হারানো বসন্ত

4th September 2020 10:59 am রাফিয়া সুলতানা
হারানো বসন্ত



হারানো বসন্ত
রাফিয়া সুলতানা  
20.06.18

সবে বি.এ পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছে। খুব ভালো রেজাল্ট করেছে অপর্ণা। এবার ভালো ইউনিভার্সিটি গুলোতে ভর্তির খুব চাপ। সকাল সকাল বন্ধুদের সঙ্গে সাইবার কাফের খোঁজে বেরিয়েছে সে। সেগুলোতেও উপচে পড়া ভিড়। ফাঁকা দেখে একটা কাফে তে ঢুকলো তারা। সাইবার কাফের ছেলে টিকে দেখে বিরক্ত হলো অপর্ণা। ছেলেটিকে সে অনেক বার দেখেছে তাকে ফলো করতে। পাত্তা দেয়নি সে। তাই তার ইচ্ছা হলো বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। কিন্তু অন্যান্য বন্ধুরা রাজি হলো না। অগত্যা সেখানেই ঢুকলো তারা। সীমা, বেলা, ললিতা, বর্ষা একে একে সবাই ফর্ম ফিলাপ করলো। কিন্তু অপর্ণার যখন পালা এলো তখন লোডশেডিং হয়ে গেলো। ছেলেটি এখুনি কারেন্ট চলে আসবে, এই বলে অপর্ণাকে একটু অপেক্ষা করতে বললো। বাজারে কি কেনা কাটা আছে বলে ,অন্য সকলে সেখান থেকে চলে গেলো। অপর্ণা একাই একটা নিউজ পেপার টেনে নিয়ে বসে বসে পড়তে লাগলো। কিন্তু অনেকক্ষণ কেটে গেলেও কারেন্ট আসার কোন নাম নেই। অবশেষে অধৈর্য্য হয়ে ,পরে আসবে বলে, অপর্ণা সেখান থেকে বেরিয়ে চলে এলো।

 গ্রীষ্মের পড়ন্ত বেলা। গরম টা যেন আজ একটু বেশী ই পড়েছে। রাস্তাঘাটে লোকজন নেই বললেই চলে। ঘাম মুছতে মুছতে, কোন যানবাহনের খোঁজে অপর্ণা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। এমন সময় বাইকে করে সাইবার কাফের সেই ছেলেটি  তার সামনে এসে হাজির । অবাক হয়ে অপর্ণা তার দিকে তাকাতেই 
অপর্ণার হাতে একটা খাম দিয়ে ছেলেটি বললো, এটা কাইন্ডলি একটু খুলে দেখবেন। অপর্ণা খাম টা নিলো ঠিকই, কিন্তু মনে মনে তার খুব রাগ হলো। ইচ্ছা হলো খামটা তখুনি ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ফেলে দেয়। কিন্তু  ছেলেটির সকরুণ দৃষ্টির প্রতি লক্ষ্য করে সেটা আর হয়ে উঠলো না। খামটা ব্যাগে গুঁজে হনহন করে এগিয়ে গিয়ে অপর্ণা একটা অটোয় চেপে  বসলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাড়ি ফিরে সে বেমালুম ভুলে গেলো খামটার কথা। পরের দিন সকাল বেলা আবার বাইরে যাবার তোড়জোড় শুরু হতে টাকা পয়সা গুছিয়ে নিতে ব্যাগটা খুলতেই চোখে পড়লো খামটা। খুব কৌতূহলী হয়ে খামটা খুলতেই একটা পুরনো রঙিন ফটো দেখতে পেলো। তাতে, পাঁচ ছয় বছরের দুই কিশোর কিশোরীর ছবি। দুজনে হাত ধরা ধরি করে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ফটোর পিছনে লেখা - কিছু মনে পড়ে? অবাক বিস্ময়ে অপর্ণা দেখলো, এটি তারই ছোটবেলার ছবি। স্মৃতির পটে হঠাৎ বিদ্যুত খেলে গেলো। ছেলে টি তো বাচ্চু, তার ছোটবেলার খেলার সাথী। ওরা অপর্ণা দের পাশের বাড়িতেই থাকতো ।

ছোট বেলায় একসঙ্গে কত খেলেছে দুজনে, খেলনা পাতি, পুতুল খেলা। ছুটির দিনে দোতলার ছাদে বসতো তাদের খেলা ঘর। তারা চক দিয়ে দাগ কেটে ঘর বানাতো। রান্নাঘর, ডাইনিং, শোবার ঘর, সব থাকতো তাতে। বাচ্চু সাজতো বাবা আর অপর্ণা হতো মা। অপর্ণার ডল পুতুল টা হতো তাদের বাচ্চা মেয়ে। অপর্ণার একটা ছোট্ট  লাল হলুদ ডোরা কাটা শাড়ী ছিলো, সেটা গায়ে জড়িয়ে সে গিন্নী সাজতো। আর বাচ্চু মিছি মিছি কাজে গিয়ে, অফিস থেকে মাইনা আনতো। বাচ্চুর বাবার খুব লটারীর টিকিট কাটার শখ ছিলো।সেই পুরনো টিকিট গুলো হতো তাদের কাছে টাকার নোট।  চিলেকোঠার ঘরটা হতো বাচ্চুর অফিস। বাচ্চু বাইরে থেকে বাজার করে আনতো। অপর্ণা চকগুড়ো জলে গুলে মেয়ের জন্য দুধ বানাতো। চক গুঁড়ো জলে গুললে  তার থেকে বুদবুদ উঠতো।তাই দেখে মনে হতো সত্যি যেন দুধ উনানে গরম হচ্ছে। সে বালি দিয়ে ভাত রান্না করতো। ইঁটের গুঁড়ো দিয়ে ডাল বানাতো। গাছের ডালপালা হতো শাকসবজি।খোলান কুচি হতো মাছ মাংস। তিন তলায় একটা এক কামরার ঘর ছিলো। সেটা হতো তাদের সিনেমা হল। গ্রীষ্মের দুপুরে সেই ঘরের সব দরজা জানালা লাগিয়ে দিলে, ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে রাস্তায় পথচারী লোকেদের সাইকেল রিক্সার সাদা কালো প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠতো ঘরের দেওয়ালে। ছবি গুলো ক্রমশঃ সরে সরে মিলিয়ে যেতো এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সোফায় বসে বসে সেই সব দৃশ্যই তারা সিনেমার মত উপভোগ করতো। খুব ভাব ছিলো দুজনের। তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিশ্রুতি বিনিময় করতো , বড়ো হয়ে  দুজন দুজন কে ছাড়া আর কাউকেই বিয়ে করবে না।

 তারপর হঠাৎ একদিন বাচ্চুর বাবা মারা গেলো। তার মা বাচ্চুকে নিয়ে তার মামারবাড়ি চলে গেলো। সব যেন কেমন ওলোট পালোট হয়ে গেলো। ভেঙে গেলো তাদের সাধের সেই খেলা ঘর। এই ভেবে অপর্ণার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো যে বাচ্চু এখনো তাকে ভোলে নি, সেই ছোটবেলার মধুর স্মৃতি এখনো সে বুকে করে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এতো বছর পর, সে তাকে চিনতে না পারলেও, বাচ্চু ঠিক তাকে চিনতে পেরেছে।এবার বুঝতে পারলো কেন সে তাকে রোজ রোজ এতদিন ধরে ফলো করতো।কিন্তু কোনদিন মুখ ফুটে কোন কিছু বলেনি সে। মনে মনে কতই না বিরক্ত হতো অপর্ণা।  এখন বাচ্চুকে কি জবাব দেবে, ভেবে কুলকিনারা করতে পারলো না সে। 

এই ভাবে বেশ কয়েকদিন কেটে গেলো। কিন্তু সেদিনের পর থেকে অপর্ণার মনে যে আলোড়ন সৃষ্টি  হলো,কিছুতেই তার থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলোনা অপর্ণা । বাচ্চুর করুণ নিষ্পাপ মুখটা শুধু তার মনের পর্দায় ভেসে উঠতে লাগলো। মনে মনে নতুন করে তার প্রেমে পড়ে গেলো অপর্ণা । অগত্যা একদিন আবার হাজির হলো বাচ্চুর দোকানে। এতদিন দাঁতে দাঁত চেপে প্রতীক্ষা করছিলো বাচ্চু এই দিন টার জন্য। তাই অপর্ণা কে আবার তার কাছে ফিরে আসতে দেখে তার  আর বুঝতে কিছু বাকি রইলো না। আবেগে আতিশয্যে মুখে হাত চাপা দিয়ে চেয়ারে বসে পড়লো সে। তার দুটো চোখ যে আনন্দাশ্রুতে ভরে উঠেছে। কিছুতেই সে দেখাবেনা সে তার এ মুখ কাউকে। অপর্ণা ও আর পারলো না নিজেকে সামলাতে। অচিরেই আত্মসমর্পণ করলো সে তার ছোটবেলার খেলার সাথীর কাছে। এই ভাবে, হারানো বসন্ত আবার ফিরে এলো তাদের জীবনে। 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা