দায়িত্ব ( গল্প ) / তারিফ আলম

3rd September 2023 11:09 am তারিফ আলম
দায়িত্ব ( গল্প ) / তারিফ আলম


গল্প - দায়িত্ব 

লেখা - তারিফ আলম 

 

ট্রেন এ উঠে জানালার পাশে সিট টা পেয়ে গিয়ে বসে পড়ে মোবাইল টা বের করে হেড ফোনটা কানে দিয়ে গান শুনছিলাম । আমার সামনের সীটে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বসেছিলেন । দুপুরের সময় ট্রেন এ যাত্রী খুব কমই ছিল । হটাত ট্রেন এ টিটি টিকিট চেক করতে আসতে দেখে বয়স্ক ভদ্র লোকটি বেশ ভয় পেয়ে গেলেন । তাঁর হাবভাব দেখে আমি জিজ্ঞাস করলাম , টিকিট কি কাটা হয় নি আপানার ?

ভদ্র লোকটি খুব শান্ত স্বরে বললেন , ট্রেন স্টেশনে ঢুকে যাওয়ায় টিকিট কাটার সময় পাইনি । আর আমার কাছে ফাইন দেওয়ার মতো টাকাও নাই ।

আমি তাঁকে অভয় দিয়ে বললাম , চিন্তা করবেন না , ফাইন এর টাকা টা আমি দিয়ে দেব ।

আমার কথা টা শুনে দেখলাম তিনি খুব আনন্দিত হলেন ।

কিন্তু টিটি কে দেখলাম কোন কারন বশত আমাদের কাছে টিকিট চেক করতে না এসে হিজলি স্টেশনে নেমে পড়লো ।

যাই হোক আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম , কোথায় যাবেন ?

বয়স্ক লোকটি একটু ভাবনায় যেন পড়ে গেলেন । তারপর বললেন হাওড়া যাব ভেবেছিলাম , কিন্তু এবার ভাবছি বাঁকুড়া যাব ।

তাঁর কথা শুনে আমি একটু অবাক হলাম ।

তিনি বললেন , জানো বাব, আমার নাম বিরেন মণ্ডল , আমি একটা কোম্পানিতে কাজ করতাম । দুই ছেলে আর এক মেয়ে রেখে আমার স্ত্রী মারা যায় । আর বিয়ে করি নি এই ভয়ে যে , সতীন মা এসে আমার বাচ্ছাদের উপর অত্যাচার করতে পারে । বাবা হয়েও আমি তাদের মায়ের মতো খুব আদর যত্ন দিয়ে বড় করেছিলাম । যা টাকা রোজগার করতাম ছেলে দুটোর পড়াশুনার পেছনেই খরচ করে ফেলতাম । বড় ছেলে এখন স্কুল মাস্টার আর ছোট ছেলে ইঞ্জিনিয়ার । মেয়েটাও আমার পড়াশুনায় অনেক ভাল ছিল । কিন্তু তিন জনের পড়ার খরচ চালাতে পারছিলাম না বলে মেয়েকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করিয়ে বিয়ে দিয়ে দিলাম । বড় ছেলে দাঁতন এ থাকে আর ছোট ছেলে হাওড়া তে ।

আমি বললাম , তাহলে আপনি ছোট ছেলের কাছে যাবেন ?

কথা টা শুনে তিনি খুব করুন সুরে বললেন , দুই ছেলে বিবাহিত , তাদের ছেলে- মেয়ে নিয়ে থাকে । আমাকে তারা ভাগ করে নিয়েছে ।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম ‘ ভাগ করে নিয়েছে মানে’ ?

মাসে ১৫ দিন বড় ছেলে আর ১৫ দিন ছোট ছেলের বাড়ীতে থাকি, তারা ভাগ করে এই বৃদ্ধ বাবার প্রতি ছেলে হওয়ার দায়িত্ব পালন করছে ।

ছোট ছেলের বাড়ীতে ছিলাম । শরীর টা খুব খারাপ ছিল , কিন্তু ১৫ দিন হয়ে গিয়েছিল । বউমা কে বললাম একদিন পরে যাব । কিন্তু বউ মা শুনল না , চলে যেতে বলল বড় ছেলের বাড়ীতে, তা নাহলে আর খাবার মিলবে না । অসুস্থ শরীর নিয়েই আমি বড় ছেলের বাড়ীতে এসে দেখি দরজায় তালা মারা । তারা জানে আমি আসবো ,তবুও কোথাও বেড়াতে চলে গিয়েছে পরিবার নিয়ে । আসলে তারা কেউ এই অসুস্থ বুড়োটার দেখভাল করার দায়িত্ব নিতে চায় না ।

কথা গুলো বলতে বলতে বিরেন বাবুর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল ।

আমি তাঁকে সান্তনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না ।

তিনি কাঁদতে কাঁদতে দুঃখ প্রকাশ করে বললেন , ছেলে দুটোর পরিবর্তে মেয়েটা কে যদি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতাম তাহলে খুব ভালো হতো । মেয়ে বাঁকুড়াতে থাকে । জামাই এর একটা ভুসিমাল দোকান আছে । আর্থিক অবস্থা ভালো নয় । মেয়ে আমার অঙ্গনওয়ারীতে একটা কাজ করে । অনেক বার ডেকেছে , বাবা তুমি আমাদের বাড়ীতে এসে থাকো । ছেলে থাকতে মেয়ের বাড়ীতে গিয়ে থাকা সমাজ ভালো চোখে দেখে না । তবুও মেয়ের বাড়িতেই যাব ভাবছি । আমার কাছে ভালো খাওয়া দাওয়ার চেয়ে একটু ভালোবাসাই অনেক বেশি মুল্যবান । মেয়ের কাছে গিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইব প্রথমে ... তার ভাই দের পড়াশুনার খরচ চালানোর জন্য তার পড়াশুনা বন্ধ করে দিয়ে তার জীবনের স্বপ্ন গুলো ধ্বংস করে দিয়েছি । তখন ভাবতাম , মেয়েরা তো বিয়ে হয়ে শ্বশুর বাড়ী চলে যাবে । বুড়ো বয়সে দেখাশোনা তো ছেলেরাই করবে । তাই মেয়েকে আর পড়ালাম না । তার স্বপ্ন গুলো ধ্বংস করে দিয়েছিলাম ।

বিরেন বাবুর কথা গুলো শুনে খুব কষ্ট হচ্ছিল , মনে মনে বললাম , ‘ বাবা মা এর দায়িত্ব ছেলে মেয়ে যতদিন না সমান ভাবে বহন করতে শিখবে ততদিন হয়তো সমাজে নিজেদের ছেলে- মেয়ের প্রতি বাবা মা এর ধারনা বিরেন বাবুর মতই থাকবে ‘।

------- সমাপ্ত --------





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?