অপেক্ষা - তারিফ আলম

5th August 2021 8:43 pm তারিফ আলম
অপেক্ষা - তারিফ আলম


গল্প - *অপেক্ষা *

লেখা - তারিফ আলম

***

রোজিনা বিবি মেয়েকে মিনতির সুরে বললেন ... ফোন টা আর একবার তোর দাদা কে লাগা , কথা বলতে খুব ইচ্ছা করছে ।

মেয়ে নাসিমা দোকানে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল । নতুন একটা কাজ পেয়েছে গ্রামের একটা টেলারিং দোকানে । মাসে দেড় হাজার টাকা করে পারিশ্রমিক পায় । তাতেই তাদের সংসার কোন রকমে চলে । বাবা মারা যাওয়ার পর তাদের সংসার এর হাল দাদাই ধরেছিল । কিন্তু বিয়ে হওয়ার পর কেমন যেন দাদা পাল্টে যায় । বউ দি চাইতো না যে নসিমা ও তার মায়ের জন্য তার দাদা টাকা খরচ করুক । অশান্তি লেগে থাকতো । তাই নসিমা কলেজ এ পড়া বন্ধ করে দর্জি দোকানে কাজ করে ।

নাসিমা এর পূর্বে অনেক বার তার দাদা কে ফোন করেছে । কিন্তু দাদা সব বারই ফোন কেটে দিয়েছে । তার বউ দি মায়ের সাথে তিন মাস আগে ঝগড়া করে দাদাকে সঙ্গে নিয়ে তার বাপের বাড়ী চলে যায় । আর দাদা ফিরে নি । একবার ফোন করে মা কে জানিয়ে দেয় যে , সে আর ফিরবে না ।

তবুও মা রোজ অপেক্ষা করেন ছেলের বাড়ী ফিরার জন্য । নামাজ পড়ে আল্লার কাছে কাঁদতে কাঁদতে প্রার্থনা করতে থাকেন যাতে ছেলে বাড়ী ফিরে আসে । আসলে মা দাদা কে যে খুব ভালোবাসেন ।

আজকে দাদার জন্ম দিন , তাই মা ভোর থেকে উঠে নিজের হাতে পায়েস রান্না করেছেন । দাদা আসবে না , কিন্তু মায়ের মন মানে না । প্রতি বার জন্মদিনে মা দাদার জন্য পায়েস রান্না করে খাওয়াতেন খুব আদর করে ।

নাসিমা মায়ের করুন মুখের দিকে চেয়ে দেখল ... তারপর ফোন টা নিয়ে দাদা কে ফোন লাগাল । কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোন টা তুলল , তবে দাদা নয় , বউদি । কর্কশ গলায় বিরক্তির স্বরে বউদি বলল ... কি দরকার ? বার বার ফোন করছ কেন ? আমাদের একটু শান্তিতে থাকতে দেবে না নাকি ?

নাসিমা শান্ত স্বরে বলল , দাদা কে দয়া করে একটি বার ফোন টা দাও । মা দাদার সাথে একটি বার কথা বলতে চান ।

বউদি চিৎকার করে বলে , বুড়ির মরন এখনও হয় নি , ছেলের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বাহানা খুঁজছে । একদম ফোন আর করবে না , তোমার দাদাকে দিব্যি দিয়েছি সে কোনও দিন তোমাদের সাথে আর কথা বলবে না - এই বলে ফোন কেটে দিলেন । ফোন এ লাউড স্পিকার অন থাকায় মা কথা গুলো সব শুনতে পেলেন । আচল দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে কান্না ভেজা স্বরে শুধু বললেন , আমার টাকার দরকার নাই রে , আমি টাকা চাই না , শুধু আমার বাবু কে চাই ।

নাসিমা দেখল মা মাটিতেই বসে পড়লেন দেওয়ালে ঠেস দিয়ে , পাশে পায়েস এর হাড়ি রাখা । মা যে দাদাকে খুব ভালোবাসতেন তা জানা আছে নাসিমার ।

এদিকে বেলা হয়ে গেল , আর দেরি না করে সে সাইকেল টা নিয়ে দোকানের উদ্দ্যেসে রওনা দিল । আজ মন টা ভালো নেই একদম । মা এর জন্য চিন্তা হয় খুব । শরীর টাও ভালো নেই মায়ের । দু দিন আগে হাসপাতালের ডক্টর এর কাছে যখন নিয়ে গিয়েছিল মা কে , তখন ডক্টর বলেছিলেন যে , ভালো কোন হার্ট এর ডক্টর কে দেখাতে । মা এর হার্ট এর সমস্যা । কিন্তু মাস শেষ না হলে তো আর দোকানের মালিক বেতন এর টাকা দেবে না । তাই এই মাসের শেষে টাকা টা হাতে পেলে মাকে হার্ট এর ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যাবে সে ।

দোকানে থেকে দুপুরে বাড়ী ফিরে নাসিমা দেখল, মা দেওয়ালে তেমনি ঠেস দিয়ে বসে আছেন , একটা বিড়াল হাড়িতে রাখা দাদার জন্য বানানো পায়েস গুলো চেটে পুঁছে খাচ্ছে ।

নাসিমা দ্রুত বিড়াল টাকে তাড়িয়ে মা কে উদ্দেশ্য করে বলল যে , বিড়াল সব পায়েস খেয়ে নিল যে , তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না , এখনও বসে বসে কাঁদছ , দাদা আসবে না , ও বউ এর গোলাম হয়ে গিয়েছে । মা এর কাছ থেকে কোনও সাড়া এল না । নাসিমা মা এর পাশে বসে মায়ের চোখ থেকে গড়িয়ে পরা জল নিজের হাত দিয়ে মুছে দিল । তারপর মা এর গায়ে হাত দিতেই ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা অনুভুত হল , একটু নাড়া দিতেই মা এর নিথর দেহ টা এলিয়ে পড়ল মাটিতে । মা আর নেই । ছেলের অপেক্ষায় কাঁদতে কাঁদতে নিজের জীবন টা দিয়ে দিল । নাসিমা মা এর দেহ টা বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকলো । বাইরে তখন ঝড় উঠেছে , বজ্র বিদ্যুৎ বারে বারে গরজে উঠছে । সেই আওয়াজে নাসিমার বুক ফাটা কান্নার আওয়াজ উপরওয়ালা শুনতে কি পাবেন ।

May be an image of 1 person and text that says "অপেক্ষা- তারিফ আলম"

 

 





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?