গল্প -" বদনাম "
লেখা - তারিফ আলম
"স্কুলে সঠিক সময় আসবেন না , ক্লাস করবেন না , ছুটি হওয়ার আগেই চলে যাবেন - এমন করা যাবে না । সব কিছুর একটা নিয়ম আছে " -কথা গুলো খুব রেগে বললেন অজিত মাইতি । কথা গুলো সকল স্কুল স্টাফ এর সামনেই মদন দাসকে উদ্দেশ্য করে বললেন । অজিত বাবু এই মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে নতুন প্রাধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেছেন মাত্র এক মাস হল । এরই মধ্যে স্কুলের শিক্ষকদের আচরন দেখে খুব বিরক্ত হয়েছেন তিনি । বিশেষ করে ইতিহাসের শিক্ষক মদন বাবুর কাজকর্ম, যা খুবই খারাপ ।
মদন বাবু দুপুর ১২ টার পরে স্কুলে আসেন আর ছুটি হওয়ার অনেক আগেই চলে যান । তিনি রাজনীতি করেন ও গ্রামের নেতা হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে থাকেন । ধূর্ত প্রকৃতির মানুষ হিসাবে সকলে তাকে চেনে বলে কেউ বিশেষ কিছু বলতে সাহস করে না । কিন্তু নতুন হেড মাস্টার মশাই সকলের সামনে তাকে এই ভাবে বকা দেবেন তা মদন বাবু ভাবেন নি ।
এবার মদন বাবু রেগে গিয়ে বললেন " আপনি এক মাস হল হেড মাস্টার হয়ে এই স্কুলে এসেছেন । কিন্তু আমাকে আপনি জানেন না । আমি এখানকার রুলিং পার্টির সভাপতি । আমার অনেক কাজ । তাই আমি স্কুলে ইচ্ছামত আসবো - যাব । কেউ আমাকে আগেও আটকায় নি আর এখনও আটকাতে পারবে না " ।
অজিত বাবু এবার মদন দাসের কথা শুনে খুব রেগে গিয়ে বললেন - " নেতাগিরি করবেন যদি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দেন । আমি ডি আই এর কাছে আপনার নামে নালিশ করবো যে আপনি ঠিকমত স্কুলে আসেন না আর ক্লাস করেন না "।
এবারে মদন বাবু রাগে গজগজ করতে করতে দ্রুত স্টাফ রুম ছেড়ে বেরিয়ে এলেন । তারপর নিজের বাইক টা নিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে গেলেন আর ভাবতে লাগলেন কি ভাবে এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া যায় ।
******
স্কুলের পাশেই অজিত বাবু ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন । মালতি নামের এক গ্রামের বয়স্ক মহিলাকে ঘরের কাজ ও রান্নার জন্য রেখেছেন তিনি । আজ রবিবার , স্কুল নেই , সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে , দশটা বেজে গেল । আনন্দবাজার পত্রিকা নিয়ে নিউজের হেডলাইন গুলোতে চোখ বুলাতে লাগলেন অজিত বাবু । এমন সময় বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে অজিত বাবু মালতি এসেছে ভেবে দরজা দ্রুত খুলতে গেলেন । দরজা খুলে দেখেন মালতি নয় , তাঁরই স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী রুপালী । তার পুরো শরীর বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছে ।
রুপালী দ্রুত অজিত বাবুকে প্রনাম করে বলতে লাগল - " আপনার বাড়িতে কাজ করে সেই মালতির আমি নাতনি । দিদিমার খুব জ্বর কাল রাত থেকে । তাই কাজ করতে আসতে পারেন নি । আমাকে পাঠিয়েছেন রান্না করে দেওয়ার জন্য । তাই আমি এসেছি স্যার" ।
অজিত বাবু একটু বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন , " তুমি আবার আসতে গেলে কেন ? আমি মুড়ি খেয়ে নিতাম । আমার কোন অসুবিধা হত না । তুমি বাড়ি ফিরে যাও "।
রুপালী দ্রুত ঘরে প্রবেশ করে বলল - "আপনি মুড়ি খেয়ে কেন থাকবেন স্যার , আমি এখনি ভাত - ডাল রান্না করে দিয়ে চলে যাব । আমার সালুয়ার কামিজ পুরো ভিজে গিয়েছে , একটা তোয়ালে পাওয়া যাবে স্যার "?
অজিত বাবু বাথরুমের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন - " বাথরুমের মধ্যে তোয়ালে আছে "।
রুপালী দ্রুত বাথরুমে গিয়ে প্রবেশ করল । অজিত বাবু আবার নিজের চেয়ারে এসে বসে আনন্দবাজার পত্রিকা পড়তে লাগলেন । কিছু দিন আগেই তিনি রাজ্য সরকার থেকে শিক্ষকতার জন্য "শিক্ষারত্ন" সম্মান পেয়েছেন । সমাজে এই ৫৫ বছর বয়সে অনেক সম্মানীয় হয়েছেন , সারা জীবন তিনি অবিবাহিত থেকে নিজের জীবনকে ছাত্র ছাত্রীদের শিক্ষাদানের ও সমাজ সেবার জন্য নিয়োজিত করেছেন । এই মোহনপুর একদম নতুন জায়গা । এখানে এক মাস হল প্রধান শিক্ষক হিসাবে এসেছেন । তবে এখানকার মানুষজনের মধ্যে শিক্ষার হার অনেক কম । তিনি চান এই এলাকার সকল বাচ্চা যাতে তার স্কুলে পড়াশুনার সুযোগ পায় সেই চেষ্টাই করে যাবেন ।
এমন সময় রুপালী এসে টেবিলে চায়ের কাপ আর বিস্কুট নিয়ে এসে রাখল । অজিত বাবু খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে রুপালীর দিকে তাকিয়ে অবাক হলেন । রুপালী একটা শুধু তোয়ালে গায়ে জড়িয়ে চা দিয়ে এসেছে ।
অজিত বাবু রেগে গিয়ে বকান দিয়ে বললেন _ " এই ভাবে কেন এসেছ এখানে "?
রুপালী ভিত স্বরে বলল - " আমার কাপড় সব ভিজে গিয়েছে , তাই তোয়ালে পরে কাজ করছি "।
অজিত বাবু নিজের একটা পাঞ্জাবী নিয়ে রুপালীকে দিয়ে বললেন সেটা পরে নিতে । এমন সময় দরজায় কারা যেন জোরে জোরে ধাক্কা দিতে লাগলো । অজিত বাবু উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই আট দশ জন লোক ঢুকে পড়ল ঘরে । তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল - " গ্রামের মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করা হচ্ছে "।
অজিত বাবু রেগে গিয়ে বললেন - " কে তোমারা ? বেরাও এখনি আমার বাড়ি থেকে , না হলে পুলিশ ডাকবো "।
এমন সময় রুপালী কাঁদতে লাগলো জোরে জোরে আর বলতে লাগল - " এই স্যার আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন । আমার গায়ে হাত দিয়েছেন জোর করে আর আমার শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করেছেন "।
অজিত বাবু রুপালীর কথা শুনে একদম অবাক হয়ে গেলেন ।
" কি আজে বাজে বলছো রুপালী , কেন মিথ্যা কথা বলছ । আমি তো তোমার সঙ্গে কোন খারাপ ব্যবহার করি নি "।
কিন্তু রুপালী কাঁদতে লাগলো আর চিৎকার করে বলতে লাগলো যে অজিত বাবু তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন ।
লোকগুলো অজিত বাবুকে ধরে টানতে টানতে ঘরের বাইরে নিয়ে আসলো ।
চিৎকার চেঁচামেচি শুনে সেখানে গ্রামের অনেক লোক জমা হয়ে গেল । খুব দ্রুত গ্রামে খবর ছড়িয়ে গেল যে স্কুলের নতুন প্রধান শিক্ষক তাদের এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করেছে ।
অজিত বাবু চিৎকার করে বলতে লাগলেন যে , তাকে ফাঁসানো হয়েছে , তিনি কোন অন্যায় করেন নি । কিন্তু কেউ তার কথা শুনতে চাইলো না । একজন চুন কালি নিয়ে অজিত বাবুর মুখে লাগিয়ে দিল । আর একজন জুতোর মালা পরিয়ে গালাগাল দিয়ে চরম অপমান করতে লাগল অজিত বাবুকে । অজিত বাবু এত অপমান কোনদিন পান নি । কস্টে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল ।
একটু পরেই মদন বাবু পুলিশ সঙ্গে নিয়ে এসে উপস্থিত হল । রুপালী পুলিশের সামনে গিয়ে বললো যে , অজিত স্যার তার শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করেছে । পুলিশ মেয়েদের কথাকে গুরুত্ব দিল , অজিত বাবুর কোন কথা না শুনে তাঁকে হাতকড়ি পরিয়ে গাড়িতে তুললো । এমন সময় মদন অজিত বাবুর কানের পাশে এসে বললেন -" কেমন লাগলো আমাকে অপমানের বদলা , এই স্কুলে আর আসবেন না ফিরে , না হলে ......" এই কথা বলে বাঁকা হাসি হেসে চলে গেল মদন ।
অজিত বাবু এবার বুঝতে পারলেন এই ষড়যন্ত্রের পিছনে মদনের হাত এর কথা । এত বড় ক্ষতি করে দেবে এই শয়তানটা - তা আগে ভাবেন নি । পুলিশের গাড়ি ছেড়ে দিল । অজিত বাবু গাড়ির জানালা দিয়ে দেখতে লাগলেন তাঁর স্কুলকে ।
আইন এমন কেন , শুধু মেয়েদের কথা শুনে ছেলেদের দোষী বানিয়ে দেয় , সমাজও তাই করে । সম্মানহানি করে সম্মানীয় মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় ।
কবে এর পরিবর্তন হবে , মেয়ের মত ছেলেদের কথাও সমান গুরুত্ব পাবে -- সেটা হয়তো সময়ই বলবে ।
---- সমাপ্ত ---