প্রত্যাবর্তন

24th August 2020 8:42 pm রাফিয়া সুলতানা
প্রত্যাবর্তন



* প্রত্যাবর্তন *                                     
-- রাফিয়া সুলতানা 
19.06.18

    বিকাশ বাবু আর শোভাদেবীর সাত বছরের সুখী দাম্পত্য জীবন পরমানন্দ কাটছিলো। দুজনেই চাকুরে। সকালে খেয়ে দেয়ে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়েন নিজের নিজের কাজের জায়গায়। ছয় বছরের ছেলে  তাতান কে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসার এবং খাওয়ানো দাওয়ানো প্রভৃতি সর্বক্ষণের দায়িত্ব গভর্নেশ রমলার। তাই শোভা দেবী অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকেন।দুজনের বাড়ি ফিরতে সেই সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি হয়ে যায়। শোভাদেবী রোজ আগেই পৌঁছে যান স্টেশনে। সেখানে একটা নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষা করেন স্বামীর জন্য।তিনি এসে পৌঁছলে, তারপর দুজনে মিলে, একসঙ্গে রওনা দেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। এভাবেই চলছিলো দিনের পর দিন।কিন্তু সেদিন যে কি হলো,দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও দেখা মিললোনা বিকাশবাবুর।ফোন করে করে নাজেহাল হয়ে গেলেন শোভাদেবী, কিন্তু  কোনো সাড়াই মিললোনা। অগত্যা অনেক রাতে একাই বাড়ি ফিরে এলেন শোভাদেবী। সারারাত চরম দুশ্চিন্তায় কাটিয়ে পরের দিন থানায় গেলেন। তারপর, অনেক অনুসন্ধান চললো। হাসপাতাল, মর্গ কোথাও খোঁজাখুঁজির বাদ রইলোনা।কিন্তু কোনই লাভ হলো না। শোক সন্তপ্তা শোভাদেবী কোনমতে নিজেকে সামলে, হাল ধরলেন সংসারের। একাই ছেলেকে বড়ো করে তুললেন তিনি।অনেক বন্ধু বান্ধব বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলো তাঁকে, কিন্তু তিনি রাজি হননি। স্বামীর পথ চেয়ে বসে থাকেন আজও। স্বামীর কল্যাণ চেয়ে সিঁদুর পরেন এখনো। যদিও তাঁর সেই আশা ক্রমশঃ ক্ষীণ হয়ে আসছিল। 

     দেখতে দেখতে আটাশটা বছর কেটে গেলো এইভাবে। ছেলে বড়ো হয়ে এখন জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত।বিয়েও দিয়েছেন ছেলের। ছেলে এখন স্ত্রী পুত্র নিয়ে চাকরীস্থল মুম্বাইয়ে থাকে। শোভাদেবী ও রিটায়ার করেছেন সম্প্রতি। পরিচারিকা সবিতা এখন তাঁর নিত্যসঙ্গী। সারাদুপুর গল্পেরবই আর খবরের কাগজে ডুবে থাকেন,তিনি। সেদিন এমনই এক অলস দুপুরে হঠাৎ বাইরে কলিংবেলের শব্দ শুনে শোভাদেবী একটু আশ্চর্য হলেন, এই অসময়ে আবার কে এলো,এই ভেবে। সবিতা কৌতুহলি হয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো।  দরজার বাইরে একজন বয়স্ক অচেনা মানুষের সঙ্গে একটি অল্প বয়সি তরুণীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলো,সবিতা,কাকে চাই। তরুণীটি শোভাদেবীর খোঁজ করাতে, সবিতা এসে শোভাদেবীক জানালো সে কথা। শোভাদেবী তাদের ভিতরে ডাকলেন। তারপর তাদের ডাইনিং হলে বসতে দিয়ে জানতে চাইলেন কি ব্যাপার। "তুমি আমাকে চিনতে পারলেনা  শোভা?" এই বলে ভদ্রলোক তাঁর চোখের মোটা কালো চশমাটা খুলে ফেললেন। কিছুদিন আগেই তাঁর ছানি অপারেশন হয়েছিলো, তাই এই মোটা কালো চশমা। শোভাদেবী যার পর নাই আশ্চর্য হয়ে দেখলেন,মুখে বয়সের ছাপ পড়লেও এবং মাথার সব চুলগুলো  পেকে গেলেও ,সৌম্যদর্শন বিকাশবাবুকে ঠিকই কিন্তু চেনা যাচ্ছে! শোভাদেবী বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে , বলে উঠলেন," বিকাশ, তুমি!কোথায় ছিলে এতদিন?" এরপর সেই অল্পবয়সি মেয়েটি তাঁকে যে কাহিনী শোনালো, তা এইরকম :-

    প্রায় আটাশ বছর আগে, অফিস শেষে, বাড়ির পথে, স্টেশনে আসার সময়, বিকাশ বাবু যে ট্যাক্সিতে চড়ে ফিরছিলেন, সেটি হঠাৎ একটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।তাতে গুরুতর ভাবে মাথায় চোট পেয়েছিলেন বিকাশবাবু । তখন,সহানুভূতি বশতঃ সেই পথ দিয়ে যাওয়া, এক সহৃদয় তরুণী,শর্মিলাদেবী তাঁকে নিজের গাড়িতে করে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসার পর বিকাশবাবু সেরে উঠলেও,স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। তখন বাধ্য হয়ে শর্মিলা দেবী নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন তাঁর। আসলে শর্মিলাদেবী নিজেই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছিলেন। কিন্তু দুবছর কেটে গেলেও বিকাশবাবুর স্মৃতিশক্তি ফিরলোনা। ইতিমধ্যে তাঁরা দুজন দুজনকে অনেকটা ভালোবেসে ফেলেছিলেন। অগত্যা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁরা। যদিও, এর আগে শর্মিলাদেবী বিকাশবাবুর বাড়ির লোকদের খুঁজে পাওয়ার অনেক চেষ্টা চরিত্র চালিয়েছিলেন।কিন্তু সবই নিষ্ফল হয়ে যায়। শেষে হাল ছেড়ে দেন তিনি। 

     পরবর্তী কালে, নিজের একটা ব্যাবসা শুরু করেন বিকাশবাবু। তাঁদের একটি কন্যসন্তানও হয়। বিকাশবাবুর সঙ্গে আসা মেয়েটিই হলো তাঁর সেই কন্যা ,অদিতি। একমাত্র মেয়ে হওয়ার সুবাদে অদিতির বিয়ে দিয়ে মেয়েজামাই কে নিজের বাড়িতেই রেখে দেন বিকাশবাবুর ও স্ত্রী শর্মিলাদেবী।বিকাশবাবুর ব্যাবসা এখন জামাই সুকান্তই দেখাশোনা করে। অদিতির  ছেলে আছে, তিন বছরের। অদিতি নিজে স্কুলশিক্ষিকা। ভালোই কাটছিলো তাদের দিন।কিন্তু বিধাতার বোধহয় অন্যরকম ইচ্ছা ছিলো। 
সম্প্রতি, একদিন স্ত্রী শর্মিলাদেবীকে নিয়ে নিজের প্রাইভেট গাড়িতে চড়ে বেড়াতে যাবার সময় আবার একবার ভয়াবহ একটা দুর্ঘটনার কবলে পড়েন বিকাশ বাবু ও তাঁর স্ত্রী শর্মিলা । আঘাত গুরুতর হওয়ায় শর্মিলাদেবীর সেখানেই মৃত্যু হয়।মারা যায় ড্রাইভার টিও। বিকাশবাবুর মাথায় ভীষণ চোট লাগে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি এ যাত্রা। শুধু তাই নয়, সেই আঘাতে আচমকা স্মৃতিশক্তিও ফিরে আসে তাঁর।আচমকা পুরনোদিনের কথা সব বলতে থাকেন  মেয়ে অদিতিকে।স্ত্রী শোভা ও পুত্র তাতানের সঙ্গে দেখা করতে চেয়ে অস্থির হয়ে পড়েন একেবারে। বর্তমানের কথা এখন একরকম ভুলেই গেছেন তিনি। অদিতি জানতো বাবার হারানো স্মৃতি শক্তির কথা। তাই, মায়ের শেষকৃত্য সমাপন করেই আজ ছুটে এসেছে অদিতি বাবাকে সঙ্গে করে , বিকাশবাবুকে তাঁর পুরনো সাথী শোভাদেবীকে ফিরিয়ে দিতে! সব শুনে, শোভাদেবী, আনন্দে আত্মহারা হয়ে জড়িয়ে ধরলেন তাঁর এতদিনের হারিয়ে যাওয়া প্রাণনাথকে! তাঁর এতদিনের শবরীর প্রতীক্ষা সফল হয়েছে আজ। অনেক কৃতজ্ঞতা জানালেন তিনি মেয়ে অদিতি ও পরলোকগতা শর্মিলাদেবীর উদ্দেশ্যে, যাদের জন্য আজ,এতোদিন পরেও, তিনি ফিরে পেলেন নিজের জীবন সঙ্গীকে। ঘটনাটার একদিক দিয়ে দুঃখজনক হলেও, শেষ পর্যন্ত একটি মিলনান্তক ঘটনার মধ্য দিয়ে হলো তার পরিসমাপ্তি। শোভাদেবী শুধু তাঁর হারানো স্বামীকেই ফিরে পেলেন না, পেলেন একটি সহৃদয় মেয়ে,অদিতিকেও।অদিতি নিজের মাকে হারিয়ে মুমূর্ষু হয়ে পড়লেও, নতুন মা পেয়ে পেলো কিছুটা সান্ত্বনা।সর্বোপরি বাবাকে তার পুরনো পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে পেলো পরম পরিতৃপ্তি। ছেলে খবর পেয়ে মুম্বাই থেকে মিলিত হতে এলো, ছোটবেলায় নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া বাবার সঙ্গে। দুটি পরিবার এখন মিলে মিশে এক হয়ে গেলো। 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা