“ রং ছবি “
লেখা – তারিফ আলম
------প্রথম পর্ব -----
জীবন একটা জুয়া ............ আর সব কিছুতে হার ...... এ এক নিয়তি..।. জীবনটা অনেক গুলো গল্পের সম্মিলিত একটি বই ...... একটা গল্প শেষ হতে না হতে আর একটা গল্প শুরু হয়ে যায় ।
ভোরের শীতল বাতাস যদি মিষ্টি স্বপ্ন নিয়ে আসে তাহলে সে স্বপ্ন টা হবে "ছবি" । উড়ু উড়ু মন উড়ে যাবে বহু দূরে যেখানে রামধেনু রঙ্গে রাঙ্গা ছবি গুলো একে একে ধরা পড়বে ।
একটা না বলা কথার পাতা উড়ে যাচ্ছে সাদা পালকের আঁশে , তবুও আমার মুখে কুলূপ আঁটা । পরস্পরের গভীর ঢেউ এর অবিশ্রান্ত আছাড় কাছাড় । এতো টুকরো টাকরা কথা ঝেড়ে মুছে সাজাতে গোছাতে আনমনা হয়ে উঠে সতর্ক সময় । সবার জন্য কি না বলা তুলে রাখি, তবু না বলা কথা কি কখনো মরে যায় ।
শীতকাল ... মায়ের তৈরি করে দেওয়া শয়টার এ শীত কাটছে না । পাশে বন্ধু ভোলা দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছিল । আমি তাড়া দিলাম...... তাড়াতাড়ি চল ...কাওয়ালি যে শুরু হয়ে যাবে । প্রতি বছর পির বাবার দরগায় সারা রাত ধরে কাওয়ালির অনুষ্ঠান হয় । গ্রামের সব বাড়িতেই কুটুমের সমাগম হয় । তাই অনুষ্ঠানে ভিড় হয় প্রচুর । আগে থেকে না গেলে সবার পিছনে বসতে হবে , আর পিছন থেকে কিছু দেখতে পাওয়া যাবে না ।
আমার আশঙ্কা সত্যি হল...... ময়দানে ভিড়ে ভরে গিয়েছে । অগ্যতা আমাদের পিছনে বসতে হল । মনে মনে খুব রাগ হল ভোলার উপর । যাই হোক পিছনে একটা ত্রিপল এর উপরে বসার জায়গা পেলাম ।
কাওয়াল রা খুব কম দামি............ তাই কাওয়ালির গান গুলো তাঁরা হিন্দি গানের সুরে গাইছিল । গ্রামের লোক গুলো বিভিন্ন ভঙ্গি তে নাচতে নাচতে তাদের পুওস্কার সব্রুপ ১০ -২০ টাকা দিচ্ছিল । কেউ কেউ টাকার মালা তাদের গলায় পরিয়ে দিচ্ছিল ।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা জানি না। ভলার ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে গেল । বলল ... ভোর হয়ে এলো , বাড়ি চল ... বাড়ি গিয়ে ঘুমাবি ।
আমি উঠে চোখ দলতে দলতে তার পিছু পিছু চলতে থাকলাম । সামনের দিকে দেখলাম কিছু মহিলা আর কিছু ছেলে মেয়ে হেঁটে যাচিল । অন্ধকার কাউকে চেনা যাচ্ছিল না। তখন ভোরের আভাস প্রকাশ পাচ্ছিল না , শীতের ভরে সূর্যি মামাও কুয়াসার চাদরে মুখ ঢেকে শুয়েছিল ।
আমারা দুজন ঠিক তাদের ক্রস করে এগিয়ে যাওয়ার সময় আমার মাথায় কেউ যেন কন কিছু দিয়ে হাল্কা আঘাত করল , আমি চকিতে ফিরে দেখি কয়েকটা মেয়ে হাসা হাসি করছিল । আমি বুঝতে পারলাম এদের মধ্যে থেকেই কেউ আঘাত করেছে । আমি সাইডে সরে এলাম ।
তবে এবার সাজাগ থাকলাম । একটু পথ চলার পর আবার আঘাত মাথায় পেতে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে পড়ে দেখলাম একটি মেয়ে তার হাতের বেলুন দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করে লুকিয়ে পড়ছিল । আমি রেগে দ্রুত গিয়ে ধরে ফেললাম তাকে......... এই তুমি কে , আমার মাথায় মারলে কেন বেলুন?
সে ভয় পেয়ে বলল ... আর করবো না , দয়াকরে ছেড়ে দাও ।
আমিও চাড়ার পাত্র নই... তার হাতে থাকা বেলুন টা জোর করে টিপে ফাটিয়ে দিলাম । সে রাগে আমাকে ধাক্কা দিতেই আমিও তাকে ধাক্কা দিলাম , কিন্তু মেয়েদের বুকে যে ধাক্কা দিতে নাই তা আমার জানা ছিল না । আমার হাতে নরম তুলোর মতো নরম উচু অংশের অনুভুতি হল । আমি হাত সরিয়ে নিলাম । সে মেয়েটি চুপ হয়ে গেল । আমি সামনের দিকে চলা শুরু করলাম , দেখলাম মেয়েটি ও আমার পিছন পিছন আসছে । সে হয়তো আমাদের বাড়ির পাশের কোন বাড়িতে কুটুম হয় এসেছে । আগে কখনো দেখেছি বলে তো মনে হয় না ।
ভোর হয়ে এসেছে । তবে কুয়াশা সূর্যের আলোকে ম্লান করে রেখেছে । আমি আমাদের গ্রামের বাড়ির গেটের কাছে দাঁড়ালাম । মেয়েটি আমাকে ক্রস করে রাস্তা দিয়ে আগিয়ে যাচ্ছিল । আমি ডেকে বললাম , তুমি কাদের বাড়ির কুটুম গো । সে হেসে বলল ... তোমার বাড়ির ।
এখন মেয়েটিকে অনেক টা ভালো করে দেখলাম । লম্বা, খুব ফরসা, স্লিম , টানা টানা দুটো চোখ , কালো সাদা ফ্রক তাকে খুব সুন্দর লাগছিল । যৌবন এর সবে শুরু হয়েছে , দেহের তরঙ্গায়িত ওঠা - নামা গুলোর প্রকাশ ক্ষীণ ।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম , তোমার নাম কি গো ?
মেয়েটি আবার খিল খিল করে হেসে উঠল , আমার নাম বলবো না , কিন্তু তোমার নাম আমি জানি , তোমার নাম জুলু , তাই না ? এই বলে হাসতে হাসতে সে চলে যাচ্ছিল ......... আমি দাঁড়িয়ে থেকে তার চলে যাওয়া দেখছিলাম ।
.................................দ্বিতীয় পর্ব ........................
সকাল থেকে ঝিরিঝিরি করে বৃষ্টি হয়ে চলেছে । আকাশের মুখ গোমড়া , স্কুল এ গরমের ছুটি চলছে , তাই ছাদের নিজের রুমে জানালার পাশে বসে তাকিয়ে আছি পথ এর দিকে চেয়ে । হটাত করে একটা ছেলের ডাক শুনে পিছন ফিরে দেখি পচা দাঁড়িয়ে ।
পচা আমার সঙ্গে পড়ে স্কুলে । কি ব্যাপার পচা ।
পচা হন্তদন্ত হয়ে বলল ...... তাড়াতাড়ি চল , আজ কে আমাদের ক্লাব এর সাথে ময়না পাড়া ক্লাবের ফুটবল ম্যাচ আছে । তোকে ডাকতে পাঠিয়েছে , তাড়াতাড়ি চল ।
আমার ফুটবল খেলতে খুব ভালো লাগে , তাছাড়া আমি আমাদের নবোদয় সঙ্ঘের সবথেকে সেরা স্টাইকার । দৌরে নীচে নেমে ফুটবল খেলার পেন্ট আর গেঞ্জি টা নিয়ে পচার সঙ্গে খেলার মাঠে এসে পউছালাম ।
ময়না পাড়া আমাদের চীরপ্রতিদ্বন্দ্বী । খেলা শুরু হল , কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা গোল খেয়ে গেলাম । হাফ টাইম এর পর কর্নার এ আমি একটা গোল করে দিলাম । ১-১ গোল হয়ে গেল । খেলা শেষ হওয়ার ১০ মিনিট পূর্বে নিতাই এর নেওয়া সটে হেড দিয়ে আমি গোল করে দিলাম । আমাদের ক্লাব জিতে গেল ।
আমি খুব খুশি ছিলাম । রাস্তা দিয়ে ক্লাবে বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে ফিরছিলাম , এমন সময় ভোলা কে দেখলাম সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । তাঁর সাথে ছিল মাংলু । আমি তাদের বললাম কোথায় যাবি ,,?
ভোলা বলল ঐ সুসিন্দা রেল গেট এর দিকে যাব । তুই ও চল আমাদের সাথে । সাইকেল এর পিছনে বস ।
আমি আর কিছু না বলে ভোলার সাইকেল এর পিছনে বসে পড়লাম ।
রেল লাইনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাংলু ভোলাকে বলল , ঐ দেখ ওরা যাচ্ছে ।
আমিও তাদের সাথে সাথে তাকালাম , দেখলাম তিনটি ফ্রক পরা মেয়ে হাসতে হাসতে এগিয়ে যাচ্ছে আর ঘুরে ঘুরে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে ।
আমি ভোলা কে জিজ্ঞাসা করলাম , ঐ মেয়ে গুলো কারা ?
ভোলা বলল , চিনতে পারলি না ? আরে কাওয়ালির রাতে এরা সবাই গিয়াছিল আমাদের গ্রামে ।
আমি ঠিক মনে করতে পারছিলাম না কি হয়েছিল কাওয়ালির রাতে ।
মেয়েগুলো একটু পাশে আসতেই দেখলাম ফর্সা লম্বা করে তিনজনের মধ্যে একজন মেয়ে আমার দিকে তাকিয়া আছে এক দৃষ্টি তে ।
ভোলা ওদের পাশে গিয়ে সাইকেল দাঁড় করল ।
আমি সাইকেল থেকে নেমে একটু সাইডে গিয়ে দাঁড়ালাম । মাংলু আর ভোলা ওদের সাথে কথা বলেছিল । কিন্তু সেই মেয়েটি তাদের সাথে কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল । আমি এবারে একটু ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম । মনে পড়ে গেল সব ... আরে এ ত সেই মেয়ে , যার সাথে কাওয়ালি দেখে ফিরার সময় পরিচয় হয়ছিল । আমি তার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলাম , সেও হাসল । তার হাসি দেখে মনে হল যেন কিছু মুক্ত ঝরে পড়ল আমার হৃদয়ে , আমি মুক্ত গুলো কুড়িয়ে তার হাতে দেব ভাবলাম , আর বলব , তুমি আমার জন্য একটা ভালোবাসার মালা গেঁথে দেবে , আমি পরাবো তোমার গলায় ।
আচমকা একটা ট্রাক এর আওয়াজে সম্বিত ফিরে পেলাম । ভোলা আমাকে ডেকে ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো । আমি মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলাম তার নাম । সে একটু মৃদু হেসে বলল -- ছবি ।
আমি হেসে বললাম আমি ছবি আঁকতে খুব ভালো বাসি ।
ও তাই নাকি --- আমার স্কুলের practical এর কয়েকটা ছবি এঁকে দেবে ।
আআমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম ।
প্রথম ভালোবাসার অনুভুতি হয়তো একেই বলে , বাড়ী ফিরে এসে মন একেবার চঞ্চল । পঢ়ায় মন আর বসে না । অঙ্ক করতে গিয়ে সাধারন যোগ - বিয়োগও ভুল করে ফেলছি । সারাক্ষন চোখের সামনে ছবির সুন্দর সরল মুখখানা দৃশ্যমান হচ্ছিল ।
………………..তৃতীয় পর্ব ..................
রাত ভোর হল কখন খেয়াল নেই , ভোরে লোকাল ট্রেন এর আওয়াজে তন্দ্রা ভাঙ্গে । আজব জগতে বিরাজমান মন , কল্পনার জগত যেন ঘিরে রেখেছে হ্রদয়ের সব কটা প্রকোষ্ঠ । বস্তব জগতের অনিশ্চয়তা থেকে অনেক দূর ...... সীমাহীন প্রান্তরে খেয়ালী সুখ সমুদ্রের মোহানায় প্রিয় মানুষটির সাথে গল্পে মশগুল ।
মায়ের বকুনিতে বাস্তব জগতে পদার্পণ করে কিছু খাবার খেয়ে টিউশন পড়তে ছুটলাম । সেখান থেকে ফিরে স্কুল এর পথ ধরলাম । গঙ্গাধর একাডেমীতে পড়তাম , বাড়ী থেকে এক কিমি দূর পায়ে হেঁটেই যেতাম । স্কুল এর পথে যাওয়ার সময় দেখা হল ছবির সাথে , সে তার দুই বান্ধবী এর সাথে অপেক্ষা করছিল আমার আসার । আমাকে দেখে এগিয়ে এসে একটা ভূগোল বই আর একটা খাতা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বই এর কয়েকটা পিকাচার দেখিয়ে বলল , এই গুলো এঁকে দিতে হবে । আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম ।
ওদের প্রভাতি বালিকা বিদ্যালয় আমাদের স্কুল এর পাস দিয়েই যেতে হয় । তাই আমার স্কুল পর্যন্ত এক সঙ্গে গেলাম , কিন্তু কেউ কারো সাথে পথে কথা বললাম না ।
সে স্কুলে খুব কম আসতো , এলেও দু জন এক সময় না বের হওয়ার কারনে দেখা হত না । সাত দিন পর একদিন দেখা হতে তার বই আর খাতা ফিরিয়ে দিলাম , সে খাতাটা উল্টে –পাল্টে দেখল আমি ছবি ছাড়া অন্য কিছু লিখেছি কি না ?
কিন্তু কিছু লেখা না পেয়ে হতাশ হয়ে বলল , তুমি কিছু লেখনী ?
আমি বললাম , ছবি গুলো সব এঁকে দিয়েছি , আর কি লিখবো?
সে দিন আর কিছু না বলে সে চলে গিয়েছিল । কয়েক দিন আবার স্কুল যাওয়ার পথে যখন দেখা হল তখন সে এক মুহূর্তের জন্য পাশে এসে আমার হাতে একটা খাতা ধরিয়ে দিয়ে বলল , এতে কিছু আছে , বাড়ী গিয়ে দেখবে ।
আমি কৌতূহল বশত স্কুলেই খুলে দেখলাম । একটা টুকরো কাগজে লেখা ছিল ‘ 143 = এর মানে কি ?’ আসলে তখন মিঠুন চক্রবর্তীর সিনেমার একটা গান জনপ্রিয় হয়েছিল – I =1 , love – 4 ,you= 3 . আমি সেটাই লিখে তার পর যে দিন দেখ হল খাতাটা ফেরত দিয়েছিলাম । সে দেখে খুব হেসেছিল । তারপর আর কিছু বলার প্রয়োজন হয় নি । যখন স্কুল যাওয়ার পথে দেখা হত একটা চাঁদমামা নামক গল্প বই এর মধ্যে একাটা কাগজে লিখে দিতাম মনের কথা , পরে সে তার মনের কথা লিখে ফেরত দিত । স্কুল যাওয়ার পথ ছাড়া অন্য কোথাও দেখা হওয়ার সুযোগ ছিল না । ওরা খুব গরীব ছিল আর রেল লাইনের পেছনের বস্তিতে থাকতো । সে ক্লাস এইট এ আর আমি তখন ক্লাস টেন । বাবার কড়া নির্দেশ ছিল রেল লাইন পেরানো তো দূরের কথা , রেল লাইন এর পাশে যাওয়াও চলত না ।
এই ভাবে চলছিল বেশ, রঙিন খেয়ালী স্বপ্ন বুনছিলাম মনে মনে । আমার মাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষার আগে একদিন স্কুল যাওয়ার পথে বেশ গম্ভীর মুখে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে চাঁদমামা বই খানা হাতে দিয়ে সে বলে , কাগজে লেখা আছে সব , তুমি পড়ে দুঃখ করবে না । আর কিছু না বলে চলে গিয়েছিল সে দিন দ্রুত । আমি খুব দ্রুত বই এর মধ্যে থাকা চিঠিটা খুলে পড়তে লাগলাম , ...‘ আমার বাবা নেই , মাও অসুস্থ , তাই দাদারা আমাকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে একটা রেলে চাকরি করা ছেলের সাথে , অনেক দূর বাড়ী । তোমার সাথে আর দেখা হবে না হয়ত , তুমি দুঃখ করো না , আমি খুব নিরুপায় ‘ । - চিঠিটা পড়তে পড়তে আমার দু চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল । আমি স্কুলে না গিয়ে বাড়ী ফিরে এলাম ।
তার বান্ধবীদের কাছ থেকে জানতে পারলাম , কয়েকদিন এর মধ্যেই তার বিয়ে , রোজ রেল লাইন এর পাশে গিয়ে দূর থেকে দেখতাম ওদের বস্তি টা , যদি একবার তাকে দেখতে পাই তাহলে ডেকে বলতাম, তুমি এমন করলে কেন ? কেন আমাকে হাজার স্বপ্ন দেখালে , কেন আমার কল্পনাকে বাস্তবের সীমা থেকে বহুদূর নিয়ে গেলে , কেন ? কেন ?
কিন্তু একদিনও তার দেখা পেলাম না , সে আমাকে দেখেছিল কি না জানি না , হয়তো দেখেও সামনে আসে নি – আমার এত সব জিজ্ঞাসার উত্তর তার কাছে ছিল না হয়তো ।
কয়েক দিন পর বস্তির দিক থেকে মাইক এ গান এর আওয়াজ শুনতে পেলাম , পাড়ার বউদি দের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম আজ ছবির বিয়ে । শুনে মনে এক আজব অনুভুতি হতে লাগলো ,মনে হল হৃদয়ের সব রক্ত কেউ যেন শুষে নিচ্ছে , হাল্কা , অনেক হাল্কা লাগছিল ।
আমি সিধান্ত নিলাম , ও আনন্দে আছে , আমি কেন দুঃখ পাবো । আমিও খুব আনন্দ করবো । বাড়ীতে বাবা কে বললাম আমার ফুটবল খেলার বুট কিনে দেবে চল , আমার খেলা আছে । বাবা বললেন স্কুল থেকে ফিরে আসার সময় কিনে আনবো । আমি শুনলাম না , তিনি স্কুল যাওয়ার আগেই আমাকে খেলার বুট কিনে দিয়ে তারপর স্কুলে গেলেন । আমার মাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষা সবে মাত্র শেষ হয়েছে ।
বাড়ী ফিরে মাকে বললাম , এখুনি পায়েস রান্না করো , আমি খাব । মা আমার মুখ এর দিকে চেয়ে ছিলেন , আমার এমন অস্বাভাবিক ব্যবহার দেখে কিছু একটা আন্দাজ করে জিজ্ঞাসা করলেন , কি হয়েছে তোর ? এমন কেন করছিস ?
আমি মা এর চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারছিলাম না , শুধু রাগ দেখিয়ে বললাম , সবাই আনন্দ করবে আর শুধু আমি দুঃখ করবো কেন ?
মা আমার কথা শুনে আমার পাশে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন , কেউ কিছু বলেছে তোকে ? কারা আনন্দ করছে ? তুই বা দুঃখ করতে যাবি কেন ?
আমি কিছু আর বলতে পারলাম না ,আমার মুখ থেকে কথার বদলে কান্না বেরিয়ে আসছিল ।আমি মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলাম , সবাই মা , সবাই আনন্দ করছে , আমি একা দুঃখ করবো কেন ?
মা আমার কথা কিছু বুঝতে না পারলেও আমি যে খুব কষ্ট পাচ্ছি তা ঠিক বুঝতে পারলেন , আমার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রু নিজের আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন – সবাই আনন্দ করছে কোথায় , তোর সাথে আমিও তো দুখী ।
মা এর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম তিনিও কাঁদছিলেন, তাঁর চোখ দিয়েও অশ্রুর ধারা বয়ে যাচ্ছিলো । আমি নিজের হাত দিয়ে মায়ের চোখের জল মুছে দিচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম , সবাই আনন্দ করলেও আমার মা দুঃখ পাচ্ছেন আমার জন্য । আমি মাকে দুঃখ দিতে পারব না , তাই নিজের হাত দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছে ফেলেছিলাম চিরদীনের জন্য ।
...........................সমাপ্ত …………………..