শিকার--- সুশান্ত কুমার ঘোষ

19th October 2020 12:30 pm ছোটগল্প
শিকার--- সুশান্ত কুমার ঘোষ


শিকার

সুশান্ত কুমার ঘোষ

চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বীভৎস ঘটনাটা প্রকাশ বেদনায় মনের ভিতরে ছটফট করছে । ক্ষিপ্ত ষাঁড় যেমন শিঙের গুঁতোয় খাঁচা তোলপাড় করে বাইরে আসার মরিয়া চেষ্টা চালায় ,ঘটনার ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলোও তেমনি রতিকান্তের বুকের ভিতর সজোরে আঘাত করতে থাকে । কিন্তু আড়ষ্ট জিভ একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারেনা । নিষ্প্রভ চোখের ঘোলাটে দৃষ্টিপাতে চারপাশে ছড়িয়ে দেয় কথাগুলো । সে ভাষার অর্থ ওরা কেউ বুঝতে পারলনা । যে পারত ,সে এখন লাশ ঘরে, সুরত হালের অপেক্ষায়।

পুলিশ সন্দেহ জনক কিছু পেলনা। কোনও প্রত্যক্ষদর্শীর সন্ধানও পাওয়া গেলনা । তাই ডেড-বডি গাড়িতে তুলে ভব সরকারের

বৈঠকখানায় চাচক্রে আত্মহত্যার তত্ত্ব সাজিয়ে ফিরে গেল পুলিশ ।

পরদিন বিকেলে পুলিশের জীপ এসে থামল তাপসের বাড়ির সামনে । তাপস তখন সবে ফিরেছে শ্মশান থেকে। শ্মশান যাত্রীদের কেউ কেউ তখনো ছিল সেখানে। পড়শি মহিলাদের একটা ছোটো জটলা ভিড় করেছিল উঠোনে। ঠিক তখনি পুলিশ ঢুকল ঘরে। স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অপরাধে গ্রেপ্তার করল তাপসকে। তাপসের কিশোরী মেয়ে এবং নাবালক ছেলে লুটিয়ে পড়ল পুলিশের পায়ের উপর-‘ ও বাবু ! ও বাবুরা !আমার বাবাকে ছেড়ে দাও । আমার বাবার কোনও দোষ নাই।

বাবা কোনোদিন কিছু বলেনা মাকে ।কাল সারাদিন বাড়িতেও ছিলনা বাবা’।

কথাটা মিথ্যে নয় । সত্যিই বাড়িতে ছিলনা তাপস। এই না থাকাটাই কাল হল । ঘটনাটা যখন ঘটল ছেলে মেয়ে দুটোও ছিলনা বাড়িতে ।ওরা নগেন মাস্টারের বাড়িতে পড়তে গিয়েছিল। ওদের টিউশন পড়ার সময়টাও বেশ অদ্ভুত। দিনরাতের

সন্ধিক্ষণকে মাঝখানে রেখে সূর্যের আলোয় শুরু কোরে তারার আলোয় শেষ করে ।ওরা সেকাজেই ব্যস্ত ছিল । আরতি সন্ধ্যা জ্বালার পাট চুকিয়ে , পাটের শাড়িটা আলনায় রেখে পরনের আটপৌরে শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে সবে শ্বশুরের শিয়রের পাশে এসে বসেছে। একটু আগেই ঠাকুর ঘরে শাঁখ বাজিয়ে সাঁঝবাতির ওম দুহাতে সেঁকে শ্বশুরের সর্বাঙ্গে বুলিয়ে দিয়ে গেছে। ওটাই এখন প্রতিদিনের কাজ আরতির । যেকদিন সন্ধ্যা জ্বালেনা আরতি, নাতনি কুসুম মাখিয়ে দেয় দাদুর সর্বাঙ্গে সাঁঝ প্রদীপের ওম ।আরতি তখন পরম মমতায় মুমূর্ষু শ্বশুরের মাথায় হাত বোলাতে থাকে। পরমেশ্বরের কাছে মনে মনে প্রার্থনা করে রতিকান্তের সর্বাঙ্গীণ কুশলতা ।

শাশুড়ির আদর কোনো দিন পায়নি আরতি। বিয়ের আগেই তিনি গত হয়েছিলেন। কিন্তু শ্বশুর রতিকান্ত তার অপত্য স্নেহের বন্ধনে নবপরিণীতা পুত্রবধূকে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিলেন ,শাশুড়ির অভাব অনুভব করার অবকাশটুকুও পায়নি কোনও দিন । সংসার অনভিজ্ঞ আরতির নতুন সংসার তাই প্রথম থেকেই সুখের হয়ে উঠেছিল । রতিকান্তই হাতে হাতে করে দিয়েছে কাজ। সংসারের খুঁটিনাটি প্রায় কোনও কাজই রতিকান্তের অজানা ছিলনা। যতদিন সুস্থ ছিল রতিকান্ত, সংসার নিয়ে ভাবতে হয়নি আরতিকে। বট গাছের মত চারপাশ থেকে আগলে রেখেছিল তাকে, তার সংসারকে। বিপর্যয়ের ঝরে সেই বটবৃক্ষ একদিন আছড়ে পড়ল মাটিতে । কর্মযোগী রতিকান্ত শয্যাশায়ী হল। প্রথম এ্যাটাকের ধাক্কাটা তাও সামলে নিয়েছিল। দ্বিতীয় বার আর পারলনা। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনটুকু ছাড়া আর সবই অসার হয়ে গেল । মুখ গেল বেঁকে , জিভও তাই।

সংসারের কাজকর্ম সামলানোর পর হাতে যখন যেটুকু সময় অবশিষ্ট থাকে, সেটুকুই মুমূর্ষু শ্বশুরের পরিচর্যায় ব্যয় করে আরতি। অসার অঙ্গে আদর মাখায় পরম মমতায় ।রতিকান্ত অর্থহীন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তার দিকে ।আরতি ও দৃষ্টির ভাষা বোঝে । ওটা আশীর্বাদের ভাষা, ভালবাসার ভাষা । আরতিও হেসে হেসে কথা বলে তার সঙ্গে । অবোধ শিশুর সঙ্গে মা যেমন মাথা দুলিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলে , আরতিও তেমনি জীবনের অন্তিম পর্বে পথ হাঁটা শ্বশুরকে সদ্যজাতের আসনে বসিয়ে বুকের ভিতরের শ্রদ্ধাগুলো স্নেহের ধারায় ছড়িয়ে দেয় । তখন রতিকান্তের ঘোলা চোখ দুটোও কেমন চঞ্চল হয়ে ওঠে। আরতিও বুঝতে পারে এতার আঁতুড়ে খোকার মতই খিলখিল করে হাসছে ।

তেমনি করেই ভর সন্ধ্যায় আঁতুড়ে খোকা মা আদর মাখছিল ।ঠিক তখনি ওরা ঘরে এসে ঢুকল ।তার শিয়রে বসা আরতিকে চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামাল উঠোনে । আগের দিন রাতেও এমনি করে দল বেঁধে এসেছিল ওরা। তাপস তখন ঘরেই ছিল। পাহাড় টলানো হুমকি দিয়ে বলে গিয়েছিল ‘ খবরদার তাপস! কাল যেন মিছিলে যাওয়া না হয় ! গেলে ফল ভাল হবেনা!’ তাপস মানেনি ! জান- মান-নিরাপত্তা এবং রুজিরোজগারের নিশ্চয়তার খোঁজে পতাকা হাতে পাড়ি দিয়েছিল এক’শ মাইল পথ । ওরা কিন্তু কথার খেলাপ করেনি ! ভর সন্ধ্যায় আরতিকে আছড়ে ফেলল উঠোনে । আরতি পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল । ওরা ঘিরে ফেলল চারপাশ! পাঁচিলঘেরা উঠোন খাঁচায় শুরু হল মুরগি ধরার খেলা! আরতি প্রাণের ডাঁহায় উঠোনময় দৌড়তে থাকে। আর্ত চিৎকারে ডাকতে থাকে পড়শিদের ! কিন্তু কারোর সাড়া মেলেনা। আশপাশ বাড়ির খোলা জানালাগুলোও খটাখট বন্ধ হয়ে যায়। আগন্তুকদের অট্টহাস্যে চাপা পরে যায় তার আর্তনাদ !

বদ্ধ খাঁচায় ত্রস্ত হরিণীর মত ছুটতে ছুটতে এক সময় অবসন্ন হয়ে পরে আরতি। শিকারির দল ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর । শুরু হয় পালক ছেড়ার পালা। একটা শরীর নিয়ে সিংহ বাহিনীর টানা পোড়েনের খেলা চলে উঠোনয় । একে একে তার শাড়ি সায়া কাঁচুলি ছিঁড়তে ছিঁড়তে শরীরের চামড়াটাই ছিঁড়ে ফেলে ! ফিরে যাওয়ার আগে ঘাতকবাহিনি আরতির নিথর দেহটা রতিকান্তের ঠিক মাথার উপরের চাল-কাঠে লটকে দিয়ে যায়। উত্থান শক্তি রহিত নির্বাক প্রায় আতুর শিশু রতিকান্তের চোখের উপরে ঝুলতে থাকে তার আঁতুড় মা! তার চোখ মেলে দেখাটাও অবশ্য স্থায়ী হয়নি বেশীক্ষণ ।আরতির ঝুলন্ত শরীর থেকে ঝরতে থাকা রক্ত ফোঁটায় রতিকান্তের ঘোলাটে চোখও ঢাকা পরে যায় এক সময় !





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা à§§ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।