প্ৰবন্ধ :- " সংঘ জননী " মা সারদা দেবী "
লেখক :- ডঃ গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
***
(ব্রহ্মলীন দিবস ২০শে জুলাই ,উপলক্ষ্যে ভক্তিপূর্ণ প্রণাম এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ)
💐💐💐
" আমি মা থাকতে কিসের ভয় ..."
সাংগঠনিক শক্তি এবং দার্শণিক বিচার ধারা কেবল মাত্র উচ্চ শিক্ষার দ্বারাই অর্জন করা যায়, এটা যে একটা ভ্রান্ত ধারণা তার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের এবং শ্রীশ্রী মা সারদা দেবীর জীবনী অধ্যয়নে। স্রেফ অন্তরাত্মাকে যদি জাগিয়ে অন্যের সুখ - দুঃখের অনুভুতিকে একাত্ম হয়ে বিশুদ্ধ চিত্তে অনুভব করা যায়, তবে, আত্মদর্শণের সঙ্গে সঙ্গে দর্শণশাস্ত্রের অতি নিগুঢ় তথ্য অতি সহজে একাএক অন্তরে উদিত হতে পারে। এর জন্যে কোন পন্ডিতের অথবা বিদ্যালয়ের থেকে অধ্যয়ন করে জ্ঞান উপার্জিত করার আবশ্যকতা নেই। সমদর্শণ এবং সমানুভুতির অনুভব মিলে জন্ম দেয় চিত্তে সর্বজীবে একই ব্রহ্মস্বরূপ আত্মদর্শন, জানা যায় অন্যের অন্তরের ভাব। অনুভব করা যায় অন্যের অন্তরের ব্যথা, ব্যথিত হয়ে কেঁদে ওঠে মন, আবার নেচে ওঠে মন আনন্দে ! হৃদয়ে জাগে দূরদৃষ্টী এবং সাংগঠনিক ক্ষমতা। জগৎ উদ্ধারে, জনকল্যাণে অদম্য নীরলস সক্রিয়তা। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সহধর্মিনী বা লীলাসঙ্গিনী মা সারদা দেবীও তার ব্যাতিক্রম ছিলেন না। মাতৃস্নেহের সুধাধারায় বহিয়ে দিলেন সংসার। জগতে পূজীতা হলেন সবার "মা" রূপে। সত্যিকারের মা। অভয়দায়িনী,স্নেহময়ী মা। যিনি একাধারে জগত জননী রক্ষাকর্তী মা দূর্গা আবার অন্যরূপে লোকশিক্ষা প্রদায়নী জ্ঞানদায়িনী মা সরস্বতী। মাতৃস্নেহে যে আছে অপরিসীম সাংগঠনিক শক্তি, তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মা সারদা দেবী।
সাক্ষাত চণ্ডীর অংশ রূপাদেবী মা সারদা, মানব শরীর ধারন করে এসেছিলেন মর্তে মানব কল্যাণ সাধনে। জগৎ সংসারের অর্ধচেতন সমাজে মানবিক বোধকে জাগিয়ে তুলে জন উন্নয়নের কাজ এবং জীবে দয়া প্রেমবোধকে ভাতৃত্বের বন্ধনে সংগঠিত করে বিশ্বের কল্যাণের সাথে সাথে স্থায়ী শান্তি সংস্থাপনের জন্যে । শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের বিচার এবং ভাবধারায় সমভাবে অনুপ্রানিত - সমর্পিত মা সারদা দেবী। সন্তানদের সংগঠিত করে প্রতিষ্ঠা করলেন সংঘ। শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অনুপ্রানিত করে শিক্ষা দিয়ে উৎসাহিত করলেন মানব কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে। সেই কারনেই আজ বিশ্ব পেয়েছে স্বামী বিবেকানন্দকে। শক্তিশালী স্তম্ভের মতো সংগঠিত হয়ে সৃজিত হতে পেরেছে শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের ভাবধারায় বিশ্ব প্রসিদ্ধ রামকৃষ্ণ মিশন এবং মঠের মত বিশাল এক সংগঠন। মায়ের কৃপায় চলছে জগৎ জুড়ে মানবকল্যাণে এবং সার্বিক উন্নয়ের জন্য ঠাকুর এবং মায়ের সন্তানদের নিঃস্বার্থ সেবা প্রদান। জনকল্যাণে মায়ের সর্বদা চিন্তা, সর্ব জীবকে সন্তানরূপে দর্শণ মায়ের বিশাল হৃদয় এবং মানসিকতার পরিচয় পরিলক্ষিত হয় মায়ের বাল্যকালের সহ পরবর্তীকালের অনেকানেক ঘটনা থেকে। স্নেহময়ী মা যে সত্যিকারের মা, জগৎ রক্ষাকর্তী জননী, মা দূর্গা। জ্ঞানদায়িনী,বাগদেবী ব্রহ্মাণী মা সরস্বতী। যার প্রমাণ পেয়েছিলেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ। বিশ্বাস করেছিলেন মায়ের শক্তিকে। শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের অপূর্ণ কার্যকে পূর্ণরূপ প্রদান করলেন শক্তিময়ী মা সারদা দেবী, প্রতিষ্ঠিত করলেন বিশ্বে শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবধারার। কী অপরিসীম মায়ের স্নেহময় সাংগঠনিক শক্তি ! জগৎ জননী দেবী ও ব্যাতিক্রমিত হননি সৃষ্টীর সৃষ্ট বিধান থেকে।
২০শে জুলাই নশ্বর দেহত্যাগ করে রামকৃষ্ণলোকে যাত্রা করলেন। সন্তানদের অভয় দিয়ে বলে গেলেন "আমি সত্যিকারের মা, শুধু গুরুপত্নী নই, পাতানো মা নই, মুখের কথার মা নই - সত্যিকারের মা"!
" কিসের ভয় বেটা, সর্বদা জানবে ঠাকুর তোমার পেছনেই আছেন। আমি আছি, আমি মা থাকতে তোমার কীসের ভয় ?"
" যেমন আমি সচ্চরিত্রবানের মা, তেমনই পাপী - তাপীর ও মা। যদি কখনো কোন ভীষন বিপদে পড় , ভয় নেই জানবে তোমার একজন মা আছেন।"
স্বামী অভেদানন্দ মহারাজ কৃত মায়ের স্তবে কী সুন্দর বর্ণনা -
" প্রকৃতিং পরমামভয়াং বরদাং , নররূপধরাং জনতাপহরাং।
শরণাগত - সেবকতোষকরীং , প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম॥"
অর্থাত -
পরমাপ্রকৃতি যিনি অভয়া ও বরদা নরদেহে অবতীর্ণা, যিনি জীবদুঃখহারিণী এবং শরণাগত সেবকের যিনি আনন্দ - বিধায়িনী সেই সর্বারাধ্যা জগজ্জননীকে প্রণাম করি॥
" জননীং সারদাং দেবীং রামকৃষ্ণং জগদ্গুরুম।
পাদপদ্মে তয়োঃ শ্রিত্বা প্রণমামি মুহুর্মুহুঃ॥"
জগজ্জননী দয়াময়ী , অভয়দাত্রী, স্নেহময়ী মা সারদা দেবীর শ্রীচরনে জানাই অমার সাষ্টাঙ্গ প্রণাম।
জয় মা, জয় ঠাকুর, জয় স্বামীজী।