দিল্লীকা লাড্ডু

23rd August 2020 11:38 am রাফিয়া সুলতানা
দিল্লীকা লাড্ডু



* দিল্লীকা লাড্ডু *
-----রাফিয়া সুলতানা 
26.09.18

              পরেশ নাগ,তার কলেজে খুব জনপ্রিয় ছিলো , ছাত্র নেতা হিসাবে। সকলের বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়া ছিলো তার স্বভাব । তবে কলেজে তার যেমন দাপট ছিলো, সেরকম কর্মদক্ষতাও ছিলো। লোকের উপকার করতে ,যেকোন বিপদের ঝুঁকি নিতে সে কখনো পিছপা হতো না। যারা এইরকম সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকে, সচরাচর লেখাপড়ায় তারা খুব একটা সাফল্য লাভ করতে পারে না। বড়দাদাদের হাতে পায়ে ধরে , কারো কারো, এক আধটা চাকরি জুটে গেলেও,পরেশের ভাগ্যে সে শিকে ছেঁড়েনি। একটা দুটো হাতের কাজ জানা থাকায়, এটা ওটা করে কোনরকমে সংসার চালাতো সে । একবার সে, এক ধনী ব্যবসায়ীর ম্যানেজারের দায়িত্ব পেলো । ভদ্রলোকের নানারকম ধান্ধা ছিলো, এক নম্বরী ব্যবসা যেমন ছিলো, তেমন কিছু দুনম্বরী কারবারও ছিলো। ফলে যা হবার তাই হলো। কিছুদিনের মধ্যেই তার সব কাজ কারবার  লাটে উঠে গেলো। ভদ্রলোক অনেক লোকের কাছে অনেক টাকা, ধারদেনা করে অবশেষে ,কোন গোপন ডেরায় গা ঢাকা দিয়ে,লোকচক্ষুর অন্তরালে ফেরার হয়ে গেলেন। বেচারা পরেশ পড়লো বিপদে। শুধু যে তার চাকরিটাই গেলো, তা নয়, পাওনাদারদের যাবতীয় রাগ ,আক্রোশ গিয়ে পড়লো তার উপর। দিন কতক জেলের ঘানিও টানতে হলো তাকে। যাইহোক, অনেক কষ্টে সে সব সামাল টামাল দিয়ে ,এবার কাঠমিস্ত্রীর কাজে হাত দিলো সে। আসলে তার এক ভাই ছিলো কাঠের কারিগর। তার আন্ডারেই, সামান্য কিছু মজুরির বিনিময়ে কাজ করা শুরু করলো পরেশ ।

               ইতিমধ্যে কিছু পয়সাকড়ি জড় করে ,ভাড়াবাড়ি ছেড়ে, কোনরকমে একটা ছোট খাটো নিজস্ব বাড়িও বানিয়েছিলো সে। বোধহয়, স্ত্রীর বাপের বাড়ির থেকে কিছু সাহায্যও পেয়েছিলো , তাই স্ত্রীর নামেই বাড়িটা রেজিস্ট্রি করা হয়ে ছিলো। পরেশ অনেক সখ করে তার একমাত্র ছেলেকে একটা নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করেছিলো  , তাকে ভালো করে লেখাপড়া শিখিয়ে, মানুষের মত মানুষ করে, নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন ছেলের মাধ্যমে পূর্ণ করবে এই আশায়। কিন্তু ভাগ্য বিরূপ। টুয়েল্ভ পাশ করার আগেই সে পাড়ারই একটা মেয়ের সঙ্গে ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়লো। নানারকম ড্রেস করে, টেরি বাগিয়ে, পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে, মেয়েটার সঙ্গে ফুর্তি করে বেড়াতো সে। বাবাকে তো জীবিকার স্বার্থে, এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে হত, তাই তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে, তার এই লারেলপ্পা গিরি করতে বেশ সুবিধাই হয়েছিলো । মা রমলা, বেচারা একাহাতে,তাকে কঠোর শাসনের চেষ্টা করতো বটে, তবে জোয়ান মর্দ ছেলের সঙ্গে পেরে উঠতো না । একই ক্লাসের ছাত্রী, রুমি নামে সেই মেয়েটি তার সঙ্গে একই  জায়গায় টিউশনি পড়তো। ফলে অচিরেই দুজনের পড়াশোনার বারোটা বেজে গেলো। রুমির ক্ষমতাবান ও প্রতিপত্তিশালী বাপের কাছে, সেই ব্যাপারটা জানাজানি হতেই দেখা দিলো সমস্যা।মেয়ের বাবা গোপালবাবু তো ভীষণই চটে গেলেন। শুরু হলো মেয়েকে শাসন, ছেলেকে শাসানো ।অবস্থা বেগতিক দেখে, তারা একদিন বিয়ে করে পালিয়ে গেলো, ভিন শহরে, রাজার মাসীর বাড়িতে । রুমির বাবা ছিলো পরেশের চেয়ে অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন  ও ধুরন্ধর গোছের ।পাড়ায় যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তিও ছিলো তার । ক্লাবের সব ছেলেরা ছিলো তার হাতের মুঠোয়। তবে ভদ্রলোকের স্বভাব যে খুব একটা ভালো ছিলো না, পরেশ এবং তার ছেলে রাজার তা ভালো ভাবেই জানা ছিলো।  তার দাম্ভিক, রুক্ষ মেজাজ এবং ক্ষমতার আস্ফালন  পাড়াপ্রতিবেশী সকলের কাছে বেশ সুবিদিত ছিলো। এহেন লোকের মেয়েকে  পটিয়ে নিয়ে ফেরার হলে, তার ফল যে কি হতে পারে, সে তো সবার জানা ! খবরটা চাউর হতেই, মেয়ের বাবার অভিযোগ পেয়ে, পুলিশ এসে হানা দিলো ছেলের বাড়ি। পাড়ার ছেলেরা এসে পরেশের বাড়িতে হামলা করে তার স্ত্রীকে বেশ খানিকটা চমকে দিয়ে গেলো। ভাগ্যিস পরেশ সেদিন বাড়ি ছিলো না। ইতিমধ্যে কপাল জোরে সে একটা প্রাইভেট কোম্পানির মালিকের গাড়ির ড্রাইভারির চাকরি পেয়েছিলো। তাই সে মালিককে নিয়ে দিনকতকের জন্য, গাড়ি নিয়ে অন্য শহরে পাড়ি দিয়েছিলো। রাজা এবং রুমি, দুজনেই ছিলো আঠারো বছরের কম বয়সী, অর্থাৎ, নাবালক, নাবালিকা। তাই তাদের এই বিয়ে ছিলো সম্পূর্ণ বে-আইনী। যাইহোক, পরেশের এক পরিচিত উকিল বন্ধুর সাহায্যে, সে যাত্রা তারা আগাম জামিন নিয়ে রেহাই পেলো , শ্রীঘরে প্রবেশের হাত থেকে । কিন্তু মেয়ে নাবালিকা হওয়ায়, কেসে ফেঁসে গেলো রাজা ও তার পরিবার । বলাই বাহুল্য,একবার মোকদ্দমায় জড়িয়ে গেলে, সাধারণ কোন পরিবারের যে কি দুরবস্থা হয়! সেই কেস চালাতে জলের স্রোতের মত দিনের পর দিন টাকা বেরিয়ে যেতে লাগলো পরেশের । ফলে পরেশকে অনেক ধারদেনা করতে হতে লাগলো,কড়া সুদে, মহাজনের কাছ থেকে। মেয়ে যদিও কোর্টে জানালো, যে সে স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে তার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে এসেছে।যার ফলে, পরেশ ও রাজা এ যাত্রা বেঁচে গেলো,জেলের ঘানি টানা থেকে ।কিন্তু কেসের চক্কর থেকে রেহাই পেলো না তারা । 

                 মেয়ে শ্বশুরবাড়ি এলো। মন দিয়ে ঘরকন্না করতে লাগলো প্রথম প্রথম । স্বামী স্ত্রী দুজনেই নতুন করে পড়াশোনা শুরু করলো আবার । কিন্তু একবার পা পিছলে গেলে, আবার খাড়া হয়ে দাঁড়ানো অত সহজ হয় না । ফলে, তারা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলো।অবশেষে, দুজনাই জীবিকার চেষ্টা করতে লাগলো। রুমি বিউটিশিয়ান কোর্স করে একটু আধটু রোজগার করতে শিখলো। রাজা ছোট খাটো কাজ যোগাড় করলো একটা । সুন্দরী না হওয়ায়, এবং তার একমাত্র আদরের ছেলেকে পটিয়ে,বিনাপণে এভাবে উড়ে এসে জুড়ে বসায়, শাশুড়ি খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলো না রুমির উপর । তবুও তখনকার মত কোনভাবে মানিয়ে নিয়েছিলো সে, ব্যাপারটা। ভালোই কাটছিলো তাদের দিন। কিন্তু গণ্ডগোল বাধলো মেয়ের বাবা ও  মাকে নিয়ে । তারা মেয়ের শ্বশুর  বাড়ির হাঁড়ির খোঁজ খবর নিতে মাঝে মধ্যেই সেখানে হুমচে হুমচে আসতে লাগলো। আজ কি রান্না হলো, মেয়ের ভাগ্যে রুই মাছের মুড়ো, কচি পাঁঠার মেটে, ডিমের ডালনা, পনিরের কোফতা, এসব জুটলো কিনা- নিত্যদিন চললো তার খবরাখবর নেওয়া। এদিকে বেচারা পরেশের চারিদিকে দেনার দায়ে তখন ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি - অবস্থা! মাছ, মাংস দূরের কথা, কোনরকমে দুটো শাক চচ্চড়ি আর ডাল ভাতই শুধু জোটে দুবেলা । তাই দেখে শুনে,মেয়ের বাবা-মায়ের দুঃখের আর সীমাপরিসীমা রইলো না। প্রায় তারা মেয়ের জন্য চর্ব্য চুষ্য রেঁধে বেড়ে  নিয়ে আসে,আর তাদের মেয়ে যে এসব ছাড়া ,ভাত একদম খেতেই পারে না, নাকিকান্না গেয়ে গেয়ে এসব কথা শোনায় আর পরেশের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়! 

                  কথায় বলে, দরজা দিয়ে অভাব ঢুকলে, জানালা দিয়ে প্রেম পালিয়ে যায়। রুমিরও হলো সেই হাল ! ক্রমে তার স্বপ্নের ঘোর কেটে যেতে লাগলো !ডকে উঠলো ভালোবাসা! দুদিনের মধ্যেই আমে দুধে মিশে গেলো। বাবা মায়ের দরদভরা আদিখ্যেতায়, মেয়েরও চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগলো। শ্বশুর শাশুড়ি তার বাবা-মায়ের এহেন আচরণের সমালোচনা করলেই, সে ফোঁস করে ওঠে। বলে, ওনারা যা বলেন, তা তো আমার ভালোর জন্যই বলেন। ফলে, অচিরেই তার স্বামী, শাশুড়ির সঙ্গে গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেলো। রাজা ইতিমধ্যে ছোটখাটো যা কিছু কাজ জোগাড় করেছিলো, তা তার বড়লোক শ্বশুর ও তার মেয়ের পছন্দ হচ্ছিলো না।রাজা কিন্তু সাধ্য মত চেষ্টা করতো তাদের মন জয় করার। একদিন একটা অ্যাক্সিডেন্টে কিছুদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হলো গোপালবাবুকে।ভালোভাবে জখম হয়েছিলো সে। প্রয়োজন পড়ায়, তার জামাই, রাজা তাকে নিজের শরীর থেকে দু বোতল রক্তও দিলো। তবু দুটো পরিবারের যেন কিছুতেই বনিবনা হলো না। স্বামীকে তার আর্থিক অক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে, মাঝে মধ্যেই খোঁটা দিতে শুরু করলো রুমি । তার শাশুড়িমাও  নিজমুর্ত্তি ধারণ করলো আস্তে আস্তে। ফলে তীব্র অশান্তি দেখা দিলো পরিবারে। রুমির বাবা তার বিয়াইকে ক্রমাগত চাপ দিতে লাগলো, তাদের বসত বাড়িটা তার মেয়ের নামে লিখে দেওয়ার জন্য। শেষে, সেই মতলব সিদ্ধ না হওয়ায় অবশেষে, একদিন রুমি তার বাবার প্ররোচনায় শ্বশুরবাড়ি ছাড়লো,   থানায় এই  অভিযোগ জানিয়ে, যে, তারা তাকে অত্যাচার করতো, পণের জন্য জোরজবস্তি করতো দেহব্যবসায় প্ররোচনা দিতো, ইত্যাদি ইত্যাদি । ফলে পরেশের পরিবার দ্বিতীয় বারের মতো আবার মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়লো, তবে এবার আরো গুরুতর অভিযোগের দায়ে ! ক্রমে, দেনার ভারে ডুবে গেলো পরেশের পরিবার। রাজার মাকে নিতে হলো লোকের বাড়ির রাঁধুনির কাজ। বাড়ি বন্ধক পড়লো।গয়নাগাটি যা ছিলো, সব বিক্রি হয়ে গেলো। এইভাবে রাজাকে অনেক মূল্য দিয়ে স্বাদ আস্বাদন করতে হলো,  ' দিল্লীকা লাড্ডুর '! আর অপরিণামদর্শী সন্তানের এই আহাম্মুকির মাসুল , বেচারা পরেশকে দিতে হলো গুণে গুণে কড়ায়, গণ্ডায় বাকি জীবনটা ধরে ! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা