মায়া

23rd August 2020 11:42 am রাফিয়া সুলতানা
মায়া



* মায়া *
------- রাফিয়া সুলতানা 
08.10.18

        একটি দোতলা বাড়ির, নীচের তলায় আবিরদের বাস। বছর খানেক হলো, অন্য শহর থেকে তারা এখানে বদলী হয়ে এসে ,এই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে।  আবিরের বাবা, মা ও বড়দাদা থাকে তার সঙ্গে।  আবিরের বড় ভাই শুভ্র একটি স্পেশাল চাইল্ড। সে সবসময় নিজের জগতে বিভোর থাকে,নিজের মনেই খেলা করে,ভাইয়ের সাথে খেলে না। বাবাও সারাদিন, নিজের ফার্ম নিয়েই ব্যস্ত, আর মা রান্নাবান্না, গৃহস্থালি অন্যান্য কাজকর্ম নিয়ে। তাই আবির খুব নিঃসঙ্গ।
বেশ ক'দিন থেকেই একটা সাদা  ছাই রঙের ছোপ ওয়ালা সুন্দর একটা মেনিবিড়াল,এ বাড়িতে আসা যাওয়া শুরু করেছে। বেচারা আবিরের, এই বিড়ালটাই এখন একমাত্র সঙ্গী । সে যখন জানালার ধারে বিছানায় পড়তে বসে, বিড়ালটাও জানালায় ঠাই বসে থাকে।সে যেদিন আসে না,দশ বছরের এই বালক, আবিরের কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। ক্রমে সেও বুঝতে পারে, আবির তাকে খুব পছন্দ করে। তাই মাঝে মাঝে এসে, আবিরের কোলে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে সে । আবার কখনো বা, পড়ার সময়, তার অঙ্কের খাতার উপর এসে গা এলিয়ে দেয়। আবির আর তার মা,রুক্সানা তার এই কাণ্ডকারখানা দেখে বেশ মজা পায়। যদিও, তার বাবা, নিজাম সাহেব এসব একটুও পছন্দ করেন না।
বিড়ালটা যখন তখন ম্যাও ম্যাও করতে করতে খাবার চাইতে এলে, রুক্সানা রাগ করে বলে ওঠে, "এসে পড়েছেন, মহারাণী ভিক্টোরিয়া?" সেই থেকে তার নাম একরকম ভিক্টোরিয়াই হয়ে গেছে। 

       à¦à¦–ন বর্ষার মরসুম। দুদিন ধরে একনাগাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ির চারদিকে জল জমে গেছে। ফলে, এই দুদিন ভিক্টোরিয়ার আর দেখা সাক্ষাৎ নেই।  সেদিন, দুপুরবেলা আবির হাঁপাতে হাঁপাতে এসে, মাকে ডেকে নিয়ে গেলো, ছোট স্টোর রুমটার দিকে। এই ঘরটা সচরাচর খুব একটা ব্যবহার হয় না। বাড়তি মালপত্র গুলো থাকে এখানে। আর মাঝে মাঝে আবির খেলা করে এখানে, ছোট খাটটার উপরে বসে। ভাঙাচোরা জিনিষ দিয়ে নানারকম ইঞ্জিনিয়ারিং চলে তার । এটা সেটা বানায়, সে সেগুলো দিয়ে । তাই, এটা একান্তই তার নিজের ঘর। 

         à¦†à¦¬à¦¿à¦° সেই ঘরের, খাটের তলা থেকে একটা পরিত্যক্ত জুতোর বাক্স টেনে বের করতে দেখা গেলো, তার ভিতর চার চারটে সদ্যোজাত বিড়ালছানা । বুঝতে কারো আর বাকি রইলো না,এগুলো ভিক্টোরিয়ারই সম্পত্তি। কখন লুকিয়ে রেখে গেছে সে তাদের, সংগোপনে, কেউ টেরই পায়নি এতদিন । রাস্তায় জল জমায়, সে আর আসতে পারছে না,বাচ্চাকে দুধ দিতে । বাচ্চা গুলো ক্ষিদেয় কাতরাচ্ছে। অগত্যা রুক্সানাই নিলো তাদের পরিচর্যার ভার। মা,বেটা মিলে পরম যত্নে দুধ গরম করে, ড্রপারে করে ছানা গুলোকে দুধ পান করাতে শুরু করলো। অভুক্ত বাচ্চাগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেলো,তাতে। পরদিন বৃষ্টি কমাতে, তাদের মা ফিরে এলে, আবির আর রুক্সানা অনেকটা নিশ্চিন্ত হলো যেন । 

          একদিন সন্ধ্যা বেলা ওই ঘরটা থেকে বিড়ালের ঝগড়া- মারামারির আওয়াজ পেয়ে, আবির আর রুক্সানা ছুটে গিয়ে দেখলো, একটা হুলো বিড়াল এসে, একটা বাচ্চার গলা কেটে রেখে দিয়ে গেছে। আর দুটো ছানাও বেপাত্তা।  আর একটা বাচ্চাকে তার মা মুখে করে ছুটে নিয়ে এসে শোবার ঘরে, দেওয়ালের গায়ে, খোলা ওয়্যারড্রোবটায় এনে লুকিয়ে রাখলো। 

                   à¦¹à§à¦²à§‹ বিড়ালের সহজাত প্রবৃত্তি হলো, সদ্যোজাত কোন হুলো বাচ্চার খোঁজ পেলেই তার গলা কেটে তাকে হত্যা করা। হুলোর সংখ্যা যাতে, বৃদ্ধি না পায়, এবং নিজের এলাকায় তার প্রতিপত্তি যাতে বজায় থাকে, এইজন্য, এটাই তাদের প্রকৃতিগত নিয়ম। রুক্সানার এই ব্যাপারটা আগেই জানা ছিলো। ঘটনার ভয়াবহতা ও আকস্মিকতায়, মা,ছেলে দুজনেই খুব মর্মাহত হলো। তাই অবশিষ্ট বাচ্চাটাকে তার নিরাপদ আশ্রয় থেকে তাড়ালো না তারা। এই বাচ্চাটারই বা কতদিন আয়ু আছে, কে জানে, এই ভেবে আবির ও তার মা খুব চিন্তিত হয়ে পড়লো। বাচ্চাটার সবে চোখ ফুটেছে। সে সারা আলমারীময় সন্দিগ্ধ চিত্তে ,নড়বড়ে পায়ে, শুঁকে বেড়াতে লাগলো,তার নতুন এই আস্তানাটি ।আবির বেশ মজা করে তার কার্যকলাপ উপভোগ করতে লাগলো আর সেটা মোবাইলে ভিডিও করে রাখলো।কে জানে, কবে আবার এটাও উধাও হয়ে যাবে!
সত্যি, সে আশঙ্কাই সঠিক প্রমাণিত হলো। ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে, সেই বাচ্চাটাও নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো। তার মা ভিক্টোরিয়া কেঁদে কেঁদে সারা বাড়ি তাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলো আর তার বুকফাটা কান্নায়, মা,ছেলে, এমন কি ছেলের বাবার পক্ষেও স্থির থাকা অসম্ভব হয়ে উঠলো। বিড়ালছানা গুলো একে একে সবাই শেষ হয়ে যাওয়ায়, বাড়িশুদ্ধ সবাই বেশ মুষড়ে পড়লো। 

       à¦¦à§‡à¦–তে দেখতে দুমাস কেটে গেলো। ভিক্টোরিয়া আগের মতোই এবাড়িতে দুবেলা  যাতায়াত করতো ।একদিন হঠাৎ তার সঙ্গে তার সেই হারানো চতুর্থ বাচ্চাটা এসে হাজির হলো । বোধহয়, এতদিন ভিক্টোরিয়াই তাকে গোপন কোন ডেরায় লুকিয়ে রেখেছিলো। যাইহোক, তাকে জীবিত এবং বহাল তবিয়তে দেখতে পেয়ে, আবির আর তার মায়ের খুশির আর অন্ত রইলো না।পরম সমাদরে তাকে তারা এ বাড়িতে আশ্রয় দিলো। আবিররা তাকে ক্যাট্রিনা বলে ডাকে। সে আবার এতটাই ন্যাওটা হয়ে উঠলো যে, সারাক্ষণ সে শুধু এই বাড়ির ভিতরেই থাকতো। সেখানেই খাওয়া, সেখানেই শোওয়া। সারাক্ষণ রুক্সানার পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ানো। নিজাম সাহেব যখন টেবিল চেয়ারে বসে কাজ করতেন, লাফ দিয়ে উঠে সে তার পিছনটায় বসতো । রুক্সানা মুখ টিপে হাসতো আর বলতো , "যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়!", কারণ নিজাম সাহেব বিড়ালের সঙ্গে মাখামাখি একদম পছন্দ করতেন না। 

             à¦†à¦¬à¦¿à¦°à§‡à¦° মশারীর পাশে, তাকে ঠেস দিয়ে না শুলে ক্যাট্রিনার ঘুম হতো না। আবিরেরও, তাকে পাশে না দেখলে ঘুম আসতো না। একবার রুক্সানারা পুরী যাবে ঠিক করলো। কিন্তু ক্যাট্রিনার কি হবে?ভেবে তারা বেশ সমস্যায় পড়লো। সে তো এ বাড়ি ওবাড়ি চরে খেতে জানে না। কিন্তু কি আর করা যায়? তাকে অদৃষ্টের হাতে ছেড়ে দিয়ে, তারা তিনদিনের জন্য পুরী চলে গেলো। ফিরে এসে দেখলো, তারা যা আশঙ্কা করেছিলো, তাই ঘটেছে। এই কটাদিন, ক্যাট্রিনা, খাবারের সন্ধানে, সেখান থেকে এক পাও নড়েনি। নড়বে কি করে, সে তো শিকার করতেই শেখেনি! অন্যকোন লোকের বাড়িও যায়নি। ফলে, এই তিনটে দিনে নিরম্বু উপবাসে থেকে তার চেহারা খানা যা হয়েছে, তা আর দেখার মত নয়! সবার খুব খারাপ লাগলো, তার কথা ভেবে । এবার থেকে কোথাও গেলে, রুক্সানা তার জন্য ফ্রিজে খাবার রেখে যায়। আর রাতে যাকে রেখে যায়, বাড়ি পাহাড়ার জন্য, তাকেই , দুবেলা ওকে খাবার দেবার দায়িত্ব দেয়া থাকে। 

           à¦¦à§‡à¦–তে দেখতে বছর ঘুরে গেলো।  আবার ওদিকে, আবিরদের এই ভাড়াবাড়িটা বদলানোর কথা চলছে। বর্ষার জল জমে এ বাড়িটায় বাস করা বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। এবার তো বর্ষার সময়, বাইরের জমা জল, দেয়াল চুঁইয়ে প্রত্যেকটি ঘরে ঢুকে পড়েছিলো।তাই, এ বাড়ি পাল্টাতেই হবে।  রুক্সানাও তাই বেশ চিন্তায় পড়লো,কারণ ক্যাট্রিনা এবার মা হতে চলেছে । দেখতে দেখতে ক্যাট্রিনার তিন তিনটে বাচ্চা হলো। আর ক'মাস পর তাদের এ বাড়ি ছাড়ার কথা। বাড়ি খোঁজা চলছে। সেটা ভেবে, রুক্সানা খুব বিমর্ষ হয়ে পড়লো। মনে মনে চাইতে লাগলো, ছানা তিনটে তাড়াতাড়ি বড় হয়ে উঠুক।নিজে নিজে চরে খেতে শিখুক, নইলে তারা চলে গেলে, তাদের দুর্দশার আর অন্ত থাকবে না। বাচ্চা তিনটেই মাদী, তাই তাদের আর হুলোর হাতে মারা পড়ার ভয় নেই। তাদের নাম রাখা হলো, যথাক্রমে বিউটি, কিউটি আর সুইটি।

      অন্যান্য বিড়াল-মা সচরাচর বাইরে থেকে, তাদের ছানাদের জন্য খাবার সংগ্রহ করে আনে। কিন্তু এদের মা যে ইঁদুর শিকার করতেই জানে না।  অন্য কোন কিছু সংগ্রহ করে যে তাদের জন্য  আনবে, সে গুড়েও বালি! সে তো কিছুই শেখেনি। হ্যাঁ, সে বাইরে থেকে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে,বাচ্চাদের জন্য কিছু আনতো বটে, কিন্তু মাছের ফুলকা, পাখনা , এইসব আনার বদলে,সে নিয়ে আসতো, রক্তমাখা মাছের খালি চিকচিকি বা প্লাস্টিকের প্যাকেট। সে বেচারা এটাও জানতো না,তাতে খাদ্যদ্রব্য বলে কিছুই নেই। তার এই কাণ্ডকারখানা দেখে, আবির আর তার মা,রুক্সানা তো হেসেই অস্থির!

       à¦à¦¦à¦¿à¦•ে সারা বাড়ি ঐ তিনটে বাচ্চার দৌরাত্ম্যে, নিজাম সাহেব একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন। প্রায় তিনি এ ব্যাপারে তাঁর অসন্তোষ ব্যক্ত করতে লাগলেন। বাড়িটাতো ক্রমশঃ বিড়াল গুলোর আস্তানায় রূপান্তরিত হয়ে গেলো।  ক্রমে আবিরের বুকসেল্ফটাও তাদের দখলে চলে গেলো। তারা মনের সুখে, সেই সেল্ফের এক তলা, দোতলা, তিনতলায়, যেখানে পারছে, বই খাতার উপরেই, ঘুম দিচ্ছে, হুটোপাটি করছে। এঘর ওঘরময় খেলা করে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। যেন রাম রাজত্ব! এদিকে এসব দেখে, নিজাম সাহেবের মেজাজ ক্রমশঃই বিগড়ে যাচ্ছে। অশান্তি এড়াতে, রুক্সানাও এ বাড়ি ছাড়ার ব্যাপারে উদগ্রীব হয়ে উঠলো। নতুন বাড়ির খোঁজও পাওয়া গেলো ইতিমধ্যে। 
কিন্ত আবির সাংঘাতিক রকম বেঁকে বসলো। এবাড়ি এবং বিড়ালবাচ্চা, কোনটার মায়াই তার পক্ষে ছাড়া যে সম্ভব নয়, সে এ কথা, তার মাকে  সাফ জানিয়ে দিলো। রুক্সানা পড়লো বিপাকে! সে কার মন রাখে? স্বামী না ছেলের! 

"এত মায়া করলে, এ পৃথিবীতে চলে না,বেটা! সবকিছুইতো একদিন ছেড়ে চলে যেতে হবে। এমন কি, বাবা-মা তারাও তো চিরদিন বেঁচে থাকবে না।"

----- এই বলে ছেলেকে বোঝায় সে। কিন্তু এইসব দার্শনিক কথাবার্তা, আবিরের ছোট মাথায় ঢুকতে চায় না। 
ফলে তার মাকে নিতে হলো অন্য কৌশল। যেহেতু, নতুন বাড়িটা, এ বাড়িট থেকে খুব একটা দূরে নয় , পিছনের পাড়াতেই। তাই সেখান থেকে আবির চাইলে, রোজ দুবেলা আসতে পারে, এখানে। বাচ্চা গুলোকে দেখতে এবং তাদের খাবারের যোগান দিতে। 
এই কথা বলে, আবিরকে কোন মতে রাজি করিয়ে একদিন তারা, নতুন ভাড়াবাড়িতে গিয়ে উঠলো। আসার সময় ছানা তিনটেকে ছেড়ে আসতে গিয়ে, আবির খুব কান্নাকাটি করলো বটে , তবুও বড়দের সিদ্ধান্ত তো ছোটদের অবশেষে মেনে নিতেই হয়। তাই অগত্যা আবিরকেও তাই করতে হলো! তবে আবির দুবেলা সাইকেল করে বাচ্চা তিনটের জন্য দুধ নিয়ে আসতো,রোজ, নিয়ম করে।

         à¦¬à¦¾à¦šà§à¦šà¦¾à¦—ুলোও ভেবে পেলো না,তাদের মনিবরা কোথায় ,কেন হঠাৎ চলে গেলো! আবার নিশ্চয় ফিরে আসবে, এই আশায় তারা সেই বাড়িটার বারান্দাতেই সারাক্ষণ অপেক্ষা করতো। ততদিনে তাদের মা,ক্যাট্রিনা তার নিজের ভাগ্য অনুসন্ধান করতে শিখে গেছে। বাচ্চাদের খোঁজ খবর সে আর নেয় না। কিছুদিন পর সুইটিও নিজের ভাগ্য অন্বেষণে,সেখান থেকে কোথায় চলে গেলো। কিন্তু বিউটি আর কিউটি এখনও, আবিরের পথ চেয়ে সেখানেই বসে থাকে। দেখতে দেখতে প্রতিবেশীদেরও মায়া পড়ে গেছে তাদের উপর। তারাও কিছু কিছু করে খেতে দেয় ওদের। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ, কিউটি একদিন রাস্তা পারাপার করতে গিয়ে মোটর সাইকেলে চাপা পড়ে মারা গেলো। বোন বিউটি সারাদিন সারাক্ষণ তার মড়াবোনের পাশে মন খারাপ করে বসে রইলো। তারপর মনের দুঃখে, সেও কোথায় উধাও হয়ে গেলো। এদিকে আবিরের তো দুঃখের আর সীমা পরিসীমা রইলো না। 

          কিন্তু উপরওয়ালা জানতেন তার মনের কথা। তাই বোধহয়, এ পাড়াতেও একটা মা-বিড়াল, তার দুটো বাচ্চাকে নিয়ে তাদের আশেপাশে আনাগোনা শুরু করে দিলো। কিছুদিন পর তারাও যেন টের পেয়ে গেলো, আবিরের বিড়ালের প্রতি আসক্তির কথা। তাই সেই বাচ্চাদুটোও এবার আবিরের এই বাড়িতে আসা আরম্ভ করলো।  রুক্সানা রোজ সকালে বাটিতে করে, তাদের দুধ খেতে দেয়। তাদের নাম রাখা হলো চার্লস আর ডায়ানা।আবির তাদের পেয়ে অতীতের সব দুঃখ ভুলে গেলো। দেখতে দেখতে তিনটে বছর কেটে গেলো। এতদিনে তাদের বাড়িতে ডায়ানার আরো দুটো বাচ্চার আমদানী হয়েছে,ম্যাডোনা আর মোনালিসা। বলাই বাহুল্য, বিড়াল বাচ্চাদের নতুন নতুন নামকরণ করতে আবির ও রুক্সানার বেশ ভালোই লাগে । 

         à¦¸à¦•াল হতেই তারা দুইবোন মায়ের সঙ্গে কোথা থেকে এসে হাজির হয়, দুধ খাওয়ার জন্য। ক্যাট্রিনার মত ম্যাডোনাও, রুক্সানার পায়ে পায়ে ঘোরে।সে যখন নামাজ পড়তে বসে, তার নামাজপাটীতে সেও তাকে ঠেস দিয়ে বসে। কখনো কখনো আদর করে তার পায়ে কামড় দেয়। তার শাড়ির আঁচল নিয়ে খেলা করে। আবির তাকে কোলে তুলে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে । কাগজে দড়ি বেঁধে ,তাদের তার পিছনে ছুটিতে নিয়ে খেলা করে। নিজাম সাহেব তাদের জন্য চিকেনের গলা কিনে আনেন। মোনালিসা সারাক্ষণ তাদের জানালায় ঘুমায় । বেশ সুখেই আছে তারা এবং আবির। 

              ইতিমধ্যে নিজাম সাহেব নিজেদের একটা নতুন ফ্ল্যাট কিনেছেন, এখান থেকে চার কিলোমিটার দূরে । আর ছমাস পর সেটা কমপ্লিট হয়ে যাবে। তখন আবার আবিরদের বাড়ি ছাড়ার পালা। আবির কি পারবে, আবার মোনালিসা আর ম্যাডোনাদের মায়া ত্যাগ করে সেখানে যেতে? 

 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 à¦—ীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 à¦à¦‡ বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ!