গল্প - দেশদ্রোহী
- তারিফ আলম
“ দাদা বাড়ী না এলে আমি বিয়ে করবো না বলে দিলাম আব্বাজান” । মেয়ে রাহেলার কথা শুনে সিরাজ খান মোবাইলটা নিয়ে আবার ফোন লাগাতে চেষ্টা করলেন ছেলে নাসিরকে । কিন্তু এবারেও বলল সুইচ অফ । গত দু দিন থেকে ছেলের কোন খবর নেই । ছেলে উত্তরপ্রদেশের একটি হোটেলে গত দু বছর থেকে কাজ করছে । বোনের বিয়ে সামনের শুক্রবার মেদিনীপুর এ একটি ভালো ছেলের সাথে । গ্রামের বাড়ী কসবা আসন্দায় ফিরে আসার কথা ছিল । বোনের বিয়ে জাকজমক ভাবে দেবে বলে টাকা কিছু জমিয়েছিল । সে সব নিয়ে আসার কথা ছিল । কিন্তু ফোন দু দিন ধরে সুইচ অফ । বাড়ির সকলে খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছে । প্রতিদিনই নাসির ফোন করে ।
হটাত একটা ফোন এল । সিরাজ খান ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে একজন অপরিচিত ছেলের গলা । সে বলল – “ আমি নাসির এর বন্ধু নারায়ন দাস বলছি । দু দিন আগে এখানে আন্দোলন হয় CAA এর প্রতিবাদে । সেই রাতে হটাত পুলিশ আসে হোটেলে । সবাইকে লাইন করে দাড় করিয়ে নাম জিজ্ঞাসা করতে থাকে । নাসিরকে নাম জিজ্ঞাসা করলে সে তার নাম বলতেই পুলিশ তাকে ধরে মারতে থাকে । আমরা জিজ্ঞাসা করি তাকে মারছেন কেন স্যার , ও কোন আন্দোলনে যায় নি , আমাদের সাথে কাজ করে নাসির । তখন পুলিশ বলে “ এই সব দেশদ্রোহীদের শেষ করে দেব – এই বলে চারজন পুলিশ মিলে তাকে খুব করে মারতে থাকে । সে একাই মুসলমান ছিল বলে তাকেই পুলিশ মারতে মারতে ধরে নিয়ে যায় । সে কষ্টে চিৎকার করে কাঁদছিল ‘মা’ ‘মা’ বলে । আমরা তাকে বাঁচাতে পারলাম না “।
কথা গুলো শুনে সিরাজের দু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো । তার একমাত্র ছেলে , খুব ভোলাভালা , কোনোদিন কোন রকম ঝামেলাই যায় নি । আর তাকে শুধু মুসলমান হওয়ার কারনে এত অত্যাচার সইতে হচ্ছে ।
নাসিরের বন্ধু নারায়ন আবার বলল- “ আমরা থানায় ওর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম । কিন্তু দেখা করতে দেয় নি । ওর উপরে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট ও পুলিশকে মারার মিথ্যা কেস দিয়েছে । বলছে ৩ লক্ষ টাকা ক্ষতিপুরন দিতে হবে । হোটেলের ম্যানেজার এর কাছে তার এত দিন কাজের ১ লক্ষ টাকা মত জমা আছে । আরও ২ লক্ষ টাকা দিলে তবেই ছাড়বে তাকে “।
সিরাজ বুড়ো নিজের চোখ মুছতে মুছতে বললেন “ আমি টাকা নিয়ে যাচ্ছি” , এই বলে ফোন রেখে দেন ।
পিছনে দাড়িয়ে মেয়ে রাহেলা সব শুনছিল । ফুফিয়ে কেঁদে উঠে তার আব্বুজান সিরাজকে জড়িয়ে ধরল । সিরাজও নিজেকে সামলাতে না পেরে কাঁদতে লাগলো জোরে জোরে ।
============
সিরাজ উত্তরপ্রদেশ যাওয়ার ট্রেনে উঠে টাকা ভর্তি ব্যাগটা বুকে চেপে নিয়ে বসে আছে । ট্রেনে রিজার্ভেশনে সিট কনফ্রাম হয় নি , তাই নীচে বসেই যাচ্ছে । মেয়ে রাহেলা তার বিয়ের জন্য রাখা গহনা সব তুলে দিয়েছিল তার হাতে , সে গুলো বিক্রি করে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা হয়েছিল । আর ৮০ হাজার টাকা নিজেদের ২ বিঘে জমি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেছে সিরাজ । মা মরা মেয়েটাকে তার চাচার কাছে রেখে এসেছে । মেয়েকে কথা দিয়েছে তার ভাইকে অবশ্যই নিয়ে আসবে উত্তরপ্রদেশ এর জেল থেকে ছাড়িয়ে ।
সকালের দিকে উত্তরপ্রদেশ এ গিয়ে পৌঁছল ট্রেন । সিরাজ খানকে স্টেশনে নিতে এসেছিল নাসির এর বন্ধু নারায়ন । সে সিরাজ কে নিয়ে পৌঁছল জেল এ, যেখানে নাসিরকে আটক করে রেখেছিল । নারায়ন এর হাতে সিরাজ ২ লক্ষ টাকা দিলেন । নারায়ন আগে থেকে ১ লক্ষ টাকা হোটেল এর ম্যানেজার এর কাছ থেকে নিয়ে আসেছিল । সেই টাকা জেল আধিকারিকের হাতে তুলে দিয়ে নাসিরকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল নারায়ন ।
জেল আধিকারিক টাকা গুলো নিয়ে গুনতে লাগলো । তারপর আর দুজন পুলিশকে বলল নাসির নামের ছেলেটার বডি এনে এদের দিয়ে দাও ।
“বডি” কথাটা কানে যেতেই খুব অবাক হয়ে সিরাজ জিজ্ঞাসা করলেন পুলিশ অফিসারকে “ আমার ছেলেকে বডি কেন বলছেন স্যার”।
পুলিশ অফিসার সিরাজের কোন কথার উত্তর না দিয়ে টাকা গুনতে লাগলো । এমন সময় দু জন পুলিশ একটা কাপড়ে বাঁধা লাশকে এনে সামনে রেখে দিয়ে বলল – “ গতকাল রাতে গলায় দড়ি দিয়ে নাসির আত্মহত্যা করেছে”।
সিরাজ সাদা কাপড়টা সরিয়ে দিতেই দেখতে পেলে নিজের একমাত্র ছেলের নিথর দেহ । দেহে বহু আঘাতের চিহ্ন । সিরাজ চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো “ আমার নির্দোষ ছেলেকে তোমরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছ , সে আত্মহত্যা করতে পারে না । সে তার বোনের বিয়েতে যোগ দেওয়ার জন্য বাড়ী ফিরছিল । কিন্তু তোমরা তাকে শুধুমাত্র মুসলিম বলে ধরে এনে পিটিয়ে মেরে দিলে । আমি এখন আমার ছেলের লাশ নিয়ে গিয়ে তার বোনকে কি জবাব দেব । আমি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব বলে কথা দিয়ছিলাম , কিন্তু হায় আল্লাহ ...এ কি হয়ে গেল “ ...এই বলে মৃত ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন সিরাজ ।
তখন কে যেন বলে উঠল – “যাক , আর একটা দেশদ্রোহী মরলো “।