ষন বসিয়ে রাখত । তরুন দা খুব গরীব বাড়ীর ছেলে , ৩ কিমি দূরে কোন একটা গ্রামে বাড়ী তাদের । তরুন দা পড়াশুনায় খুব ভালো । এম এ পাস করেছে ফাস্ট ক্লাসে । কিন্তু চাকরি পায় নি । আমাকে ছাড়াও আরও দু যায়গায় টিউশন পড়াত ।

আমি ক্লাস সেভেন এ পড়ি । আমি পড়া না পারলে তরুন দা রেগে গেলেও আমাকে কোন দিন মারত না । মাথায় আদর করে হাত বুলাত আর বলত, রবি তুই না পড়াশুনা করলে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে পারবি না । আর ভালো রেজাল্ট না করলে আমি তোকে আর পড়াতে আসবো না ।

আমি তরুন দা এর কথা না বুঝে তখন এক কান দিয়ে শুনতাম আর এক কান দিয়ে বের করে দিতাম । দেখতে দেখতে ফাইনল পরীক্ষা চলে এল । তরুন দা রাত দিন খেটে আমাকে পড়াতে লাগলো । রবিবার ছুটির দিনও বাদ দিত না । মনে হত আমার নয় , তরুন দা এরই পরীক্ষা । বাবা এসে খোঁজ নিতেন তরুন দা এর কাছে আমি কেমন পড়াশুনা করছি । তরুন দা আমার দোষ লুকিয়ে সব সময়ই বলত ভালো পড়াশুনা করছে , ভালো রেজাল্ট করবেই । বাবার কাছে তরুন দা আমার দোষ লুকোতে চাইতো হয়ত কাজ টা হাতছাড়া যাতে না হয়ে যায় ।

পরীক্ষা শেষ এ আমাদের রেজাল্ট বেরাল, আমার মোটামুটি হল । বাবা সন্তুষ্ট নন , বাবার রাগ টা দেখলাম রেজাল্ট খারাপ করার জন্য যতটা না আমার উপরে হল তার থেকে অনেক বেশি তরুন দা এর উপর । বিকালে তরুন দা ভয়ে ভয়ে আমাদের বাড়ীতে প্রবেশ করে আমার কাছে এসে অনেক কৌতূহল নিয়ে আমার রেজাল্ট জানতে চায় । রেজাল্ট টা দেখে কেমন যেন মনমরা হয়ে যায় । আমার মাথায় স্নেহ ভরা হাতটা বুলিয়ে দিয়ে বলে – সামনে বার আরও ভালো করতে হবে । আমি শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাই ।

বাবা এসে তরুন দা কে পাশের রুমে নিয়ে গিয়ে কিছু কথা বলেন । তরুন দা রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ব্যাগ টা নিয়ে চলে যাচ্ছিলো । আমি ছুটে গিয়ে তরুন দা কে জিজ্ঞাসা করলাম , আজ পড়াবে না ?

তরুন দা শুধু আমার মাথায় হাত বুলাল, খুব করুন লাগছিল তার মুখটা । হাসার চেষ্টা করলো একটু । শুধু বলল –‘না’ । তার চোখ দুটো ছলছল করছিল , মনে হয় এই বুঝি জল গড়িয়ে পড়বে । ঐ জল লুকনোর জন্য দ্রুত বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেল ।

---------------

এক বছর হয়ে গেল এখন আমি আমাদের স্কুলের এক শিক্ষক এর বাড়ীতে টিউশন পড়ি , একসঙ্গে অনেকজন এর সাথে পড়তে হয় । বেশির ভাগ সময়ই গল্প করে কাটাই । স্যার পড়া দিয়ে ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সাংসারিক বিষয় নিয়ে । তবে এখন রেজাল্ট ভালো হয় , পরীক্ষায় যে প্রশ্ন গুলো পড়ে সেগুলোই পড়িয়ে দেন । আর প্রাক্টিক্যাল পরীক্ষায় স্যার বেশি নম্বর দিয়ে দেন । বাবা খুশি । কিন্তু আমি ?

তরুন দা এর মত কেউ আর আদর করে হাত বুলিয়ে দেয় না , কত রকমের নতুন নতুন বিষয় নিয়ে আর আলোচনা করে না কেউ । আমার পরীক্ষাকে নিজের পরীক্ষা ভেবে রাত দিন এক করে নোট তৈরি করে এনে আমাকে দেয় না কেউ ।

তরুন দা আমদের বাড়ী থেকে সেই দিন যাওয়ার পর আর কোন দিন আসে নি । পরে শুনেছিলাম আমার রেজাল্ট ভালো না হওয়ার কারনে বাবা তরুন দা কে পড়াতে আসতে মানা করে দিয়েছিলেন । বেকার ছেলে তরুন দা এই ভয় টা পেত বলে আমাকে সব সময় বলত , তুই ভালো রেজাল্ট না করলে আমি আর পড়াতে আসবো না ‘। তখন বুঝতে পারি নি । কিন্তু আমি খুব মিস করি তরুন দা কে --- যে আমার প্রিয় শিক্ষক ।





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?