টাকা গুলো গেল কোথায় মালতি , দোকানের ক্যাসবস্ক এ তো ছিল , তুমি নাও নি তো কে নিয়েছে” – খুব রেগে গিয়ে স্ত্রীকে বললেন অশোক বাবু ।
রাগ হওয়ারই কথা , ছোট একটা মুদি দোকান চালান অশোক বাবু । সংসারের ৫ সদস্যের সব খরচ এই দোকান থেকেই আসে । কিন্তু কিছু দিন থেকে ক্যসবাক্সতে টাকার খুব হের- ফের হচ্ছে । বাড়িতে স্ত্রী মালতি ছাড়া এক ছেলে দিনু আর মেয়ে সিতা । দিনু কলেজে পড়ে ইংরেজি অনার্স নিয়ে আর মেয়ে এবারে উচ্চমাধ্যমিক দেবে । আর অসুস্থ বুড়ি মা আছেন । দিন দিন সংসার খরচ বেঁড়েই চলেছে । কিন্তু ব্যবসায় লাভের টাকা কিছুই পাচ্ছেন না অশোক বাবু । টাকা কেউ যেন বের করে নিচ্ছে দোকানের ক্যাসবাক্স থেকে ।
“ আমি জানি না , দরকার হলে আমি তো টাকা চেয়ে নি তোমার কাছ থেকে “ – মালতি নরম সুরে বলব ।
অশোক বাবু এবারে মেয়ে সিতাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন সে টাকা নিয়েছে কি না ? মেয়ে সিতা মাথা নেড়ে জানায় যে সে টাকা নেয় নি । তখন অশোক বাবু ছেলে দিনুর রুমে গেলেন । দিনু কিছু যেন বই এর মধ্যে লুকাতে যাচ্ছিল । অশোক বাবু দেখে ফেলে জোর গলায় বলেন – “ দিনু তুই কি লুকাচ্ছিস দেখি ‘?
“ না বাবা , ও কিছু না “- ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয় দিনু ।
অশোক বাবু নিজে এসে দিনুর কাছ থেকে বই ছিনিয়ে নিয়ে তার ভেতরে দেখলেন টাকা লুকানো । টাকা গুলো হাতে নিয়ে গুনে দেখলেন ৩০০ টাকা ।
এবারে খুব রেগে গিয়ে অশোক বাবু দিনুর চুলের মুঠি ধরে গালে জোরে জোরে দুই চড় লাগালেন আর চিৎকার করে বলতে লাগলেন – “ এসে দেখ মালতি তোমার ছেলে চোর হয়ে গিয়েছে , দোকানের ক্যাসবাক্স থেকে টাকা চুরি করেছে ।
মালতি ছুটে এলেন স্বামীর চিৎকার শুনে । দেখলেন দিনু মাথা নিচু করে কাঁদছে , তার চোখ দিয়ে অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নীচে ।
“ আর মেরো না , ছেড়ে দাও , ও কোনদিন তো এমন কাজ করে নি “।
“ টাকা কেন চুরি করলি বল , তোর তো কোন অভাব রাখি নি , কেন করলি এ কাজ ‘?
মায়ের কথার কোন উত্তর না দিয়ে দিনু কাঁদতে কাঁদতে ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়ী থেকে । মালতি চিৎকার করে ডাকতে লাগলো – “ যাস না দিনু , শুনে যা , ফিরে আয় বাবা , ভাত টা খেয়ে যা “।
মায়ের কোন কথার জবাব না দিয়ে দিনু ছুটতে ছুটতে চোখের আড়ালে চলে গেল ।
...............
সন্ধ্যে হয়ে গেল । দিনু এখনও বাড়ী ফিরে নি দেখে মালতি স্বামীর উপর রাগ করে বলল – “ তুমি কি গো , ছেলেটাকে এমন ভাবে মারলে , আমাদের তো একটি মাত্র ছেলে , কলেজ যাবে বলে বের হচ্ছিল , ভাতও খায় নি , তুমি এমন ভাবে মারলে ৩০০ টাকার জন্য “।
স্ত্রীর কথা গুলো শুনে কিছু না বলে একটা জামা গায়ে দিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়লেন । ছেলের গায়ে কোনদিন হাত তুলেন নি অশোক বাবু , আর আজ এত জোরে নিজের ছেলেকে চড় মারলেন । নিজের উপরে রাগ হতে লাগলো খুব । শান্ত স্বভাবের ছেলে দিনু । কোন দিন খারাপ কিছু কাজ করে নি । কেন যে সে চুরি করতে গেল টাকা । টাকা চেয়ে নিলে তো দিয়ে দিতাম – টিউশন আর কলেজের সব টাকা তো ঠিক টাইম মত দিয়ে দিই । হাত খরচও দি । তবুও কেন চুরি করতে গেল ছেলেটা । প্রশ্ন টা মনের মধ্যে ঘুরপাক করতে লাগলো । এদিকে মনে খুব কষ্ট হচ্ছে ছেলেকে চড় মারার জন্য ।
হাঁটতে হাঁটতে অমিতের বাড়ী এসে পৌঁছালেন । অমিত দিনুর বন্ধু ।
অমিতকে জিজ্ঞাসা করলেন দিনুকে সে দেখেছে কিনা কলেজে ।
অমিত বলল “কাকু দিনু তো কলেজ এখন যায় না , আর টিউশনও যায় না । “
“সে কি ? তাহলে সে কোথায় যায় ? “
সেটা আমি তো জানি না কাকু , কিন্তু কয়েকদিন আগে রেল স্টেশন এর পিছনে কয়েকটা ছেলের সাথে বসে থাকতে দেখেছিলাম ।
অশোক বাবু কথা গুলো শুনে খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন । কি করবেন ভেবে পেলেন না । নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন । এত পড়াশুনায় ভালো ছেলে এমন কাজ করবে – তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না ।
বেলদা বাজার থেকে ফেরার পথে গান্ধীপার্ক এর সামনে অনেক লোকের জটলা দেখলেন । সবাই একটা ছেলেকে ঘিরে ধরে প্রচুর পিটাচ্ছে । একটা লোককে জিজ্ঞসা করলেন , “ কিসের এত গণ্ডগোল “?
“ একটা সাইকেল চোর ধরা পড়েছে , সকলে মিলে তাকে মারছে “।
লোকটার কথা শুনে অশোক বাবু আর সে দিকে না ঢুকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দিলেন ।
“ বাবা গো , মরে গেলাম গো , আআআআ”।
হটাত সেই সাইকেল চোর ছেলেটার আর্তনাদ কানে আসতেই অশোক বাবু চমকে উঠলেন । এত খুব পরিচিত গলার আওয়াজ । ছুটে গিয়ে ভিড় ঠেলে দেখলেন কয়েকজন লোক লাঠি দিয়ে জোরে জোরে পিটাচ্ছে দিনুকে । দিনুর মাথা , মুখ ফেটে অঝোরে রক্ত বের হচ্ছে ।
অশোক বাবু ঝাঁপিয়ে পড়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বললেন – “ তোমারা কেউ মেরো না গো , ও আমার ছেলে , ও চোর নয় “।
অশোক বাবু গন্যমান্য ব্যক্তি , বেলদার অনেকেই চেনে । তাই সকলে সরে গেল ।
অশোক বাবু ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন – “ কেন তুই বাড়ী থেকে চলে এলি বেটা , তোকে চড় মারা ভুল হয়ে গিয়েছে , আর কোনদিন মারবো না রে , যত টাকা তোর দরকার আমি দেব , চুরি করে আমার মান – সম্মান নষ্ট করে দিস নারে “।
দিনু কাঁদতে কাঁদতে অনেক কষ্টে তার হাতের কাগজে মোড়া কিছু একটা বাবার হাতে দিল । অশোক বাবু কাগজটা খুলে দেখলেন তার মধ্যে পাওডার এর মত সাদা এক ধরণের বস্তু ।
অশোক বাবু জিজ্ঞাসা করলেন “ এগুলো কি”?
দিনু কাঁদতে কাঁদতে অনেক কষ্টে বলতে লাগলো “ এগুলোকে পাত্তি বলে , ব্রাউন সুগার এর মত নেশার বস্তু । আমার এক কলেজের বন্ধু আমাকে না জানিয়ে নেশা করিয়ে দেয় । আমি এই নেশা না নিলে অনেক কষ্ট পাই । এগুলোর দাম অনেক । প্রতিদিন তাই তোমার দোকানের ক্যাসবাক্স থেকে টাকা চুরি করে আমি এই নেশা কিনতাম । আজ টাকা পাই নি তাই নেশার কষ্টে থাকতে না পেরে চুরি করেছিলাম সাইকেল । আমি খুব খারাপ বাবা , আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও “।
অশোক বাবু ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন “ ক্ষমা করে দিয়েছি বাবা , তুই এই নেশা ছেড়ে দে , আবার পড়াশুনায় মন দে , তোকে ভালো রেজাল্ট করে পাশ করতে হবে । চাকরি পেয়ে আমাদের অভাবের সংসারের হাল ধরতে হবে । তোর বোনের বিয়ে দিতে হবে , ছেড়ে দে এ খারাপ নেশা বাবা , ছেড়ে দে “ – কথাগুলো বলা শেষ করে যখন নিজের বুক থেকে দিনুকে সরানোর চেষ্টা করলেন দিনু পড়ে গেল মাটিতে । স্থির চোখে চেয়ে ছিল বাবার দিকে , নিস্পাপ চোখ দুটোর পাশ দিয়ে রক্তের ধারা বয়ে চলছিল ।
অশোক বাবু চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন - “ দিনু , দিনু , কথা বল বাবা আমার, এমন করিস নে , আমদের একা ছেড়ে যাসনে বাপ আমার , তোর মা তোর জন্য ভাত নিয়ে বসে অপেক্ষা করছে , তুই সকালে খেয়ে আসিস নি বলে তোর মাও ভাত খায় নি , তুই বাড়ী গেলে একসাথে খাবে বলে ,উঠরে বাপ আমার , আমাদের ছেড়ে যাসনারে , দিনুউউউউউ- “।
দিনু আর উঠবে না কোনোদিন । এভাবেই নেশার ঘোরে প্রান দিয়ে যাবে অনেক দিনু ।