প্রতিদান / তারিফ আলম ( গল্প )

3rd September 2023 10:32 am তারিফ আলম
প্রতিদান / তারিফ আলম ( গল্প )


গল্প - প্রতিদান 

লেখা - তারিফ আলম 

নার্স মিলন বাবুর হাতে একটা কাগজের টুকরো ধরিয়ে দিয়ে বললেন ," এই ইনজেকশন টা কিনে আনুন তাড়াতাড়ি , তা না হলে আপনার স্ত্রীকে বাঁচানো সম্ভব হবে না "।

মিলন বাবু একবার স্ত্রীর কাছে গিয়ে মাথায় হাত বোলালেন ,এখনও জ্ঞান ফিরে নি । গতকাল রাতে আচমকাই বুকে ব্যাথা শুরু হয়ে যায় । গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার গজানন দেখে বলে যে দ্রুত মেদিনীপুর হসপিটালে নিয়ে যান , দেরি করলে আর রক্ষে নাই । তাই ভোরে ট্যাক্সি ভাড়া করে স্ত্রীকে গ্রাম থেকে মিলন বাবু মেদিনীপুর হসপিটালে নিয়ে এসে ভর্তি করেছেন ।

গ্রামের একজনের ফোন থেকে ছেলে অরবিন্দকে ফোন করেছিলেন । কিন্তু মিলন বাবু কথা বলার আগেই ছেলে ব্যস্ত আছি বলে ফোন কেটে দিয়েছিল । আরও কয়েকবার ফোন করলেও সে ফোন তুলে নি । একমাত্র ছেলে মেদিনীপুর শহরে একটা নামী কোম্পানিতে ম্যানেজার , বউ আর তার এক ছেলে রবি কে নিয়ে মেদিনীপুর এ থাকে । মাসে মাসে ৩ হাজার টাকা করে গ্রামে পাঠায় বৃদ্ধ বাবা মা এর জন্য । এই ভাবেই সে তার বাবা মা এর ভালোবাসার প্রতিদান দিয়ে চলেছে ।

মিলন বাবু হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ওষুধ দোকানে গিয়ে কাগজ টা দেখাতে ওষুধ দোকানী ইনজেকশন এর দাম বলে ১২০০ টাকা । কিন্তু মিলন বাবুর কাছে মাত্র ১৫০ টাকা মতো বাকি আছে । যা ছিল তা গাড়ি ভাড়া আর অন্যান্য ওষুধ করে সব শেষ হয়ে গিয়েছে । তাই আর দেরি না করে ছেলের বাড়ীর উদ্দেশ্যে একটা অটো ধরে রওনা দিলেন । অনেক দিন পূর্বে একবার ছেলে নিয়ে এসেছিল তার ভাড়া বাড়ীতে । মিলন বাবু যথাস্থানে পৌঁছে বাড়ীতে গিয়ে দেখলেন অচেনা সব মানুষ ।

তিনি একজন কে তাঁর ছেলে অরবিন্দ এর কথা জিজ্ঞাসা করলেন । সে বলল যে , অনেক দিন আগে তাঁর ছেলে নাকি ভাঁড়া বাড়ী ছেড়ে নতুন ফ্ল্যাট কিনে চলে গিয়েছে ।

মিলন বাবু ওখানে উপস্থিত সকলকে তাঁর ছেলের ফ্ল্যাট এর ঠিকানা দয়াকরে জানানোর জন্য বললেন । কিন্তু কেউ অরবিন্দের নতুন ফ্ল্যাট এর ঠিকানা জানে না বলল ।

হতাশ হয়ে মিলন বাবু হসপিটালে ফিরে এলেন ।

অসুস্থ স্ত্রী এর কাছে যেতে দেখলেন তার জ্ঞান ফিরেছে , এবং ‘অরি’ ‘অরি’ করছে । অরি হল তাদের ছেলে অরবিন্দ এর ডাক নাম । স্ত্রী এর দু চোখ দিয়ে অশ্রু বের হচ্ছে ক্রমাগত । বুকে খুব ব্যাথা অনুভব করছে ।

মিলন বাবু স্ত্রী এর কষ্ট দেখতে পারলেন না । । নার্স মিলন বাবু কে দেখে জিজ্ঞাসা করলো ইনজেকশন তিনি এনেছেন কিনা ।

মিলন বাবু মাথা নেড়ে ‘ না’ বললেন ।

নার্স আবার তাড়া দিলেন আর বললেন , তাড়াতাড়ি নিয়ে আসুন , না হলে আপনার স্ত্রীকে বাঁচানো যাবে না ।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলেন । সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে নিজের ছেলের খোঁজ করতে করতে । ১১০০ টাকা আরও দরকার ইনজেকশন কেনার জন্য । কি করে যে টাকা টা জোগাড় করবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না । এখন দুর্গা পূজা চলেছে । তাই রাস্তায় অনেক মানুষের আনাগোনা । পাশেই একটা বিশাল পূজা প্যান্ডেল । খুব সুন্দর লাগছে । মিলন বাবু দেখলেন একটা বুড়ি পূজা প্যান্ডেল যাওয়ার পথের ধারে বসে আছে একটা থাল মাটিতে রেখে । পূজা দেখতে আসা মানুষ জন সেই থালাতে এক টাকা , দু টাকা , ৫ টাকা ভিক্ষে দিয়ে যাচ্ছে ।

মিলন বাবু আর দেরি না করে সেই ভিখারিনীর পাশে মাটিতে নিজের গামছা টা পেতে দিয়ে বসে পড়লেন । একটু পরে তার পাতা গামছাতেও এক টাকা দু টাকা ভিক্ষে পড়তে লাগলো ।

নিজের স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য আজ ভিখারি হতেও লজ্জা করলো না মিলন বাবুর । এমন সময় ভিড়ের মধ্যে থেকে একটা বাচ্চা ছেলে মিলন বাবুর দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে , তার বাবা মা কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো ,' ঐ দেখ দাদু" ।

মিলন বাবু দেখলেন , তাঁর ৫ বছরের নাতি রবি আর ছেলে অরবিন্দ ও বউ মা নতুন কাপড় পরে ঠাকুর দর্শনে বেরিয়েছে । সঙ্গে আরও কিছু লোক ।

অরবিন্দ বাবাকে ভিক্ষা করতে দেখে খুব রেগে কটমট করে বাবার দিকে চাইল ।

মিলন বাবু ছেলে কে দেখে বললেন, তোর মা খুব অসুস্থ , হসপিটালে ভর্তি আছে ।

অরবিন্দ এর পাশে থাকা তার কোম্পানির বস অরবিন্দকে প্রশ্ন করলো , ঐ বুড়ো ভিখারিটা কে ?

অরবিন্দ না চেনার ভান করে বলল , "জানি না , কোন পাগল ভিখারি হবে "। এই বলে ছেলে রবিকে কাছে টেনে নিয়ে মিলন বাবুর গামছায় একটাকা ভিক্ষা ছুড়ে দিয়ে অফিসের বস আর তার পরিবার এর সঙ্গে পুজা মণ্ডপের দিকে দ্রুত চলে গেল ।

ছেলের ব্যবহারে মিলন বাবুর দুঃখে কষ্টে দু চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো । তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না । সেখান থেকে উঠে হসপিটালে চলে এলেন । দেখলেন স্ত্রী চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে । দু গালে অশ্রুর রেখা শুকিয়ে গিয়েছে । বহু কষ্টের বর্ষণ হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে ।

মিলন বাবু স্ত্রী এর পাশে বসে খুব ধীর কণ্ঠে শুধু বললেন , অরি এল না গো । তাকে তোমার কাছে আনতে পারলাম না । এই বলে স্ত্রী সীমার মাথায় হাত দিলেন । খুব ঠাণ্ডা । ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডার ভয়ে তার মাথা নিজের কোলে তুলে নিলেন । এমন সময় একজন নার্স এসে বলল যে , আপনার স্ত্রী এক ঘণ্টা আগেই মারা গিয়েছেন ।

শুনে মিলন বাবুর কষ্টে বুক যেন ফেটে গেল । তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন । পূজার হই হুল্লোড় আর মাইকের শব্দে তাঁর কান্নার আওয়াজ মিলিয়ে গেল ।

........................... সমাপ্ত ........................।





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?