গল্প - আশা
লেখা - তারিফ আলম
ভোরে মোবাইল টা বেজে উঠতেই বরুন সামন্ত দ্রুত হাতে মোবাইল টা নিয়ে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে দীপালির গলা । খুব ধীরে জিজ্ঞাসা করলো , “ কেমন আছো “ ?
বরুন বলল , “ ভালো আছি । সাত টা থেকে ভোট শুরু হবে । আমাদের প্রিজাইডিঙ্গ অফিসার খুব ভালো । “
তুমি কেমন আছো ? ডক্টর কি বলল ?
দীপালি শান্ত স্বরে বলল , “ পেন হচ্ছে , ডক্টর বলেছেন যে কোন সময় ডেলিভারি করতে হতে পারে । তুমি এই সময় পাশে থাকলে খুব ভালো হত “।
দীপালির কথা গুলো শুনে বরুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল , স্কুল টিচার সে । দীপালিকে কলেজ জীবনে থেকেই ভালোবাসতো । চাকরি পাওয়ার পর বিয়ে করে । বিয়ের চার বছর পর এই প্রথম বাচ্চা হবে বউ এর । দু জনেই খুব আনন্দে ছিল । অনেক স্বপ্ন দেখেছে নিজের সংসার নিয়ে । দীপালি এমনিতে খুব ভীতু । বাচ্চা হওয়ার সময় বরুন তার পাশে থেকে তাকে সাহস জোগাবে ভেবেছিল । কিন্তু ভোট এর দিন পড়ে গেল । তাকে ফাস্ট পোলিং অফিসার করে পাঠানো হয়েছে । আজ ভোট ।
দীপালি কে ফোনে বরুন একটু সাহস জোগাতে চেষ্টা করলো, “ ভগবান আছেন সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে “। তারপর ফোন টা রেখে দিল । কারন ভোট নেওয়ার জন্য তাকে তৈরি হতে হবে ।
শনিবার রাতে দীপালির হটাতই পেটে ব্যথা টা বেড়ে গিয়েছিল । ডাক্তার ২২ তারিখ সময় দিয়েছিলেন বাচ্চা হওয়ার , কিন্তু ১২ তারিখ রাত থেকেই কষ্টে কাঁদছিল দীপালি । বরুন আর বউ এর কষ্ট দেখে সহ্য করতে পারে নি । রাতেই এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে মেদিনীপুর নার্সিংহমে এনে ভর্তি করে দিয়েছিল । ভোটের ডিউটি থাকায় পরদিনই তাকে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে । বরুন এর বাবা আর বোন দীপালির সঙ্গে আছে । এই সময় বউ এর পাশে থাকতে না পেরে মনে মনে খুব কষ্ট পাচ্ছিল সে ।
******* সাত টা থেকেই ভোট গ্রহন শুরু হয়ে গেল । লাইন দিয়ে অনেকে ভোট দিচ্ছেন । নিরাপত্তা কর্মী বেশি নেই । কয়েকজন সিভিক পুলিস এর দেখা পাওয়া গেল ।
ভোটের কাজে বরুন ব্যস্ত হয়ে পড়লেও তার মন পড়ে রয়েছে দীপালির কাছে । দীপালি খুব ভয় পেত বাচ্চা হওয়ার আর অপারেশন এর কথা শুনে । সামান্য ইনজেকশনই নিতে চাইত না । বরুন হাত ধরে রাখলে তবেই নিত ।
কথা গুলো ভাবতেই খুব খারাপ লাগছিল বরুনের । কাজের মাঝে ফোন করারও উপায় নাই । শুধু ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছিল সে , যাতে তার বউ এর ডেলিভারি ভালো ভাবে হয়ে যায় ।
দুপুর হতেই দূরে বিকট ধরনের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যেতে লাগলো । পিজাইডিঙ্গ অফিসার অজিত বাবু ভয়ে বরুন এর পাশে এসে বললেন , “গণ্ডগোল বাঁধল মনে হয় “ ?
বরুন জিজ্ঞাসা করলো ,” আপনি ফোন করে বিষয় টা উচ্চ আধিকারিকদের জানান যাতে তারা বেশি সংখ্যক পুলিশ কর্মী পাঠায় আর আমাদের নিরাপত্তা দেয় “।
অজিত বাবু ফোন করতে লাগলেন । হটাত বিকট একটা শব্দ হল একেবারে ভোট কক্ষের জানালার পাশে । বোমা মারা হয়েছিল । যারা ভোট দিতে এসেছিলেন তারা যে যে দিকে পারলেন ছুটে পালাতে লাগলেন । ভোট কক্ষের মধ্যে ধোঁয়ায় ভোরে গিয়েছে । বরুনও ছুটে দরজা দিয়ে বাইরে বেরাতে যাবে এমন সময় একটা বোমা এসে তার সামনে পড়ল । ধোঁয়ায় ভোরে গেল চারিদিক । বরুন এর চোখে অন্ধকার নেমে এল । একটু পর চোখ খুলতেই দেখল তার জামা কাপড় রক্তে ভিজে গিয়েছে । সমস্ত শরীর এ ভীষণ এক কষ্ট । শরীর এর অনেকটা অংশ পুড়ে গিয়েছে । যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো বরুন । অজিত বাবু আর কয়েকজন নিরাপত্তা রক্ষী ছুটে এল বরুন এর কাছে । তাকে সকলে মিলে ধরে গাড়িতে তুলল । বরুন গাড়িতেই জ্ঞান হারাল ।
********* যখন বরুন এর জ্ঞান ফিরল সে দেখলো নার্সিংহোম এর ব্যাডে শুয়ে আছে । পাশে বোন বসে কাঁদছে । বৃদ্ধ বাবা ঝুঁকে আছেন বরুন এর মুখের উপরে । তাঁরও চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল ।
বরুন খুব কষ্টে ধীরে বাবার কাছে জানতে চাইল , দীপালি কেমন আছে ?
বরুন এর বাবা দিপক বাবু চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন , “ দীপালিকে অপারেশন থিয়েটার এ নিয়ে যাওয়া হবে এখন “। এই নার্সিংহোম এর প্রসূতি বিভাগে আছে সে ।
বোন কে বরুন বলল ফোনটা লাগাতে দীপালিকে । বোন মিনু ফোন টা লাগিয়ে বরুন এর কানের কাছে ধরল । ওপাশ থেকে দীপালির গলা । প্রথমেই দীপালি বলে উঠলো , “ তোমার ভোট নেওয়া শেষ হল ? কখন আসবে ? কোন অসুবিধা হয় নি তো “?
বরুন খুব ধীরে বলল , “ ভালো আছি । ভোট শেষ । আমি কিছুক্ষনের মধ্যেই ফিরবো । তুমি ভয় পেয়ো না । দেখ আমাদের সুন্দর ফুটফুটে একটা মেয়ে হবে । ঠিক তোমার মত । আমি কোলে নিয়ে খুব আদর করবো তাকে । ওর নাম রাখবো আশা । “ কথা গুলো বলতে বলতে বরুন এর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো , কান্নায় গলা ধরে এল ।
দীপালি বুঝতে পারল বরুন কাঁদছে । দীপালি বরুনকে বলল , “ কেঁদো না গো । তুমি এই সময় আমার পাশে থাকতে পারো নি বলে যে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে তা বুঝতে পারছি । তুমি টেনশন করো না গো । আমি ভয় পাবো না । তুমি ভোটের কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি এখনে চলে এসো “।
বরুন অনেক কষ্টে বলল ,” হ্যাঁ , আসব “। এই বলে ফোন রেখে দিল ।
*********** বরুন এর কষ্ট টা ক্রমাগত যেন বেড়েই চলেছে । সেলাইন চলছে । বার বার ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে । ওদিকে অপারেশন থিয়েটারে দীপালিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ।
কিছুক্ষন পরে বোন মিনু এসে জানাল যে , “বউ দি এর সুন্দর ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছে । বউদি এর এখন জ্ঞান ফিরে নি । তবে ডক্টর বলেছেন কোন অসুবিধা নেই । দুজনেই ভালো আছে “।
বরুন এর এত কষ্টের মধ্যেও মন প্রান আনন্দে ভরে গেল । ভগবান তার মনের কথা শুনেছেন । একটা ফুটফুটে মেয়ে দিয়েছেন । দীপালিও সুস্থ আছে ।
বাবা কে বরুন বলল যে , সে দীপালি আর তার মেয়ে কে দেখতে চায় ।
দিপক বাবু ডক্টর এর কছে গিয়ে জানালেন । একটু পরে নার্স একটা হুইল চেয়ার নিয়ে আসলো । তাতে বরুনকে সবাই ধরাধরি করে বসিয়ে নিয়ে গেল দীপালি আর তার মেয়ে যে রুম এ ছিল ।
বরুন দেখল দীপালি শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে । পাশে তাদের ছোট মেয়ে । তাদের আশা শুয়ে । কি সুন্দর । বরুন এর ইচ্ছে করছিল উঠে গিয়ে কোলে তুলে নিতে তার মেয়েকে । বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু এঁকে দিতে দীপালির কপালে । কি আনন্দ । তাদের দুজনের স্বপ্ন , তাদের আশা ।
একটু উঠার চেষ্টা করতেই কষ্ট টা আরও বেড়ে গেল বরুনের । নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে । সামনের সব কিছু আবছা হয়ে যাচ্ছে । দীপালি , আশা - তাদের মুখ গুলো আর দেখতে পাচ্ছে না । এখন ধীরে ধীরে চোখের সামনে অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে ।
বরুন চিৎকার করে দীপালিকে ডাকতে চাইছে , কিন্তু গলা থেকে আর কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না । শুধু চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল । অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে দীপালি, আশা , বাবা ,বোন সবাই ।
চিৎকার করে ভগবান এর উদ্দেশে বলতে ইচ্ছা করছিল –“ আমি মরতে চাই না ভগবান , দীপালি আর আশা কে নিয়ে বাঁচতে চাই , আমাকে মেরো না গো .........আমাকে মেরো না .........”
.................সমাপ্ত .........