আমার মা

4th September 2020 12:03 pm রাফিয়া সুলতানা
আমার মা



"আমার মা" 
---রাফিয়া সুলতানা      
14.10.18
         
 "মা কথাটি মধুর বড়, সুধার সমান                  
মা বলে ডাকিলে পরে জুড়ায় পরাণ।"        

            মা যে সন্তানের কাছে কী, তা আর বলে বোঝানোর কিছু নেই, সন্তান মাত্রই তা উপলব্ধি করতে পারে। সেই মায়ের বিয়োগ ব্যথা যে কি ভয়ানক, শিশুকালেই তা একবার অনুভব করেছিলাম। তখন আমি প্রায় তিন, চার বছরের। একদিন স্বপ্নে দেখি - আমার মা,ঘরে বসে, চাচীদের সঙ্গে গল্প করছেন, ওদিকে বাড়িতে আগুন লেগে গেছে। আমি ছুটে গিয়ে, দরজা থেকে মাকে প্রাণপণে চিৎকার করে ডাকছি, বেরিয়ে আসার জন্য, কিন্তু মার কানেই যাচ্ছেনা, নির্বিকারে, খোসমেজাজে গল্প করে যাচ্ছেন। আমার সেকি আকুলি বিকুলি! নিমেষে পুড়ে সব শেষ হয়ে গেলো। অকালে আমি মাতৃহারা হলাম। আমার পৃথিবীটা যেন চিরঅন্ধকারে নিমজ্জিত হলো ,অসীম মর্মবেদনায় দুমড়েমুচরে গেলো আমার ছোট্ট কোমল হৃদয়! তারপর দেখি, আব্বা ছাদের উপর নামাজ পড়ছেন।আব্বাকে আমি খুব পীড়াপীড়ি করতে লাগলাম, আল্লাহর কাছে দেওয়া চায়তে, আমার মাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। বার বার তাকে একই অনুনয় বিনয় করতে থাকলাম, আর আকুল হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম, মাকে ফিরে পাওয়ার জন্য। ভাগ্য ভালো, বুকে পাহাড় প্রমান ব্যথা নিয়ে ঘুমটা হঠাৎ ভেঙ্গে গেলো। দুঃসহ মর্মপীড়া থেকে মুক্তি পেলাম আমি!        

       খুব ভালোবাসতাম মাকে, কোথাও যেতে চাইতাম না মাকে ছেড়ে। মায়ের কেউ সমালোচনা করলে, ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলতাম আমি। মাও আমাকে ছাড়া থাকতে পারতেন না। কেউ আমাকে বেড়াতে নিয়ে গেলে,জানলায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন পথ চেয়ে। আমার নিঃসন্তান বড়মা, আমাকে দত্তক নিতে চাইলে, কেঁদে উঠেছে মায়ের মন। দিতে পারেননি কোনমতে। তবে, জীবন নদী কখন যে কোথায় বাঁক নেয়, কেউ বলতে পারেনা।আমার কৈশোর আর যৌবনের বেশীর ভাগটায় কেটেছে মাকে ছাড়াই। ছোটতে, আরেকটা স্বপ্ন দেখেছিলাম - মা বললেন, তাঁকে আল্লাহ ডেকেছেন, যুদ্ধে যেতে হবে, সঙ্গে একজনকে চান। তাই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি নিয়ে যাবেন সঙ্গে, আমার ছোটবোন না পাশবালিশ? আসন্ন বিয়োগব্যথায় কেঁদে উঠলো আমার মন। কিন্তু নিরুপায়! আল্লাহর আদেশ! বললাম, পাশবালিশ ই নিয়ে যাও।,বোনটাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিই কি করে! এই স্বপ্নটাই বোধহয় সত্যি হয়েছিলো আমার জীবনে।         তখন আমাদের ছিলো যৌথ পরিবার। আর, যৌথ পরিবারে সচরাচর যেটা হয়, শ্বাশুরী আর জা এর সঙ্গে মায়ের নিত্য ঝামেলা অশান্তি লেগেই থাকতো, কারণ মা ছিলেন প্রতিবাদী স্বভাবের। কোনরকম অবিচার ,অনাচার তিনি সহ্য করতে পারতেন না। আর আব্বা ছিলেন ঠিক উল্টো,একেবারে শান্তিপ্রিয় মানুষ। সব কিছুই তিনি মুখ বুঁজে সইতেন। মাঝখান থেকে আমার শিশুমন নিষ্পেষিত,ক্লিষ্ট হত শত মর্মবেদনায়। তাই, নানার গ্রামে, প্রথম স্কুল প্রতিষ্ঠিত হওয়ায়, মায়ের যখন ডাক পড়লো সেখানে, শিক্ষকতার জন্য, আব্বা আপত্তি করেন নি। মা চলেগেলেন সেখানে, আমার ছোটবোন টা কে নিয়ে।           

      মা দের ছেলে বেলায়, গ্রামে কোন স্কুল ছিলোনা। দেশ তখন সবে স্বাধীন হয়েছে। মায়ের পরিবারটিই ছিলো গ্রামের একমাত্র শিক্ষিত, সৈয়দ বংশীয় জমিদার পরিবার।মায়ের আর সব আত্মীয় স্বজনরা চলে গেছেন বাংলাদেশে। বাকি সবাই চাষী বাসি খেটে খাওয়া মানুষ। শিক্ষার আলো তেমন প্রবেশ করেনি গ্রামে। মায়েদের তিন বোনকে স্কুলে যেতে হতো অনেক দূরে, পায়ে হেঁটে, তারপর রেলগাড়ি ধরতে হতো। সেই সাত সকালে কোনমতে নাকেমুখে গুঁজে, তিনবোন রওনা হতো ছোটছোট পায়ে,ধানজমির আল ধরে, খালবিল পেরিয়ে ।ট্রেনের যাত্রীরা খুব সহানুভূতির সঙ্গে দেখতো মা'দের। হাত ধরে টেনে তুলতো ট্রেনে, বসার জায়গা করে দিত। গার্ডসাহেব ও ট্রেন ছাড়তোনা, মা'রা না এসে পৌঁছালে। নানা ছিলেন বহু প্রতিভাধর খামখেয়ালী একজন মানুষ। জমিদারীতে বিশেষ আগ্রহ ছিলোনা তাঁর। তার ওপর সিলিং প্রথা চালু হাওয়ায়, জমিজমা অনেক চলে গিয়েছিলো সরকারের হাতে। ছবিআঁকা, গানবাজনা, শিকার, হাতের কাজ, খেলাধুলা, এইসব নিয়েই মেতে থাকতেন, গ্রামের ছেলেপুলেদের সঙ্গে। কাজে বিশেষ মনোযোগ ছিলোনা। এটা ধরতেন,তো  ওটা ছাড়়তেন। সংসারে তাই আর্থিক স্বাচছলতা তেমন ছিলোনা। তবে, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, বাগান ভরা আম, গোলাভরা ধান - এসব ছিলো।         মা ছুটিতে বাড়ি আসতেন, মাঝেমাঝেই। তখন আমার আনন্দ আর ধরে না। ঝিয়ের হাতে রান্না খেয়ে অরুচি ধরে যেতো জীভে, তখন পেতাম মায়ের হাতের রান্নার অমৃতের স্বাদ! মায়ের ছবি আঁকার হাত এবং গানের গলা ছিলো খুব সুন্দর। কাজ করতে করতে মা যখন গান গায়তেন, মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। অবাক বিস্ময়ে দেখতাম তাঁর হাতের আঁকা ছবিগুলি। সাহিত্যে মায়ের ভাষাজ্ঞানেও ভালোই দখল ছিলো। শিক্ষক দের কাছে প্রশংসিত হতেন খুব। আমার প্র্যাকটিকাল খাতা বানানোর দায়িত্ব বর্তাতো মার উপর। স্কুলের পরীক্ষার পড়া নিয়ে আমি যখন ব্যস্ত, মা ই খাইয়ে দিতেন আমায়। পড়াশোনার জন্য যখন রাত জাগতাম,  মাও জাগতেন আমার সঙ্গে। পড়তে পড়তে যাতে ঘুম না পায়, তার জন্য ভাতের বদলে হালুয়া রুটি বানিয়ে দিতেন। পরীক্ষা দিতে যাবার সময় মাকে বলে দিতাম, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোওয়া করতে। আমি বেরিয়ে গেলে, মাও সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়তেন নামাজপাটীতে, দোওয়া গঞ্জল আরস নিয়ে, আর আমিও পরীক্ষা দিতাম নিশ্চিন্তে।                

           আমি কলেজে পড়াকালীন, আব্বা অকালে মারা যান। আব্বা ছিলেন কলেজের অধ্যাপক। স্কুলের শিক্ষকতার চাকরী ছেড়ে মা তখন এসে আব্বার কলেজে যোগ দেন। তখন থেকে সব ব্যাপারেই পেয়েছি মায়ের সাহচর্য্য। অনার্স প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার সময় কলেজের বাইরে অপেক্ষা করেছেন মা ঘন্টার পর ঘণ্টা। কলেজ, ইউনিভার্সিটি তে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে  ঘুরেছেন। বিয়ের পর যখন মা হলাম, মা ই তখন দৌড়াদৌড়ি করেছেন হসপিটাল, নার্সিংহোমে। সেবা শুশ্রূষাও করেছেন মা ই। মা ই আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। আমার আনন্দ ,বেদনা, অনুভব ,অনুভূতি, মায়ের মতো আর কেউ বোঝেনা। মায়ের গানে আমি সুর মেলাই, মা সুর মেলান আমার গানে। আমি ভাবতেই পারিনা মাকে ছাড়া আমার এই পৃথিবীর অস্তিত্ব। 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা