গল্প -- * স্বপ্ন ও সমাজ *
লেখা - তারিফ আলম
ছিঃ ছিঃ মেয়েকে শেষে এই কাজ করতে পাঠালে , কেউ বিয়ে করবে না তোমার মেয়েকে , সারা জীবন ঘরে বসে থেকে যাবে । তোমার মেয়ে আমাদের গ্রামের সম্মান নষ্ট করেছে --- এ গ্রামে তোমাদের আর থাকতে দেওয়া যেতে পারে না --- হাজিপুর এর হামিদ আলির কথা শেষ হতে না হতে সালিশি সভায় উপস্থিত সকলে একযোগে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার কথাটা কে সমর্থন করলো । না করেও উপায় নেই । কে চাইবে বনে বাস করে বাঘ এর সাথে শত্রুতা করতে । গ্রামের হত্তাকত্তা নেতা মোড়ল এর হামিদ আলির বিরুদ্ধে কথা বলা মানে বিপদ ।
আমিনা বিবি এতক্ষন চুপ করে বসে শুনছিলেন , এখন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না , সকলের কাছে কাঁদতে কাঁদতে মিনতি করতে লাগলেন , তারা যেন তাদের গ্রামে থাকতে দেয় । মেয়ে বাড়ী ফিরলে তাকে আর ঐ কাজ করতে দেবে না বলে কথা দিল । গ্রামের সম্মান নষ্ট আর করবে না তারা ।
******************************
“ তুই কলেজে আসবি না , আর কি ক্লাস করবি না “?
রুমা টোটো থেকে নেমে সিতারার উদ্দেশ্য প্রশ্ন টা ছুড়ে দিল ......
সিতারা একবার কলেজ এর দিকে চেয়ে দেখে নিয়ে একটু নকল হাসি হেসে মাথা নেড়ে ‘না “ বলল । প্রিয় বন্ধু এর কাছে টোটো এর ভাড়া বাবদ হাত পেতে ১০ টাকা নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল সিতারার ,কিন্তু না নিলে উপায় নাই , বাড়ীতে টাকা নিয়ে ফিরে গেলেই তাদের বাড়ীতে উনুনে ভাতের হাড়ি টা বসবে । ঘরে অসুস্থ মা , দুই ছোট বোন । তাদের পেটে দু মুঠো খাবার যাবে ।
একসময় সব কিছু কত সুন্দর ছিল যখন বাবা বেঁচে ছিলেন । সিতারা পড়াশুনায় খুব ভালো বলে বাবার গর্বের সীমা ছিল না । সব সময় মা কে বলতেন , আমি সারাদিন টোটো চালিয়ে যা ইনকাম করবো ... তার অর্ধেক সিতারার পড়াশুনার জন্য খরচ করবো ।
মা শুনে রাগ করে বলতেন , তোমার মাথা কি খারাপ হয়েছে ...... মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা না জমালে কি করে মেয়ের বিয়ে দেবে শুনি ?
বাবা হেসে সিতারা কে পাশে ডেকে বলতেন ... আমার মেয়ের বিয়ের জন্য ছেলে কে পন দেওয়ার জন্য টাকা জমানোর দরকার নাই, স্কুলের সব দিনিমনিরাই বলেছেন , আমার সিতারা পড়াশুনায় সবার ফাস্ট । পড়াশুনা ভালভাবে করাতে পারলে সে ঠিক চাকরি পেয়ে যাবে , তখন সে “ নিজের বিয়ের জন্য নিজেই পন” হবে “।
সিতারা তার বাবা কাসেম খান এর কথা মনে প্রানে গেঁথে নিয়ে পড়াশুনা করে যেত । বেলদা কলেজে এর ইংরেজি ডিপার্টমেন্ট এর প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় ফাস্ট গার্ল সে ।
কিন্তু সব কিছুই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল যে দিন নেতা হামিদ আলির দলের লোকেরা ডেকে নিয়ে গিয়েছিল । মা যেতে মানা করেছিলেন , হামিদ আলি ভালো লোক না । তার দলে যেওনা । বাবা দুঃখ করে বলেছিলেন , হামিদ আলি ঘর করার জন্য সরকারি টাকা যে দিন থেকে পাইয়ে দিয়েছিলেন , সে দিন থেকেই নাকি তিনি তাঁর গোলাম হয়ে গিয়েছেন । আসলে টাকা টা সরকারি হলেও এই সব নেতাদের দয়াতেই পাওয়া যায় । তাই যখন ডাকবে তখন যাওয়া ছাড়া উপায় নাই ।
......সেই দিন সেই যে গিয়েছিলেন , ফিরলেন ,কিন্তু প্রান হীন দেহ নিয়ে । কোথাও গোষ্ঠী সংঘর্ষে বোমার আঘতে মারা গিয়েছেন ।
তারপর দুঃখের আর শেষ ছিল না । জীবন ধারন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ল । মুদি দোকান সহ প্রায় সব দোকানে ধার হয়ে গেল । সারাদিনে একবারও প্রায় খাওয়া জুটত না । সিতারার কলেজ যাওয়া বন্ধ হল । কলেজ ফি দেওয়ার জন্য টাকা ছিল না । মা চিন্তায় চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়লেন । ছোট দুই বোন এর খিদের কান্না শুনে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারে নি সিতারা । বাবার টোটো টা নিয়ে নিজেই চালাতে শুরু করেছে । মেয়ে হয়ে টোটো চালানো ---- সামাজ মেনে নেবে না । কিন্তু সমাজের ধার ধারলে নিজের অসুস্থ মা , ছোট বোনরা না খেতে পেয়ে মরবে । সমাজের রক্ষাকারীরা দু মুঠো ভাত এনে তুলে দেবে না , বিনা স্বার্থে কেউ দেয় না কিছুই এই পৃথিবীতে ।
টাকা টা নিয়ে দ্রুত টোটো টা ঘুরিয়ে নিয়ে বাসস্ট্যান্ড এর দিকে চলল । রোজ বাসস্ট্যান্ড থেকে কলেজ পর্যন্ত কলেজের ছেলে – মেয়েদের নিজের টোটো তে বসিয়ে নিয়ে আসা – যাওয়া করে সিতারা খাতুন । রোজ এখন কলেজ এ আসে , কিন্তু শুধু কলেজ গেট পর্যন্ত , কলেজে ঢোকার ক্ষমতা নেই এখন তার , কলেজের ফী দিতে না পারায় পড়াশুনা বন্ধ । ফাস্ট হয়েও মার্কসিট টা নেওয়া হয় নি । কি হবে নিয়ে , কে দেখবে , বাবা তো আর নেই । বাবা বেঁচে থাকলে মার্কসিট টা নিয়ে কতবার কত জন কে যে দেখাতেন আর কত আনন্দ করতেন তার ঠিক নেই ।
বাবা নেই , বাবার স্বপ্নও আর নেই । সে কোন দিন আর পুরন করতে পারবে না বাবার ইচ্ছা । চোখ জলে ভরে গেল সিতারার । টোটো চলাতে চালাতে সামনের সব কিছুই ঝাপসা হয়ে এল ।
--------------------------
দুপুরে বাড়ী পৌঁছে গিয়ে সিতারা দেখে বাড়ীর সামনে গ্রামের গন্য মান্য ব্যাক্তিগনরা আলোচনায় ব্যাস্ত । গ্রামের নেতা মোড়ল হামিদ আলি চিৎকার করে বললেন .........তুমি মুসলমান ঘরের মেয়ে হয়ে টোটো চালাচ্ছ , লজ্জা করে না , গ্রামের বউ – বেটিরা কেমন বোরখা পরে আছে তা দেখতে পাচ্ছ না ।
সিতারা খুব শান্ত স্বরে বলল ... বোরখা পরা না পরার উপরে কি কে ভালো আর কে মন্দ তা বিচার করা সম্ভব ? মনে খারাপ হওয়ার চিন্তা থাকলে যতই বোরখা পরিয়ে রাখো না কেন সে খারাপ কাজ করে ফেলবে । আমি তো নিজের শরীর প্রদর্শন করছি না । শুধু নিজের মা ও বোন দের মুখে দু মুঠো ভাত তুলে দিচ্ছি । তার জন্য আমি টোটো চালাচ্ছি । গ্রামের কেউ যদি আমাদের পরিবারের ভার গ্রহন করে তাহলে আমি টোটো চালানো ছেড়ে দেব ।
সিতারার কথা শুনে সভায় উপস্থিত সকলে চুপ । হামিদ আলি রাগে গজগজ করছিলেন । কিন্তু মুখ দিয়ে কিছু বলছিলেন না । সভার অন্য সকলে একে একে উঠে বাড়ীর দিকে রওনা হল । সিতারা তার মাকে আর বোন দের নিয়ে ঘরে ঢুকল । অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে । হাঁড়িতে ভাত বসাতে হবে যে ।
...........................।সমাপ্ত ..................।