সিনেমা হলের বাইরে দাঁড়িয়ে বিড়িতে টান দিতে দিতে রাজু ক্রোধে ফুঁসতে লাগলো - “শালাকে আজ শেষ করে দেব । আজকের নতুন সিনেমাটা শালার জন্য দেখতে পেলাম না “ , নিজের ছোট ভাই নিলুকে মনে মনে গালাগাল করতে করতে বাড়ির দিকে রওনা দিল রাজু ।
সাত বছর বয়সী নিলু পাড়ার সমবয়সী ছেলে –মেয়েদের সাথে লুকোচুরি খেলা করছিল তাদের নতুন তৈরি হওয়া বাড়িতে । বাড়ির ছাদ ঢালাই হলেও এখনো প্লাস্টার হয় নি বলে এখন এটি ফাঁকা থাকে । একটু দূরে দাদুর বাড়ি । সেখানেই এখন বাবা মা ছোট ভাই এর সাথে থাকে একটি রুমে । আর একজন থাকে , সে তার বড় দাদা । নামেই দাদা –সারাক্ষন মারপিট আর কূট বুদ্ধিতে ভরা তার মাথা । বাড়ি থেকে মায়ের কাছে ঝামেলা করে টাকা নিয়ে বা চুরি করে সেই টাকা দিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা , বিড়ি – সিগারেট খাওয়া ও বাজে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো তার কাজ । নিলুর বাবা যখন রাজুকে শাসন করতে যান তখন দিদিমা বাধা দিয়ে দেন । কারন দিদিমার কাছে রাজু ঘুমাতো , তার প্রতি অন্ধ স্নেহ ছিল দিদিমার । ফলে সে খারাপ কাজ করতে থাকে । আজ মায়ের বাক্স খুলে টাকা চুরি করার সময় নিলু দেখে নেয় আর মা কে বলে দেয় । তখন মা তাকে টাকা নিতে না দিয়ে বকান দেয় , সে তখন নিলুকে মারতে আসে । কিন্তু ছোটো নিলু মায়ের পিছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে । ফলে রাজু আর মারতে না পেরে মায়ের হাতে চড় খেয়ে ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে ।
লুকোচুরি খেলতে খেলতে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে । নিলু তাদের নতুন তৈরি হওয়া বাড়ির মাঝের রুমটিতে এসে লুকিয়ে পড়ল এক কোনে । একেবারে নিস্তব্ধ । অন্ধকারে আবছা দেখল পিছনে একটা ছায়া । নিলু মনে করলো নাসির হয়তো লুকিয়েছে এখানেই । রজিনা খুঁজতে এলে একসঙ্গে ‘ধাপা’ দিয়ে দেবে । এই ভেবে নিলু দাঁড়িয়ে ছিল । হটাত পিছনে থেকে নিলুর শরীরে খুব জোরে আঘাত করলো যেন কেউ ।
উউউ মা মা গো বলে চিৎকার করে পড়ে গেল মাটিতে নিলু । দেখল তার দাদা রাজু তার বুকের উপরে এসে একদম চড়ে বসে দু হাত দিয়ে জোরে করে নিলুর গলা টিপে ধরল । আচমকা সব কিছু হতে নিলু একদম ঘাবড়ে গেল । গলা এত জোরে টিপে ধরেছে যে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে একদম পারছিল না । চেষ্টা করছিল তার শয়তান দাদার হাত থেকে ছাড়া পেতে । কিন্তু সে বয়সে বড় আর এমন ভাবে পিছন থেকে আঘাত করে দিয়েছিল যে নিলু এমনিতেই কষ্টে তড়পাচ্ছিল , আর গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে রাজু টিপে ধরে রেখেছিল নিলুর গলা ।
নিলু ছেড়ে দেওয়ার জন্য রাজুকে বললে , রাজু বলতে থাকে – “ তোর জন্য আজকে সিনেমা দেখা হল না আমার , তোকে আমি আজ শেষ করে দেব “ – এই কথা বলতে বলতে দেহের সমস্ত ভার দিয়ে গলা টিপে ধরে নিলুর । নিলু আর নিশ্বাস নিতে পারছিল না । কষ্টে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল । জ্ঞান হারায় সে ।
রাজু ভাই এর নড়াচড়া হচ্ছে না দেখে বুঝলো যে সে মারা গিয়েছে । তাই তাকে ফেলে রাখে দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল ।
কতক্ষন পর নিলুর জ্ঞান ফিরল সে জানে না । জ্ঞান ফিরতেই উঠে বসার চেষ্টা করলো , কিন্তু পারলো না । গলায় , পিঠে অনেক ব্যাথা । শ্বাস নিতেও খুব কষ্ট হচ্ছে । যন্ত্রণায় কাঁদতে কাঁদতে অনেক কষ্টে বাড়ি ফিরে এসে দেখল মা পাড়ার মেয়েদের সাথে বসে উল দিয়ে শয়টার বুনছেন । নিলু কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে মা কে বলল – “ মা আমাকে রাজু নতুন ঘরের মধ্যে গলা টিপে ধরেছিল “।
মা শুনে বললেন , “ কাঁদিস না , ও বাড়ি ফিরলে অকে বকবো”।
মায়ের কথা শুনে নিলুর আরও বেশি কষ্ট হল । সে আবার মাকে বোঝাতে চাইল যে – এটা কোন সাধারন মারমারির ঘটনা নয় , তাকে প্রানে মারার চেষ্টা করেছিল ।
“ মা , আমাকে সে গলা টিপে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল “।
মা নিলুর কথা শুনে বিস্কুটের ডিবা থেকে দুটো বিস্কুট বের করে হাতে দিয়ে বললেন যে – “ যা এটা খেয়ে নিয়ে খেলবি যা , আর কাঁদিস না , তোর বাবা এলে বলবি” ।
মাকে বোঝাতে কিছুতেই পারলো না যে শয়তান টা আজ কি ভাবে তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল ।
নিলু মনে মনে ভাবল বাবা শিক্ষক মানুষ । বাবাকে বোঝালে অবশ্যই বুঝবেন । কিছুক্ষন পর বাবা বাজার থেকে বাড়িতে ফিরতেই নিলু ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে । বাবা কোলে তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন – “ কাঁদছিস কেন ? কি হয়েছে’?
নিলু নিজের গলা বাবাকে দেখিয়ে বলে যে তাকে রাজু গলা টিপে ধরেছিল । তাকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করেছিল ।
বাবা রেগে রাজুকে খুঁজতে দিদিমার তিন তলায় রুমের বাইরে গিয়ে রাজুকে ডাক দেন । রাজু তখন দিদিমার বিছানায় আরাম করে শুয়ে আছে । আর দিদিমা গল্প করছিলেন তার সাথে । রাজু রুম থেকে বেরাল না , কিন্তু দিদিমা বেরিয়ে এসে চিৎকার করে বলতে লাগলেন – “ কি হয়েছে , রাজু কি করেছে”?
নিলু তখন দিদিমাকে বলল রাজু তার গলা টিপে ধরে তাকে মারতে চেয়েছিল ।
দিদিমা নিলুর কথা শুনে রাজুকে কিছু বলার পরিবর্তে নিলুকেই বকা দিতে শুরু করলেন । বললেন – “সব সময় রাজুর নামে মিথ্যা কথা বলা এর কাজ , রাজু কিছু করেই নি । নিলু মিথ্যা বলছে “।
দিদিমা উল্টে নিলুকেই দোষী সাজিয়ে দিল । সেই দিনের তাকে যে রাজু খুন করে দিতে চেয়েছিল – তা কাউকেই বোঝাতে পারলো না । তবে চিনে গেল – রাজু তার দাদা নয় – একটা শয়তান ।
অনেক সময় বাচ্চারা কোন বড় ঘটনা তার সাথে ঘটলেও ঠিকভাবে হয়তো বাবা মাকে বোঝাতে পারে না , বা বাবা – মা অতি সাধারন ভাবে নিয়ে নেয় । এটা অনেক সময় মারাত্মক হতে পারে । তাই সকল বাবা – মা ও অভিভাবকদের কাছে আমার বিনিত অনুরোধ , নিজের শিশু কিছু বলতে চাইলে গুরুত্ব সহকারে বোঝার চেষ্টা করবেন – না হলে হয়তো আপনার ছেলে – মেয়ে কোন বড় বিপদে পড়ে যেতে পারে ।