অভিমান

4th September 2020 10:41 am রাফিয়া সুলতানা
অভিমান


  " অভিমান "                                         28.03.18
* রাফিয়া সুলতানা *

       সৌম্যদীপের পাঁচবছরের কোমল হৃদয় কিছুতেই যেন বুঝে উঠতে পারে না, কেন তার সঙ্গে নিয়তির এই নিষ্ঠুর পরিহাস! বালিশে মুখ গুঁজে ডুকরে ডুকরে কাঁদে, আর হাঁতড়ে বেড়ায় হাজারটা প্রশ্নের উত্তর। কেন তার পৃথিবীটা এতো শূন্য, এতো খাঁখাঁ ,মরুভুমির মতো? কেন বাড়িতে নেই তার একটা স্নেহের আঁচলের নিরাপদ আশ্রয়? তার ছোট্ট হাতদুটো ধরে, স্কুলে নিয়ে, যাওয়া আসার জন্য কেন  কেউ নেই তার ?  ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে সস্নেহে আঁচলে ঘাম মুছিয়ে কোলে তুলে নেয়না কেন কেউ? রাতে বিছানায় শুয়ে যখন ঘুম আসতে চায়না ছোট্ট দুটো চোখে ,  কেন কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুমপাড়ানী গান গেয়ে ঘুম পাড়ায় না তাকে? অসুস্থ শরীরে সে যখন যন্ত্রনায়,বিছানায় ছটফট করে, কেন কোন কোমল হাতের সহানুভূতির পরশে প্রাণ জুড়ায় না তার? কেন যখন তখন আবদার করার মতো কাউকে পায় না সে? সহপাঠীদের মতো কেন কেউ নিজহাতে বানানো সুস্বাদু খাবারে সাজিয়ে দেয় না তার স্কুলের টিফিনবাক্স ? কেন তার  সুন্দর পৃথিবী টা শূন্য করে দিয়ে,তার মা কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে চলে গেলো তার কোমল হৃদয়টা চু্র্ণবিচুর্ণ করে দিয়ে? বিছানায় একাকি শুয়ে শুয়ে, মায়ের ফিরে আসার মিথ্যে আশায় পথ চেয়ে রয় সৌম্য, দিনের পর দিন।
বড়ো হয়ে সে অবশ্য শুনেছে, কোনো এক ভালোবাসার পাত্রের সঙ্গে ঘর বাঁধবে বলে, তাদের ছেড়ে চলে গেছে তার মা,প্রতিমা,সাজানো সংসার ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়ে। দেখতে দেখতে পনেরোটা বছর পার হয়ে গিয়ে, আজ সে অনেক বড়ো হয়ে গেছে। বাবাই এখন তার সব কিছু। দীর্ঘদিন অনভ্যাসের ফলে, মায়ের অভাব সে আর বোধ করেনা। মাকে তার আর খুব একটা মনেও পড়েনা। মা শব্দটাই যেন তার কাছে রহস্যে মোড়া একটা অলীক বস্ত। 

    অন্যদিকে, প্রতিমার জীবনের স্বপ্ন গুলো , যেন অধরায় থেকে গেলো। কলেজে পড়াকালীন, সহপাঠী সুরজিতকে খুব ভালোবেসেছিলো প্রতিমা। কিন্তু বাড়ি থেকে মেনে না নেওয়ায়, বাবা-মায়ের পছন্দ করা পাত্র নীলরতনকেই বিয়ে করে ঘর বাঁধে সে, যদিও মন থেকে  কোনদিনই মেনে নিতে পারেনি সে নীলরতন কে। তাই পাঁচবছরের কোলের সন্তান, সৌম্যদীপ কে ফেলে একদিন হঠাৎ ই ,চলে যায় সে, সুরজিতের সঙ্গে, নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন নিয়ে । কিন্তু যে মানসপ্রতিম কে কল্পনা করে,তার সঙ্গে স্বপ্নের সংসার বাঁধার  পরিকল্পনা করেছিলো প্রতিমা, সংসারের ঘাতপ্রতিঘাতে ক্রমশঃ ফিকে হয়ে যায় সেই স্বপ্নের রং। আদর্শ মানুষের খোলস ছেড়ে, ক্রমে আসল চেহারাটা বেরিয়ে আসে সুরজিতের। আর পাঁচটা পজেসিভ, আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থসর্বস্ব দাম্ভিক পুরুষমানুষের মতোই ছড়ি ঘোরাতে থাকে, সুরজিৎ, প্রতিমার ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপরে। মনে মনে মিল খায়না দুজনের। ক্রমে ফাটল ধরে সম্পর্কে। প্রতিমার কল্পনার রুপকথার জগৎ টা মানসপটেতে আঁকাই থেকে যায় তার,বাস্তবে  রুপ নেয় না আর। দ্বিতীয় পক্ষের মেয়ে দুটোও মানুষ হয়ে গেছে, এই পনেরো বছরে। তারাও এখন নিজের নিজের জগতে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।  মা কে এখন আর বড়ো দরকার পড়েনা তাদের। থেকে থেকে যেন একটা শূন্যতার হাহাকার নীরবে পীড়া দেয় প্রতিমাকে। 
তাই একদিন ,অদৃশ্য একটা টানে, বাসে চেপে বসলো প্রতিমা। গন্তব্যস্থলে পৌঁছে একটা রিক্সা করে রওনা দিলো তার লক্ষ স্থলের উদ্দেশ্যে। একটা মায়াজড়ানো স্মৃতি যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছে তার প্রাণমন। রিক্সাটা একসময় দাঁড় করালো সে একটা বাগান বাড়ির ফটকের সামনে। বাইরে থেকে এখনো বেশ টিপটপ আছে সেই বাড়িটা। একুশ বছর আগে প্রথম পা দিয়েছিলো সে,নববধু বেশে, এই বাড়িটায়। বিয়ের দু তিন বছরের মধ্যেই শ্বশুর, শ্বাশুরী গত হাওয়ায়, সংসারের হাল ধরতে হয় তাকেই। আনমনে স্মৃতিচারণা করতে করতে, কখন যেন কলিংবেলে হাত পড়ে যায় তার। 

     কলিংবেলের শব্দে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলো এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক। চুলে পাক ধরলেও চেনা যায় এখনো,সেই সৌম্যকান্তি চেহারার নম্র মানুষটাকে। এই কয়টা বছরে তার নিজের রুপযৌবনও অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে প্রতিমার।নীলরতন চিনতে পারবে কি তাকে? - মনে মনে প্রশ্ন করে নিজেকে। চোখে পুরু চশমা পড়া ভদ্রলোক, চশমা টা খুলে এক পলক তাকে দেখে নিয়েই, নির্লিপ্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন," কি চাই ?" একটু কম্পিত গলায় প্রতিমা বলে উঠলো,"কেমন আছো তুমি ?" চুপ করে থাকে নীলরতন। প্রশ্নটা যেন কোন দাগ কাটেনা তার মনে। কোন উত্তর না পেয়ে, একটু থেমে, আবার বলে উঠলো প্রতিমা, " সোমুকে  একবার দেখতে চাই,একটু দেখা হবে? "। "ও । ভেতরে আসুন", বলে নীলরতন ঘরে ঢুকে সৌম্যকে ডেকে দিয়ে, সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো,দোতলায়। তাকে এক ভদ্রমহিলা দেখতে চায়, একথা শুনে একটু অবাক হয়ে, ঘরের টিভিটা বন্ধ করে বৈঠকখানায় বেরিয়ে এলো,কুড়ি বছরের তরতাজা সুদর্শন যুবক সৌম্যদীপ। "কি দরকার?" অচেনা ভদ্রমহিলা কে বেশ কিছুটা কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলো সৌম্য। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে থেকে, বলে উঠলো প্রতিমা, "বাবা, আমায় চিনতে পারলিনা? আমি তোর মারে সোমু! কেমন আছিস বাবা?" আবেগের অশ্রুতে জড়িয়ে গেলো গলাটা প্রতিমার। চমকে উঠলো সৌম্য। " মা - ? আমার কোন মা আছে বলে তো জানিনা। সে তো কবেই হারিয়ে গেছে! -  নিজেকে মা বলে পরিচয় দিতে লজ্জা করেনা আপনার? যে মা, তার আত্মতৃপ্তির জন্য নিজের দুধের শিশুকে একলা ফেলে, ঘর সংসার ছেড়ে চলে যায়, সে আবার কেমন ধরনের মা? আমার মা, এখন আমার কাছে মৃত! দয়াকরে আপনি এখন আসতে পারেন! নইলে আমি দারোয়ান ডাকতে বাধ্য হবো! " কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে, ঘরে ঢুকে সজোরে ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিলো সৌম্য।এতো দিনের না পাওয়ার যন্ত্রনা গুলো যে ভেতরে ভেতরে একটা অভিমানের আগ্নেয়গিরির আকার ধারণ করেছিলো,তার মনের গভীরে, সৌম্য যেন আজকে টের পেলো সেটা ! উথলে ওঠা অভিমান নিয়ে, সেই ছোটবেলার মতো বালিশে মুখ গুঁজে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগলো আবার  মাতৃস্নেহে বঞ্চিত,তার বুভুক্ষু হৃদয়। 

    সৌম্যর কথাগুলো যেন বিষ মাখানো তীক্ষ্ণ শেলের মতো বিঁধলো প্রতিমার বুকে। আজ প্রথম নিজের ওপর তীব্র ঘৃণা হলো তার। পনেরো বছর আগে করা একটা চরম ভুল যেন প্রত্যাঘাত হয়ে আঘাত হানলো তার মনের দেওয়ালে ।তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে উঠলো তার মাতৃহৃদয়। সেখান থেকে বেরিয়ে, নড়বড়ে পায়ে হাঁটতে লাগলো সে, উদ্দেশ্য হীন ভাবে, দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ! 

 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা