ছোটগল্প --- গুরুদক্ষিণা
লেখা- তারিফ আলম
স্কুলের প্রার্থনা শেষ হতেই সাব্বির ছুটে গিয়ে অফিস রুমে সকল শিক্ষক – শিক্ষিকাদের মধ্যে তার প্রিয় শিক্ষককে খুঁজতে লাগল । কিন্তু দেখতে পেল না । পিছন থেকে রবি স্যার ডেকে বললেন , কাকে খুঁজছ ?
সাব্বির ভয়ে ভয়ে বলল , জুগজিত স্যারকে । তাঁর এখন ক্লাস আছে ।
রবি স্যার একটু ভেবে নিয়ে বললেন , জুগজিত বাবু আসেন নি । ক্লাসে বসবে যাও , অন্য স্যার যাচ্ছেন ক্লাস নেবেন ।
স্যার আসেন নি শুনে সাব্বিরের মন টা খুব খারাপ হয়ে গেল । সব্বির বেলদা গঙ্গাধর একাডেমী এর ক্লাস সেভেন এর ছাত্র । তাদের বাংলা ক্লাস টা জুগজিত নন্দ বাবু নিতেন । তিনি যখন ক্লাসে পড়াতেন তখন সাব্বির এর খুব ভাল লাগত । অন্য সকল স্যার ভালো বুঝিয়ে পড়ালেও জুগজিত স্যার এর পড়ানো খুবই ভালো লাগতো সাব্বিরের । স্যারও প্রতিদিন সাব্বিরের সাথে কোন না কোন কথা বলতেন । সাব্বির প্রতিদিন বাংলা সব পড়া করে আসতো এবং স্যার কোন প্রশ্ন করলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়ে দিত বলে স্যারও খুব ভালোবাসতেন সাব্বিরকে ।
কিন্তু কিছুদিন ধরে জুগজিত স্যার আর স্কুল আসেন না । সাব্বিরের মন খুব খারাপ । প্রতিদিন স্কুলে পৌঁছে প্রথমে কমন রুমে গিয়ে চারিদিকে খুঁজে দেখে স্যার এসেছেন কি না , তারপর ক্লাসে যায় । জুগজিত স্যার এর অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন স্যার বাংলা ক্লাস টা নেন । অন্য স্যাররা ভালো পড়ালেও সাব্বিরের পড়ায় মন লাগে না , মনমরা হয়ে বসে থাকে চুপ করে ।
স্কুল থেকে বাড়ী প্রায় তিন কিমি পথ । হেঁটেই যাতায়াত করে ১৩ বছরের ছোট্ট ছেলে সাব্বির । অনেকটা পথ হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যাথা হয়ে যায় । একটা সাইকেল কিনার খুব ইচ্ছা । লাল রঙের ছোট হিরো সাইকেল । তার বন্ধু দিনেশ এর আছে । একবার তার কাছ থেকে চেয়ে চালাতে গিয়ে সাইকেল টা লিক হয়ে গিয়েছিল বলে দিনেশ তাকে খুব খারাপ ভাষায় গালাগাল করেছিল আর মেরেছিল । বাড়ীতে ফিরে সাব্বির অনেক কান্নাকাটি করেছিল আর বাবাকে নতুন সাইকেল কিনে দেওয়ার জন্য বলেছিল । বাবা বলেছিলেন নতুন একটা সাইকেল এর দাম ১৫০০ টাকার কম হবে না । এক সাথে এত টাকা আমি দিতে পারবো না ।
শুনে সাব্বিরের খুব কষ্ট হয়েছিল । পরদিন বাবা বাজার থেকে একটা মাটির ভাঁড় এনে দিলেন , আর বললেন , এই ভাঁড়ে প্রতিদিন একটু একটু করে টাকা জমা । যখন বেশি হয়ে যাবে তখন ভেঙ্গে একটা সাইকেল কিনে দেব ।
সাব্বির খুশি হয়েছিল এবং সেই দিন থেকে বাবা টিফিন আর টলিরিস্কা করে স্কুলে যাওয়ার জন্য যে দু – তিন টাকা দিত তা বাঁচিয়ে সেই ভাঁড়ের মধ্যে ভরে রাখতো । ভাঁড় টা ভর্তি হয়ে গেলে সেটা ভেঙ্গে বাবা একটা সাইকেল কিনে দেবেন । আর তখন তাকে কষ্ট করে এত দূর পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হবে না । নতুন সাইকেলে চেপে যাবে ।
সাব্বির এর কয়েকদিন থেকে ভীষণ মন খারাপ । জুগজিত স্যার এর কথা সব সময় মনে পড়ে ।
মা যখন নামাজ পড়ে আল্লাহ এর কাছে দুয়া চান , তখন ছোট্ট সাব্বির মা এর পাশে হাত জড় করে বসে থাকে । মা একটু অবাক হয়ে বললেন , কি করছিস ?
সাব্বির মাকে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে তুমি কি করছ ?
মা হেসে বলেন , আল্লাহ এর কাছে দুয়া চাইছি যাতে তোদের আল্লাহতালা ভালো রাখেন ।
সাব্বিরও ধীরে বলল , আমিও তো আল্লাহতালার কাছে দুয়া চাইছি ।
মা একটু হেসে বললেন , তুই কার জন্য চাইছিস ।
সাব্বির বলল , জানো মা , আমাদের স্কুলের একজন বাংলা্র স্যার আছেন । খুব ভালো পড়ান । আমাকেও খুব ভালো বাসেন । কিন্তু তাঁর কি একটা খুব বড় অসুখ করেছে । তিনি আর স্কুলে আসেন না । তাঁর জন্য দুয়া চাইছি । তিনি যেন ভালো হয়ে যান আর আবার স্কুলে আসেন ।
মা ছেলের কথা শুনে খুশি হয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন ।
কয়েক দিন পর সাব্বিরের বাবা আব্দুল বাবু ছেলেকে কাছে ডেকে বলেন, তোর ভাঁড় টা নিয়ে আয় । ভেঙ্গে দেখি কত টাকা হল । বাকি টাকা লাগিয়ে একটা সাইকেল কিনে দেব । এত দূর আর কষ্ট করে হেঁটে স্কুল যেতে হবে না । সাইকেল নিয়ে যাবি ।
বাবার কথা শুনে সাব্বিরের কোন আনন্দ তো হলই না , বরং ভয় পেয়ে গেল । আমতা আমতা করে বলল , আমি হেঁটেই যাব স্কুল । সাইকেল এর দরকার নেই ।
আব্দুল বাবু একটু অবাক হলেন , যে সাইকেল কেনার জন্য এত কান্না- কাটি , আর আজ যখন সাইকেল কিনে দেবেন বলছেন তখন ছেলে না বলছে ।
তিনি বললেন , আচ্ছা , মাটির ভাঁড় টা নিয়ে আয় ।
এবারে সাব্বির খুব ভয় পেয়ে গেল । আদুরে গলায় বলল , ভাঁড় টা নেই ।
তার মা রান্না ঘর থেকে সব কথা শুনছিলেন , দ্রুত বেরিয়ে এসে সাব্বির কে উদ্দেশ্য করে বললেন , ভাঁড় নেই মানে , কোথায় গেল ?
সাব্বির একদম চুপ ছিল । কোন কথা বলছিল না ।
তার মা যেখানে ভাঁড় রাখা ছিল সেখানে খুঁজে দেখলেন । কিন্তু পেলেন না । সিঁড়ির নীচে হটাত দেখলেন কিছু মাটির ভাঙ্গা টুকরো । টুকরো কয়েকটা কুড়িয়ে এনে রেগে চিৎকার করে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বললেন , এই তো মাটির ভাঁড়ের ভাঙ্গা । ভাঁড় ভেঙ্গে তোমার ছেলে টাকা বের করে নিয়েছে দেখ । কোথায় গেল টাকা । এক বছর থেকে তো টাকা জমাচ্ছিল । প্রায় ভর্তি হয়ে এসেছিল ভাঁড় টা ।
আব্দুল বাবু জিজ্ঞাসা করলেন , টাকা নিয়ে কি করলি ?
সাব্বির মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল ।
মা এবারে রেগে গিয়ে একটা ছড়ি দিয়ে সাব্বিরকে পেটাতে লাগল এবং জিজ্ঞাসা করতে লাগল টাকা কোথায় গেল ?
সাব্বির মায়ের হাতে মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল , ওটা তো আমার টাকা , আমি নিজে জমিয়েছিলাম । আমি খরচ করে দিয়েছি । আর আমার সাইকেলও দরকার নাই । আমি হেঁটেই স্কুলে যাব ।
আব্দুল বাবু সব শুনে স্ত্রীকে বারন করলেন , সাব্বির কে যেন আর না মারে ।
আব্দুল বাবু আদর করে বললেন , আচ্ছা , ঠিক আছে যাও । তোমার টাকা তুমি খরচ করেছ । কেউ আর বকবে না তোমায় । এখন খেলা করবে যাও ।
ছেলে যে খুব জেদি তা আব্দুল বাবু জানেন । সে যখন বলতে চাইছে না তখন যতই মারপিট করা হক না কেন সে বলবে না । অন্য ভাবে এর খোঁজ করতে হবে পায়সা গুলো নিয়ে সে কি করল । এত হিসাবী ছেলে বাজে খরচ তো করবে না ।
পর দিন আব্দুল বাবু দেখলেন দিনেশ স্কুল থেকে সাইকেল নিয়ে বাড়ী ফিরছে । তাকে দাঁড়াতে বললেন । দিনেশ সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়ালে আব্দুল বাবু জিজ্ঞাসা করলেন , সাব্বির এর কাছে তুমি বেশি টাকা দেখেছো । কোন কিছু কি সে স্কুলে কিনেছে ?
দিনেশ একটু ভেবে নিয়ে বলল , হ্যাঁ । ৬২৫ টাকা ছিল সাব্বিরের কাছে ।
এবার আব্দুল বাবু একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন , সে টাকা কি করেছে তা কি তুমি জানো ?
সে মাথা নেড়ে জানে বলল ।
কি করেছে টাকা গুলো ?
দিনেশ বলল যে , আমাদের স্কুলের বাংলার স্যার জুগজিত নন্দ বাবুর একটা কিডনি নষ্ট হয়ে গিয়েছে । তিনি হাসপাতালে ভর্তি আছেন । অপারেশন হবে । আমাদের স্কুলের সকল ছাত্ররা মিলে টাকা সংগ্রহ করছে নিজেদের উদ্যোগে । যে যেমন অর্থ দিতে পারে সেই ফান্ডে । সেই টাকা ছাত্রদের পক্ষ থেকে স্যার এর অপারেশন এর খরচ এর জন্য দেওয়া হবে । আমরা সবাই ১০ টাকা ২০ টাকা করে দিয়েছি । কিন্তু সাব্বির একা ৬২৫ টাকা দিয়েছে । আমি দেখে জিজ্ঞাসা করলাম , এত টাকা কোথায় পেলি ? তখন সাব্বির বলেছিল , সেটা তার টাকা , সে নাকি জমিয়েছে ।
আব্দুল বাবু সব শুনে অবাক হলেন নিজের ছোট্ট সাব্বিরের তার শিক্ষক এর প্রতি ভালোবাসা দেখে ।
দিনেশ আঙ্গুল দেখিয়ে বলল , ঐ যে সাব্বির দূরে হেঁটে হেঁটে আসছে । আসলে তাকে খুব মারবেন । খুব বদমাশ ।
আব্দুল বাবু দূরে তাকিয়ে দেখলেন তাঁর ছোট্ট সাব্বির হেঁটে হেঁটে আসছে । পাশে আসতেই ক্লান্ত সাব্বিরকে কোলে তুলে নিয়ে চুমু খেলেন।
আমার মিষ্টি ছেলে । এমন সুন্দর মনের ছেলে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার ।
তারপর দিন একটা নতুন বড় মাটির ভাঁড় নিয়ে এসে সাব্বিরের হাতে দিলেন । সাব্বির দেখে আনন্দে বাবা কে জড়িয়ে ধরল । তার চোখে আনন্দের অশ্রু ছিল । কান্না জড়ানো গলায় বলল , আমি আবার টাকা জমাবো বাবা , এবার টাকা জমলে সাইকেল কিনব । লাল রং এর সুন্দর ছোট হিরো সাইকেল ।