গল্প -- দেশদ্রোহী

3rd December 2020 7:07 pm তারিফ আলম
গল্প -- দেশদ্রোহী


গল্প - দেশদ্রোহী

- তারিফ আলম

 

“ দাদা বাড়ী না এলে আমি বিয়ে করবো না বলে দিলাম আব্বাজান” । মেয়ে রাহেলার কথা শুনে সিরাজ খান মোবাইলটা নিয়ে আবার ফোন লাগাতে চেষ্টা করলেন ছেলে নাসিরকে । কিন্তু এবারেও বলল সুইচ অফ । গত দু দিন থেকে ছেলের কোন খবর নেই । ছেলে উত্তরপ্রদেশের একটি হোটেলে গত দু বছর থেকে কাজ করছে । বোনের বিয়ে সামনের শুক্রবার মেদিনীপুর এ একটি ভালো ছেলের সাথে । গ্রামের বাড়ী কসবা আসন্দায় ফিরে আসার কথা ছিল । বোনের বিয়ে জাকজমক ভাবে দেবে বলে টাকা কিছু জমিয়েছিল । সে সব নিয়ে আসার কথা ছিল । কিন্তু ফোন দু দিন ধরে সুইচ অফ । বাড়ির সকলে খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছে । প্রতিদিনই নাসির ফোন করে ।

হটাত একটা ফোন এল । সিরাজ খান ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে একজন অপরিচিত ছেলের গলা । সে বলল – “ আমি নাসির এর বন্ধু নারায়ন দাস বলছি । দু দিন আগে এখানে আন্দোলন হয় CAA এর প্রতিবাদে । সেই রাতে হটাত পুলিশ আসে হোটেলে । সবাইকে লাইন করে দাড় করিয়ে নাম জিজ্ঞাসা করতে থাকে । নাসিরকে নাম জিজ্ঞাসা করলে সে তার নাম বলতেই পুলিশ তাকে ধরে মারতে থাকে । আমরা জিজ্ঞাসা করি তাকে মারছেন কেন স্যার , ও কোন আন্দোলনে যায় নি , আমাদের সাথে কাজ করে নাসির । তখন পুলিশ বলে “ এই সব দেশদ্রোহীদের শেষ করে দেব – এই বলে চারজন পুলিশ মিলে তাকে খুব করে মারতে থাকে । সে একাই মুসলমান ছিল বলে তাকেই পুলিশ মারতে মারতে ধরে নিয়ে যায় । সে কষ্টে চিৎকার করে কাঁদছিল ‘মা’ ‘মা’ বলে । আমরা তাকে বাঁচাতে পারলাম না “।

কথা গুলো শুনে সিরাজের দু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো । তার একমাত্র ছেলে , খুব ভোলাভালা , কোনোদিন কোন রকম ঝামেলাই যায় নি । আর তাকে শুধু মুসলমান হওয়ার কারনে এত অত্যাচার সইতে হচ্ছে ।

নাসিরের বন্ধু নারায়ন আবার বলল- “ আমরা থানায় ওর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম । কিন্তু দেখা করতে দেয় নি । ওর উপরে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট ও পুলিশকে মারার মিথ্যা কেস দিয়েছে । বলছে ৩ লক্ষ টাকা ক্ষতিপুরন দিতে হবে । হোটেলের ম্যানেজার এর কাছে তার এত দিন কাজের ১ লক্ষ টাকা মত জমা আছে । আরও ২ লক্ষ টাকা দিলে তবেই ছাড়বে তাকে “।

সিরাজ বুড়ো নিজের চোখ মুছতে মুছতে বললেন “ আমি টাকা নিয়ে যাচ্ছি” , এই বলে ফোন রেখে দেন ।

পিছনে দাড়িয়ে মেয়ে রাহেলা সব শুনছিল । ফুফিয়ে কেঁদে উঠে তার আব্বুজান সিরাজকে জড়িয়ে ধরল । সিরাজও নিজেকে সামলাতে না পেরে কাঁদতে লাগলো জোরে জোরে ।

============

সিরাজ উত্তরপ্রদেশ যাওয়ার ট্রেনে উঠে টাকা ভর্তি ব্যাগটা বুকে চেপে নিয়ে বসে আছে । ট্রেনে রিজার্ভেশনে সিট কনফ্রাম হয় নি , তাই নীচে বসেই যাচ্ছে । মেয়ে রাহেলা তার বিয়ের জন্য রাখা গহনা সব তুলে দিয়েছিল তার হাতে , সে গুলো বিক্রি করে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা হয়েছিল । আর ৮০ হাজার টাকা নিজেদের ২ বিঘে জমি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেছে সিরাজ । মা মরা মেয়েটাকে তার চাচার কাছে রেখে এসেছে । মেয়েকে কথা দিয়েছে তার ভাইকে অবশ্যই নিয়ে আসবে উত্তরপ্রদেশ এর জেল থেকে ছাড়িয়ে ।

সকালের দিকে উত্তরপ্রদেশ এ গিয়ে পৌঁছল ট্রেন । সিরাজ খানকে স্টেশনে নিতে এসেছিল নাসির এর বন্ধু নারায়ন । সে সিরাজ কে নিয়ে পৌঁছল জেল এ, যেখানে নাসিরকে আটক করে রেখেছিল । নারায়ন এর হাতে সিরাজ ২ লক্ষ টাকা দিলেন । নারায়ন আগে থেকে ১ লক্ষ টাকা হোটেল এর ম্যানেজার এর কাছ থেকে নিয়ে আসেছিল । সেই টাকা জেল আধিকারিকের হাতে তুলে দিয়ে নাসিরকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল নারায়ন ।

জেল আধিকারিক টাকা গুলো নিয়ে গুনতে লাগলো । তারপর আর দুজন পুলিশকে বলল নাসির নামের ছেলেটার বডি এনে এদের দিয়ে দাও ।

“বডি” কথাটা কানে যেতেই খুব অবাক হয়ে সিরাজ জিজ্ঞাসা করলেন পুলিশ অফিসারকে “ আমার ছেলেকে বডি কেন বলছেন স্যার”।

পুলিশ অফিসার সিরাজের কোন কথার উত্তর না দিয়ে টাকা গুনতে লাগলো । এমন সময় দু জন পুলিশ একটা কাপড়ে বাঁধা লাশকে এনে সামনে রেখে দিয়ে বলল – “ গতকাল রাতে গলায় দড়ি দিয়ে নাসির আত্মহত্যা করেছে”।

সিরাজ সাদা কাপড়টা সরিয়ে দিতেই দেখতে পেলে নিজের একমাত্র ছেলের নিথর দেহ । দেহে বহু আঘাতের চিহ্ন । সিরাজ চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো “ আমার নির্দোষ ছেলেকে তোমরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছ , সে আত্মহত্যা করতে পারে না । সে তার বোনের বিয়েতে যোগ দেওয়ার জন্য বাড়ী ফিরছিল । কিন্তু তোমরা তাকে শুধুমাত্র মুসলিম বলে ধরে এনে পিটিয়ে মেরে দিলে । আমি এখন আমার ছেলের লাশ নিয়ে গিয়ে তার বোনকে কি জবাব দেব । আমি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব বলে কথা দিয়ছিলাম , কিন্তু হায় আল্লাহ ...এ কি হয়ে গেল “ ...এই বলে মৃত ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন সিরাজ ।

তখন কে যেন বলে উঠল – “যাক , আর একটা দেশদ্রোহী মরলো “।





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?