প্রতারক ( গল্প ) / লেখা - তারিফ আলম

3rd September 2023 10:45 am তারিফ আলম
প্রতারক ( গল্প ) / লেখা - তারিফ আলম


গল্প - * প্রতারক * 

লেখা - তারিফ আলম 

 

রাজু বুক স্টল থেকে ২০০ টাকা দিয়ে বাংলা এস এস সি এর একটা ভালো বই নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এসে সাইকেল টা নিয়ে সুতপার বাড়ীর দিকে রওনা দিল । সুতপার বাড়ীতে পৌঁছে দেখল সুতপা বারান্দায় একা মনমরা হয়ে বসে আছে । রাজু একটা ডেয়ারি মিল্ক এর চকলেট কিনে এনেছিল আসার সময় । সেটা সুতপার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো এত মনমরা হয়ে এখানে কেন সে বসে আছে ?

সুতপা চকলেট টা হাতে নিয়ে বলল , আমার ভাগ্যই খারাপ । কাল যে ছেলেটা বিয়ের জন্য আমাকে দেখতে আসেছিল সে আজ ফোন করে বাবাকে বলে দিল যে ,” আপনার মেয়ে বেটে আর মোটা একটু বেশি , আর দেখতেও তেমন ভালো নয় , তাই বিয়ে করতে পারবো না “। এই নিয়ে à§« জন ছেলে আমাকে দেখে গিয়ে মানা করে দিল । বাবা –মা খুব দুঃখ পাচ্ছেন । আমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে আর ভালো পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না – তাই বাড়ীর সকলে খুব চিন্তা করে ।

রাজু এবার সুতপার সামনে বসে পড়ে আর বলে – “ এতে এত দুঃখ করার কি আছে ? বাইরের রুপ দেখে মানুষ বিচার যারা করে তারা কোন দিন সুখী হয় না । মানুষের রুপ টাই সব নয় ,মনটাই আসল” ।

সুতপা রাজুর কথা শুনে তার দিকে চেয়ে বলে , “ রাজু দা তুমি আমাকে বিয়ে করবে “?

রাজু একটু চুপ থেকে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় । সুতপার মন আনন্দে ভরে যায় । রাজু নতুন এস এস সি এর বই টা ব্যাগ থেকে নিয়ে সুতপার হাতে দেয় আর বলে , “ সামনে এস এস সি পরীক্ষা , এই বই টা নিয়ে এলাম তোমার জন্য । তুমি খুব ভালো করে পড়াশুনা কর । চাকরি পাবেই , তারপর আমরা বিয়ে করে নেব “।

রাজু সুতপার পাড়ায় থাকে । এম এ পাশ করলেও টাকার অভাবে বি এড টা করতে পারে নি । বাড়ীতে আর্থিক অবস্থা ভালো নয় । তাই সকালে শ্যামাপুর স্টেশনে খবর কাগজ বিক্রি করে আর তাদের গ্রামের কিছু বাড়ীতে সাইকেল নিয়ে সংবাদ পত্র দিয়ে যায় । সুতপার বাড়ীতেও সে রোজ সংবাদপত্র দেয় । সুতপার সাথে পরিচয় অনেক দিনের । সুতপা এম এ, বি এড করেছে । এবারের এস এস সি পরীক্ষায় বসবে । রাজু অনেক সাহায্য করে সুতপাকে । কখনো নতুন নতুন বই কিনে এনে দেয় , আবার কখনো বিভিন্ন তথ্য দিয়ে তাকে সাহায্য করে ।

রাজুও মনে মনে সুতপা কে ভালোবাসে । সুতপা আর রাজুর ভালোবাসা ধীরে ধীরে গভীর হতে লাগলো । তারা দুজনে প্রায় গিয়ে নদীর পাড়ে বসে হাতে হাত দিয়ে সময় কাটাত – ভালোবাসার সময় । নিজদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতো । বিয়ের পর তারা কেমন ভাবে থাকবে , কোথায় ঘুরতে যাবে , বাচ্চা হলে তাদের কি নাম রাখবে – এই সব হাজার স্বপ্ন খেলা করতো তাদের দুই চোখে ।

একদিন রাজু সুতপাকে নিজেদের বাড়ীতে নিয়ে গেল । রাজু তার মা এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল সুতপার । রাজুর মা সুতপাকে খুব আদর যত্ন করে খাওয়ালেন , আর বললেন সুতপাকে নিজের ছেলের বউ হিসাবে খুব পছন্দ হয়েছে তাঁর ।

এই ভাবে চলছিল সব কিছু ঠিকঠাক । এস এস সি এর রেজাল্ট বের হল । আর নবম – দশম এ সুতপা পাশও করে গেল । সুতপার বাবা –মা আর পারিবারের সকলে খুব খুশি । রাজুরও খুশির ঠিকানা ছিল না । এত দিন থেকে দু জনে মিলে যে স্বপ্ন গুলো দেখছিল তা এবার সত্যি হওয়ার পালা । সুতপা মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসে , তাই দোকান থেকে ১০০ টাকার মিষ্টি কিনে নিয়ে গেল সুতপার কাছে । সুতপা খুব খুশী ছিল । সবাই এখন তাকে কত গুরুত্ব দিচ্ছে এস এস সি পাশ করেছে বলে ।

রাজু মিষ্টি নিজের হাতে করে নিয়ে সুতপাকে খাইয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করলো – “ তুমি চাকরি পাওয়ার পর আমাকে বিয়ে করবে তো “ ?

সুতপা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় । রাজু বুকে জড়িয়ে নেয় ।

ইন্টারভিউও খুব ভালো হয় সুতপার । ইন্টারভিউ এর আগে বিভন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্যও অনেক করে রাজু সুতপাকে । কিন্তু তারপর থেকেই যেন সম্পর্কের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখা দেয় । সুতপা বার বার এড়িয়ে যেতে থাকে রাজুকে বিভন্ন বাহানা করে ।

একদিন রাজু তাদের বাড়ীতে সংবাদপত্র দিতে গিয়ে জানতে পারে যে সুতপার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে । গতকাল একটা ছেলে দেখতে এসেছিল হুগলী থেকে । কলকাতায় বড় কোম্পানিতে এনিমেশন এর ডিপার্টমেন্ট এ নাকি জব করে । খুব স্মার্ট আর হ্যান্ডসাম , মোটা টাকার বেতনও পায় নাকি ।

কথা গুলো জেনে রাজু সুতপাকে খুঁজে বাড়ীর পিছন দকে গিয়ে দেখে সুতপা ফোন এ কারো সঙ্গে খুব হেসে হেসে কথা বলছে । রাজুকে দেখেই ফোন টা কেটে দিল ।

সুতপা একটু বিরক্ত হয়ে বলল , “ কি দরকার রাজু দা “?

রাজু খুব করুন সুরে বলল , তোমার নাকি বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে ?

সুতপা রাগত স্বরে বলল , হ্যাঁ হয়েছে । বাড়ীর লোকেরা পছন্দ করেছে তো আমি কি করবো । আর সে খুব স্মার্ট ছেলে , খুব সুন্দর কথা বলে , ৫০ হাজার টাকার চাকরি করে কলকাতায় আমিনেসন কোম্পানিতে । এনিমেশন মানে কার্টুন যে গুলো টিভি তে হয় । বাড়ীতে সবাই চায় আমার বিয়ে যেন তার সাথে হয়" ।

রাজু কথা গুলো শুনে খুব দুখের সঙ্গে বলে , "সুতপা তুমি যে বলেছিলে আমাকে বিয়ে করবে "?

সুতপা আবার রাগ দেখিয়ে বলল ,” বলেছিলাম কিন্তু আমার বাড়ীতে মানবে না তো কি করবো ? আমি একজন হাইস্কুল শিক্ষিকা হব । আমার স্বামী খবর কাগজ বিক্রি করে – এটা শুনলে তো লোকে আমার উপরে হাসাহাসি করবে । আমি হাসির পাত্র হতে চাইনা । তাই আমি আর তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না । তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করে নাও” ।

কথা গুলো শুনে রাজুর মন কষ্টে ভরে গেল । কেউ যেন তার বুকে ছুরি দিয়ে আঘাত করলো সজোরে । এত বছর থেকে দেখে আসা স্বপ্ন গুলো যেন চোখের সামনে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল । দু চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো । নিজের কান্না লুকনোর জন্য দ্রুত সুতপার কাছে বিদায় নিয়ে চলে এল । বাড়ী ফিরতেই মা ছেলের করুন মুখ দেখে বুঝলেন কিছু একটা ঘটেছে । জিজ্ঞাসা করলেন কি হয়েছে ? রাজু মাথা নেড়ে কিছু হয় নি বলে নিজের রুমে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিল । একটু একা থাকতে চায় সে , খুব একা ।

*****************************

সকাল থেকে সানাই বেজে চলেছে । আজ সুতপার বিয়ে বিক্রমের সাথে । দেখতে সুন্দর ও স্মার্ট হলেও বিক্রম একটা ধূর্ত , লম্পট চরিত্রের ছেলে । কলকাতায় একটা কোম্পানিতে কাজ করে মাত্র সাত হাজার টাকা মাসিক বেতনে , কিন্তু লোককে বলে বেড়ায় খুব বড় কোম্পানিতে জব করে , ৫০ হাজার টাকা বেতন । ড্রেস এমন পরে আর হাবভাব এমন দেখায় যে লোকে বিশ্বাসও করে নেয় তার কথা ।

ঘটক এর কাছ থেকে যখন শুনে যে সুতপা নামের একটি গ্রামের মেয়ে এস এস সি পাশ করেছে তখন সে ঘটক কে বলে যে সে সেই মেয়েটা কে দেখতে যাবে বিয়ের জন্য । ঘটক নিয়ে আসে সুতপার বাড়ীতে । শহরের ছেলে বিক্রম বেশ মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে সুতপাকে এক ঘণ্টার মধ্যেই বশে করে নেয় । বিক্রম জানে যে সুতপা হল একটা সোনার ডিম পাড়া মুরগীর মত , এস এস সি টা হয়ে গেলেই সে শিক্ষিকা হয়ে যাবে , তখন তার টাকাতেই ফুর্তি করতে পারবে । সুতপা দেখতে খারাপ হলেও সে বিয়ে করতে রাজী শুধু এই কারনে । তার কলকাতায় সুন্দরী আর স্মার্ট গার্লফ্রেন্ড আছে আগে থেকেই ।

খুব ধুমধাম করে সুতপার বিয়ে দেয় তার বাবা । বিয়ের পর সব কিছু ঠিকই চলছিল সুতপার জীবনে । বিক্রম বেশ আদর যত্ন করছিল সুতপার । কিন্তু যে দিন এস এস সি এর নবম – দশম এর রেজাল্ট বেরাল তখন সব কিছু যেন গণ্ডগোল হয়ে গেল । এস এস সি তে সুতপার চাকরি হল না । ওয়েটিং লিস্টে অনেক পেছনে নাম । বিক্রম জানতে পেরে খুব রেগে গেল । তার বউ এর টাকায় মদ – মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করার ইচ্ছা টা আর পুরন হল না । রেগে গিয়ে বিক্রম সুতপাকে ছড়ি দিয়ে পেটাতে লাগলো , আর বলতে লাগলো তোর বাবার কাছ থেকে ১০ লক্ষ টাকা আগে নিয়ে আসবি যা তার পর ঘরে ঢুকতে দেব । তোর মত একটা দেখতে বাজে মেয়েকে বিয়ে করে জীবন বরবাদ হয়ে গেল আমার ।

সুতপা কাঁদতে কাঁদতে বলল , “ তুমি তো বিয়ের সময় কোন পন চাও নি , তবে এখন কেন চাইছ ?”

বিক্রম চিৎকার করে বলল , বিয়ের আগে যখন জিজ্ঞাসা করেছিলাম ইন্টারভিউ কেমন হয়েছে ? তখন তুমি বলেছিলে , খুব ভালো হয়েছে , আর তুমি চাকরিটা পাবেই । তাই তোমাকে বিয়ে করেছিলাম , কিন্তু তোমার তো চাকরি হল না । আমাকে তুমি মিথ্যা কথা বলেছিলে কেন ? এখনি বেরিয়ে যাও আমার বাড়ী থেকে । তোমার বাপের কাছ থেকে যবে ১০ লক্ষ টাকা নিয়ে আসবে তবেই ঘরে ঢুকবে ।

সুতপা কাঁদতে কাঁদতে নিজের একটা কাপড়ের বড় ব্যাগ নিয়ে হুগলী স্টেশনে এসে পৌছায় , রাত ৯ টা বাজে এখন । শেষ লোকাল ট্রেন বাপের বাড়ী শামাপুর এ পৌঁছাতে রাত ১১ টা বেজে যাবে । মোবাইল ফোন টাও বিক্রম ছাড়িয়ে নিয়েছে । তাই সুতপার বাবার কাছে ফোন করে জানানোর কোন উপায় নাই ।

ট্রেন লেট ছিল ১ ঘণ্টা । শ্যামাপুর স্টেশনে ট্রেন পৌঁছাতে রাতে ১২ টা বেজে যায় । ফেব্রুয়ারি মাস হলেও এখনো শীত এর আমেজ আছে । গ্রামের ছোট স্টেশনে কোন ভেন রিকশা বা অটো এত রাতে থাকে না । ফলে সুতপা ভেবে পাচ্ছিল না প্রায় ২ কিমি পথ এত বড় ব্যাগ নিয়ে এত রাতে একা কি ভাবে বাড়ী ফিরবে । চারিদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না । অগ্যতা সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলো ।

“ একা এসেছ ? “ হটাত কারো গলার আওয়াজ শুনে সুতপা পিছন ফিরে দেখল রাজু দাঁড়িয়ে আছে একটা সাদা চাদর গায়ে জড়িয়ে । মুখটা খুব করুন , চোখ গুলো কেমন যেন জ্বলছিল ।

সুতপা রাজুকে দেখে সাহস পেল । মাথা নেড়ে বলল যে সে একা এসেছে । রাজু সুতপার হাত থেকে ব্যাগ টা নিয়ে নিজের মাথার উপরে রেখে হাঁটতে লাগলো । সুতপাও রাজুর সাথে চলতে লাগলো বাড়ীর পথে ।

সুতপা কাঁদতে কাঁদতে বলল , রাজু তুমি আমাকে মাফ করে দাও । আমি ভুল করে লোভে পড়ে এক ঘণ্টার পরিচয়েই বিক্রমকে বিয়ে করতে রাজী হয়ে যাই । বিক্রম আসলে একটা বাজে ছেলে । সে একটা প্রতারক । আমার সাথে প্রতারনা করেছে । সে আমাকে নয় , সে আমার এস এস সি পাওয়ার জন্য বিয়ে করেছিল । ভেবেছিল যে ,আমি সোনার ডিম পাড়া মুরগী একটা । চাকরি পেয়ে গেলে আমার বেতনের টাকায় ফুর্তি করবে । কিন্তু আমি চাকরি পাই নি বলে সে আজ আমাকে মেরে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে ।

সুতপা কথা গুলো একাই বলে যাচ্ছিল । রাজু কোন কথা বলছিল না । কেমন যেন বাতাসে দুলে দুলে চলছিল সে । সুতপা রাজুকে জিজ্ঞাসা করলো তার মা কেমন আছে ? কিন্তু রাজু কোন উত্তর দিল না ।

চলতে চলতে সুতপার বাপের বাড়ীর গেট এর কাছে এসে রাজু ব্যাগ টা মাথা থেকে নামিয়ে রাখল । সুতপা দরজার কড়া নাড়তে বাবা মা আর সকলে বাড়ী থেকে বেরিয়ে এসে সুতপাকে এত রাতে এই ভাবে দেখে খুব অবাক হল । সুতপা কাঁদতে কাঁদতে ব্যাগ নিয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে পিছন ফিরে দেখল রাজু নেই । কখন যে চলে গিয়েছে তা বিন্দুমাত্র টের পায় নি সুতপা ।

বাড়ীর সকলকে প্রথম থেকে সব ঘটনা বলল সুতপা । বিক্রম যে একটা প্রতারক তা জানালো । সকলে শুনে খুব দুঃখ করতে লাগলেন । কিন্তু সুতপা যখন বলল যে , এত রাতে স্টেশন থেকে তার এই ভারী ব্যাগ টা রাজু মাথায় নিয়ে আর তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে তার বাড়ীতে ছেড়ে দিয়ে গিয়েছে – এই কথা শুনে সকলে অবাক হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া – চাই করতে লাগলো ।

বাবা বললেন, সুতপা তুই এটা ভুল কথা বলছিস , এটা হতে পারে না । রাজু ব্যাগ বয়ে আনতে পারে না ।

সুতপা দিব্যি খেয়ে বলল ," রাজুই আমাকে সঙ্গে নিয়ে আর আমার ভারী ব্যাগ মাথায় করে নিয়ে এসেছে । না হলে এত রাতে আমি একা কি করে আসতাম , আমার কোন বিপদ হয়ে যেতে পারত" ।

বাবা এবার ধীর কণ্ঠে বললেন , "রাজু তিন দিন আগে শ্যামাপুর স্টেশনে রেলে লাইনে সুইসাইড করেছে । তার দেহ দাহও করা হয়ে গিয়েছে । মৃত ব্যাক্তি কি ভাবে তোকে সাহায্য করতে পারে "?

বাবার কথা গুলো শুনে সুতপার গোটা দেহে একটা ঠাণ্ডা শিহরন খেলে গেল । তাহলে ও কে যে তাকে বিপদে সাহায্য করলো ?

লোকে বলে – “ভালোবাসা কোন দিন মরে না , শুধু মানুষরাই মরে যায় “।

.............................. সমাপ্ত .........................





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?