গল্প - *অপেক্ষা *
লেখা - তারিফ আলম
***
রোজিনা বিবি মেয়েকে মিনতির সুরে বললেন ... ফোন টা আর একবার তোর দাদা কে লাগা , কথা বলতে খুব ইচ্ছা করছে ।
মেয়ে নাসিমা দোকানে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল । নতুন একটা কাজ পেয়েছে গ্রামের একটা টেলারিং দোকানে । মাসে দেড় হাজার টাকা করে পারিশ্রমিক পায় । তাতেই তাদের সংসার কোন রকমে চলে । বাবা মারা যাওয়ার পর তাদের সংসার এর হাল দাদাই ধরেছিল । কিন্তু বিয়ে হওয়ার পর কেমন যেন দাদা পাল্টে যায় । বউ দি চাইতো না যে নসিমা ও তার মায়ের জন্য তার দাদা টাকা খরচ করুক । অশান্তি লেগে থাকতো । তাই নসিমা কলেজ এ পড়া বন্ধ করে দর্জি দোকানে কাজ করে ।
নাসিমা এর পূর্বে অনেক বার তার দাদা কে ফোন করেছে । কিন্তু দাদা সব বারই ফোন কেটে দিয়েছে । তার বউ দি মায়ের সাথে তিন মাস আগে ঝগড়া করে দাদাকে সঙ্গে নিয়ে তার বাপের বাড়ী চলে যায় । আর দাদা ফিরে নি । একবার ফোন করে মা কে জানিয়ে দেয় যে , সে আর ফিরবে না ।
তবুও মা রোজ অপেক্ষা করেন ছেলের বাড়ী ফিরার জন্য । নামাজ পড়ে আল্লার কাছে কাঁদতে কাঁদতে প্রার্থনা করতে থাকেন যাতে ছেলে বাড়ী ফিরে আসে । আসলে মা দাদা কে যে খুব ভালোবাসেন ।
আজকে দাদার জন্ম দিন , তাই মা ভোর থেকে উঠে নিজের হাতে পায়েস রান্না করেছেন । দাদা আসবে না , কিন্তু মায়ের মন মানে না । প্রতি বার জন্মদিনে মা দাদার জন্য পায়েস রান্না করে খাওয়াতেন খুব আদর করে ।
নাসিমা মায়ের করুন মুখের দিকে চেয়ে দেখল ... তারপর ফোন টা নিয়ে দাদা কে ফোন লাগাল । কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোন টা তুলল , তবে দাদা নয় , বউদি । কর্কশ গলায় বিরক্তির স্বরে বউদি বলল ... কি দরকার ? বার বার ফোন করছ কেন ? আমাদের একটু শান্তিতে থাকতে দেবে না নাকি ?
নাসিমা শান্ত স্বরে বলল , দাদা কে দয়া করে একটি বার ফোন টা দাও । মা দাদার সাথে একটি বার কথা বলতে চান ।
বউদি চিৎকার করে বলে , বুড়ির মরন এখনও হয় নি , ছেলের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বাহানা খুঁজছে । একদম ফোন আর করবে না , তোমার দাদাকে দিব্যি দিয়েছি সে কোনও দিন তোমাদের সাথে আর কথা বলবে না - এই বলে ফোন কেটে দিলেন । ফোন এ লাউড স্পিকার অন থাকায় মা কথা গুলো সব শুনতে পেলেন । আচল দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে কান্না ভেজা স্বরে শুধু বললেন , আমার টাকার দরকার নাই রে , আমি টাকা চাই না , শুধু আমার বাবু কে চাই ।
নাসিমা দেখল মা মাটিতেই বসে পড়লেন দেওয়ালে ঠেস দিয়ে , পাশে পায়েস এর হাড়ি রাখা । মা যে দাদাকে খুব ভালোবাসতেন তা জানা আছে নাসিমার ।
এদিকে বেলা হয়ে গেল , আর দেরি না করে সে সাইকেল টা নিয়ে দোকানের উদ্দ্যেসে রওনা দিল । আজ মন টা ভালো নেই একদম । মা এর জন্য চিন্তা হয় খুব । শরীর টাও ভালো নেই মায়ের । দু দিন আগে হাসপাতালের ডক্টর এর কাছে যখন নিয়ে গিয়েছিল মা কে , তখন ডক্টর বলেছিলেন যে , ভালো কোন হার্ট এর ডক্টর কে দেখাতে । মা এর হার্ট এর সমস্যা । কিন্তু মাস শেষ না হলে তো আর দোকানের মালিক বেতন এর টাকা দেবে না । তাই এই মাসের শেষে টাকা টা হাতে পেলে মাকে হার্ট এর ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যাবে সে ।
দোকানে থেকে দুপুরে বাড়ী ফিরে নাসিমা দেখল, মা দেওয়ালে তেমনি ঠেস দিয়ে বসে আছেন , একটা বিড়াল হাড়িতে রাখা দাদার জন্য বানানো পায়েস গুলো চেটে পুঁছে খাচ্ছে ।
নাসিমা দ্রুত বিড়াল টাকে তাড়িয়ে মা কে উদ্দেশ্য করে বলল যে , বিড়াল সব পায়েস খেয়ে নিল যে , তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না , এখনও বসে বসে কাঁদছ , দাদা আসবে না , ও বউ এর গোলাম হয়ে গিয়েছে । মা এর কাছ থেকে কোনও সাড়া এল না । নাসিমা মা এর পাশে বসে মায়ের চোখ থেকে গড়িয়ে পরা জল নিজের হাত দিয়ে মুছে দিল । তারপর মা এর গায়ে হাত দিতেই ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা অনুভুত হল , একটু নাড়া দিতেই মা এর নিথর দেহ টা এলিয়ে পড়ল মাটিতে । মা আর নেই । ছেলের অপেক্ষায় কাঁদতে কাঁদতে নিজের জীবন টা দিয়ে দিল । নাসিমা মা এর দেহ টা বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকলো । বাইরে তখন ঝড় উঠেছে , বজ্র বিদ্যুৎ বারে বারে গরজে উঠছে । সেই আওয়াজে নাসিমার বুক ফাটা কান্নার আওয়াজ উপরওয়ালা শুনতে কি পাবেন ।
