সব ভালো যার শেষ ভালো

21st August 2020 8:44 pm রাফিয়া সুলতানা
সব ভালো যার শেষ ভালো



* সব ভালো যার শেষ ভালো *
------- রাফিয়া সুলতানা 
29.01.19

অনেক সাধনার ফল অবশেষে মিলেছে। মণিকা আজ শহরের একটি নামী হাসপাতালের নবনিযুক্ত ডাক্তার। হাসপাতালে জয়েন করতেই সুপারিন্টেন্ডেন্ট  সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে তাকে। চাকরির প্রথম দিনটা বেশ ভালোই কাটলো মণিকার। অনেক সংগ্রাম করে তাকে আজ এই জায়গায় পৌঁছাতে হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক অশান্তির শিকার সে। পরপর দুটি কন্যাসন্তান হওয়ায় মাকে প্রায় লাঞ্ছিতা হতে দেখেছে বাবার বাড়ির লোকজনের কাছে। উঠতে বসতে মাকে সইতে হত শাশুড়ির গঞ্জনা আর স্বামীর কাছে লাঞ্ছনা। মেয়ে হিসাবে জন্ম নেওয়ায় খুবই হীনমন্যতায় ভুগতে হতো তাকে, সেই ছোট্ট বয়স থেকেই। অবশেষে একদিন তাদের ঘর থেকে বের করে দেয় তার বাবা অবনীকান্ত । অপমানিত মা আর কোনদিনও ফিরে যায়নি সেখানে। দুটি মেয়েকে নিয়ে এসে ওঠে নিজের মামা রমাপ্রসাদের কাছে। কারণ তাঁর নিজের বাবা অল্পবয়সে, তার বিয়ের আগেই মারা যান। বিধবা মা বা দুই দাদার কারোরই সংসারে উটকো বোঝা হতে মনে সায় দেয় নি তার।মামার অবস্থা বেশ ভালো ছিলো। তাকে স্নেহও করতেন খুব। বিমলার বিয়েও দিয়েছিলেন তিনি, নিজেই খরচপত্র করে। তাই তাঁর কাছে এসে ওঠাই মনস্থ করে বিমলা। শহরে, মামার একটি মিষ্টির দোকান ও হোটেল ছিলো। সেখানে রাঁধুনির কাজ নেয়  বিমলাদেবী । তাঁর হাতের রান্নার গুণে অল্পদিনেই রমরমিয়ে ওঠে মামার ব্যাবসা। মোটামুটি দিন চলে যাচ্ছিলো একরকম। কিন্তু ভাগ্যের বিড়ম্বনার এখানেই শেষ ছিলো না। ছোটবোন কণিকা আবার এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন হারিয়ে গেলো । অনেক অনুসন্ধান করেও কোন খোঁজ মিললো না তার। কেঁদে কেটে মায়ের তো পাগলের মত অবস্থা। তবু ভাগ্যকে অবশেষে মেনে নিতেই হয় সকলকে। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলো মণিকা।বড়ো হয়ে কিছু একটা করে দেখানোর জিদ দানা বেঁধেছিলো তার মনের অন্তঃস্থলে। রমাপ্রসাদের অর্থাৎ মায়ের সেই মামারও অনেক স্বপ্ন ছিলো তাকে নিয়ে। তারজন্য টাকাকড়ি খরচ করতে কোন কসুরই করতেন না তিনি। 
রমাপ্রসাদ ছিলেন নিঃসন্তান ও বিপত্নীক। তাই শেষ বয়সে, হোটেল ও দোকানের মালিকানা ভাগ্নি বিমলার নামেই লিখে দিয়ে যান তিনি । ফলে অর্থকষ্ট তেমন ছিলো না তাদের। তাই মণিকা আজ এত দূরে আসতে পেরেছে।

 ডিউটী শেষ করেই মাকে তার নতুন অভিজ্ঞতা জানানোর জন্য পড়িমরি করে ছুটতে ছুটতে বাড়ি এসে মণিকা দেখে, হোটেলের  সামনে , অনেক মানুষের ভিড় আর চিৎকার। বুকটা ধড়াস করে উঠল মণিকার। ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে দেখে, যা ভয় করেছিলো তাই। মা অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে আছে, আর কয়েকজন তাঁকে পাখার বাতাস করছে, কেউ চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে। কিন্তু মায়ের কোন সাড়া শব্দই পাওয়া যাচ্ছে না। এমন কি, কোনো পাল্স পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। মণিকা বার কয়েক মা-মা করে চিৎকার করে ,কাঁদতে শুরু করলো। কিন্তু বিপদের সময় ভেঙে পড়লে চলবে না। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। ছোট থেকেই অনেক ঝড় ঝাপটা বয়ে গেছে তার জীবনে। তাই বেশ ম্যাচুওর্ড ব্রেনের মেয়ে সে।আর সময় নষ্ট না করে একটা অ্যাম্বুলেন্স ডেকে নিজের হাসপাতালেই ভর্তি করালো মাকে। ডাক্তারের মা বলে কথা। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে গেলো ট্রিটমেন্ট। ঢোকানো হলো আই সি ইউতে। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। অবিলম্বে চিকিসার প্রয়োজন।বেশ কিছু সময় পর, চিকিৎসায় সাড়াও দিলেন তিনি। তবে হার্ট খুব দুর্বল। অনেক খানি ব্লক আছে। পেসমেকার বসাতে হবে। পরেরদিনই সব ব্যবস্থা হয়ে গেলো। বসানো হলো পেস মেকার। আস্তে আস্তে সেরে উঠছেন তিনি। মাকে এখন জেনারেল বেডে দেওয়া হয়েছে। একটি অল্প বয়সী আয়াও রাখা হলো, তাঁকে সর্বক্ষণ দেখভালের জন্য। বেশ সুশ্রী। ছিপছিপে গড়ন। নাম মুনিয়া। 

সেদিন মণিকার নাইট ডিউটী ছিলো। মাঝরাতে, রাউন্ড দিতে গিয়ে ভাবলো, মাকে একবার দেখেই যায়। মায়ের কাছে যেতেই অবাক হয়ে দেখলো, পেসেন্টের সঙ্গে অন্যান্য আয়ারা সব বেঘোরে ঘুমালেও, মুনিয়া মায়ের কাছে চেয়ার পেতে বসে একমনে বই পড়ছে।

কৌতূহলী হয়ে মণিকা জিজ্ঞাসা করলো, 
----------সেকি! এত রাত হয়ে গেছে, তুমি এখনো ঘুমাও নি? 

উত্তরে সে বললো, 
---------না। রাত জাগা আমার অভ্যাস আছে। বাবাও অসুস্থ কিনা। বাবার পাশেও আমি এমনই জেগে থাকি। 
------তোমার বাবার কি হয়েছে? 
-------টিবি। 
মণিকার কেমন যেন খটকা লাগলো। 
---------তাহলে, তুমি যে, কদিন ডিউটী করছো, বাবার কাছে কে আছে? 
---------দিদি। সে বিধবা। এক- ছেলে নিয়ে আমাদের সাথেই থাকে। আমাদের মা নেই। খুব ছোটবেলায় মারা গেছে। বাবা রিক্সা চালাতো। এখন পারে না। আমার রোজগারেই গোটা সংসার চলে। 
খুব মায়া হলো মণিকার। পরেরদিনই তার বাবাকে দেখতে তাদের বাড়িতে এলো। স্যাঁতসেঁতে ঘিঞ্জি বস্তিতে ,তাদের  দুকামরা টিনের ঘর। অল্প কিছু আসবাব। তবে বেশ ছিমছাম। 

তার বাবা সত্যিই খুব অসুস্থ। মুনিয়ার দিদি সোনিয়া। তাদের বাবা লছমন লাল। হিন্দুস্থানী । 
অনেকক্ষণ তার কাছে বসে, মণিকা মুনিয়াদের ছোটবেলার গল্প শুনলো।সোনিয়া, মুনিয়া কেউই নাকি তার নিজের মেয়ে নয়। সোনিয়া তার দাদা রামলালের মেয়ে। দাদা বৌদি ছোট বাচ্চা রেখে দুজনায় ডেঙ্গিতে মারা যায়। 
আর পাঁচ বছর বয়সে মুনিয়াকে রাস্তায় কুড়িয়ে পায় সে। ঠিকানা জানতে না পেরে নিজের কাছেই রেখে দেয় লছমন । বৌ অকালে নিমুনিয়া হয়ে মারা গেলে নিজেই কোলে পিঠে মানুষ করেছে মেয়ে দুটোকে। সব শুনে, কৌতূহল বশতঃ মণিকা তার কাছ থেকে মুনিয়ার ছোটবেলার সব জিনিসপত্র, যা লছমন খুব যত্ন সহকারে এতদিন আগলে রেখে ছিলো, তা নিজের মাকে দেখানোর জন্য হাসপাতালে নিয়ে এলো। 
মণিকার কাছে সব শুনে তিনি দেখতে চাইলেন, সেই জিনিসপত্রের পুঁটুলিটা। তাতে রাখা ছিলো মুনিয়ার ছোটবেলার একটা কমলারঙের কালো কালো ববি প্রিন্টের ফ্রক, গলার রুপোর চেন, হাতের তামার নোয়া, মাথার লাল ফিতে,পায়ের একজোড়া গোলাপী স্যান্ডেল। দেখতে দেখতে তার সব মনে পড়ে গেলো। হ্যাঁ, এগুলোই তো ছিলো কনিকার পরণে, যখন পাঁচবছর বয়সে দাদুর সঙ্গে মেলা দেখতে গিয়ে সে হারিয়ে গিয়েছিলো। এরকম ফ্রক মণিকারও একটা ছিলো। দুইবোনের জন্য একই রকমের ম্যাচ করে কেনা হয়েছিলো। 
মা আনন্দে আত্মহারা হয়ে জড়িয়ে ধরলেন মুনিয়াকে। আর কোনো সন্দেহ নেই, মুনিয়াই হচ্ছে তাঁর হারিয়ে যাওয়া ছোটমেয়ে কণিকা। মণিকারও যে সন্দেহ হয়েছিলো, সে রাতে চেয়ারে বসা মুনিয়ার ঘাড়ের পিছনে জরুলটা দেখে, সেটাই সত্যি প্রমাণিত হলো। কণিকারও যে ঐ জায়গায় অমন একটা জরুল ছিলো, সেটা  মনে পড়ে গিয়েছিলো তার। তখনই কেমন যেন খটকা লাগে তার মনে। তারপর থেকেই মুনিয়ার প্রতি  কৌতূহল বেড়ে যায় মণিকার । জানতে চায় তার কাছে তার পরিবারের কথা। 

মণিকাও খুব খুশি হলো এতদিন পর, হারিয়ে যাওয়া ছোটবোনকে খুঁজে পেয়ে। কণিকাও বেশ খুশি হলেও, তার পালক পিতা লছমন ও দিদি সোনিয়াকে ছেড়ে এসে থাকতে চাইলো না মণিকাদের কাছে। মণিকাও পীড়াপীড়ি করলো না। কারণ, যতই হোক, এতদিনের নিবিড় বন্ধন। সেকি সহজে ভোলা যায়! মণিকা ততক্ষণে মনস্থির করে ফেলেছে। এবার থেকে লছমনের  সব চিকিৎসা ও সংসারের যাবতীয় খরচপত্র সে-ই বহন করবে। ফলে অচিরেই মুনিয়ার পরিবারে ফিরে এলো সুদিন। দেখতে দেখতে তার বাবা লছমনও সেরে উঠলো। দুটি পরিবারই এখন খুব সুখি। তাইতো বলে , তার সব ভালো যার শেষ ভালো । 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা