কাঙালের মা

21st August 2020 8:41 pm রাফিয়া সুলতানা
কাঙালের মা



* কাঙালের মা *
-------রাফিয়া সুলতানা 
26.10.18

       রুবিনা রোজই লক্ষ্য করে একটা বিকলাঙ্গ বুড়ো সব্জিওয়ালা ,তার হাতে চালানো রিক্সা ঠেলে রোজ কষ্ট করে তাদের পাড়ায় আসে, সব্জি বিক্রি করতে। ঠিক বেলা একটা দুটো সময়। রুবিনার গৃহস্থালির কাজকর্ম তখন প্রায় সব সারা হয়ে যায়। তখন সবার স্নান সেরে খাওয়া দাওয়ার পালা। এই অবেলায়, কে তার সব্জি কিনবে? সব্জিওয়ালাকে দেখে আর রোজ রোজ এই কথাটাই ভাবে রুবিনা । রোগা, কালো হাড় জিরজিরে বাঁকা শরীর,পরণে আধময়লা একটা শার্ট আর লুঙ্গি। রিক্সার পিছনে ঝোলানো, দু তিনটে ময়লা ময়লা থলিতে করে সব্জি এনে তার জানালার পাশ দিয়ে রোজ হাঁক দিয়ে যায় সে,

" কি মা , সব্জি লাগবে না আজ?"

রোজই একই বুলি আওড়ায় সে। কি জানি তার সব্জি কেউ কেনে কিনা ! থলি গুলোর যা চেহারা! তা দেখে কারও সব্জি কিনতে ইচ্ছা হয় বলে, মনে হয় না রুবিনার। একদিন সেই বুড়োটাকে, তাদের বারান্দার পাশ দিয়ে যেতে দেখে, রুবিনা তাকে  ডেকে জিজ্ঞেস করে বসলো, "তোমার বাড়ি কোথায় গো ?"
 বুড়োটা খেঁকিয়ে উঠলো, "আমার বাড়ি কোথায়, তা জেনে, তোমার কি লাভ? "এই বলে।

 রুবিনা বুঝলো, বুড়োটা খুবই বদমেজাজী। সেই থেকে রুবিনা তার সাথে দেখা হলেও আর কথা বলে না। একদিন বুড়োটাই রুবিনা কে দেখতে পেয়ে ডেকে বললো, 
"আমাকে একটু চা দিতে পারো,মা ?" 
রুবিনা খুশি হয়ে বললো, "হ্যাঁ, দেবো। দাঁড়াও একটু।"

 রুবিনা মনে মনে ভাবতো, বুড়োটা এত কষ্ট করে সব্জি বিক্রি  না করে বেড়িয়ে,তো ভিক্ষা করতে পারে। কত সক্ষম লোকই তো ভিক্ষা করে বেড়ায়, আর তার যখন এত কষ্ট!পরে তার কথা শুনে বুঝেছিলো, শরীরে যতক্ষণ ক্ষমতা আছে, সে পরিশ্রম করেই খেতে চায়, ভিক্ষাবৃত্তি তার একদম পছন্দ নয়।

       রুবিনার কেমন যেন একটা টান আছে, লোকটার প্রতি। এরপর থেকে মাঝে মাঝেই সে রুবিনার কাছে, এক কাপ চা, দুমুঠো মুড়ি চেয়ে খেতো।আর তার এই সামান্য উপকার করতে পেরে রুবিনার বেশ ভালোই লাগতো ,এই ভেবে, কি জানি, হয়তো আজ সারাদিনের মত, এই কটা খাবারই তার কপালে জুটলো। তার বাড়ির লোকজন তাকে দেখে, বা খেতে দেয়, বলে মনে হয় না রুবিনার। কেননা, এর পর মাঝে মাঝেই সে, পুরনো  থালা, মাদুর, গায়ের চাদর, ছাতা,পুরনো বালতি ইত্যাদি বিভিন্ন ছোটখাটো সামগ্রী চায়তো রুবিনার কাছে।কখনো সখনো দুদশটা পটল, চিচিঙ্গা, টমেটো এই সব দিয়ে যেতো তাকে, নিজের ইচ্ছায়, বিনা মূল্যে।রুবিনা কিছুতেই নিতে চাইতো না। কারণ, তার স্বামীর বাজার থেকে কেনা সব্জি  সবসময়ই মজুত থাকতো তার ফ্রিজে। এরপরও সব্জি নিলে, সেগুলো খামোখা নষ্ট হবে। অপচয় করা রুবিনার একদমই পছন্দ নয়। কিন্ত, বুড়ো পীড়াপীড়ি করতো  সেগুলো নেবার জন্য, আর বলতো ,

 "রাগ করো না মা। তোমায় মা বলে ডেকেছি। আমি তো এগুলো ভালোবেসে দিচ্ছি। "

রুবিনার কাছে এসে প্রায়ই সে এভাবে মা মা করে ডাকে, আর এটা সেটা চায়। রুবিনার মা যখন থাকেন, তিনি তার এই ঘনঘন আবদার একদমই ভালো চোখে দেখেন না। সে এলেই, মা রাগে গজগজ করতে থাকেন আর বলেন,
 "ঐ! এসেছে আবার আপদটা!"
রুবিনা বলে, "আহা বেচারা! কোথায় পাবে বলো? ও কি আমাদের মত মাস গেলে বেতন পায়? ওর তো সারাটা সময় অভাব থাকবেই। আমরা যদি ওকে কিছু সাহায্য না করি , তাহলে ওকে কে দেবে ? ঈশ্বর তো কাউকে দিয়ে, আর কাউকে না দিয়ে পরীক্ষা করেন। আজ যদি আমি ওর অবস্থায় থাকতাম, আর ও আমার অবস্থায়? হতেই তো পারতো! "
মা যেন একটু শান্ত হন, একথা শুনে। 

             একদিন বুড়োটা এসে বললো, তার রিক্সা খারাপ হয়ে গেছে, সারাই করতে হাজার খানেক টাকা লাগবে। রুবিনার মা তো শুনে রেগেই আগুন! বুড়োর সাহস তো কম নয়! 
রুবিনা মাকে লুকিয়ে তাকে পাঁচশো টাকা দিয়ে বললো, বাকিটা অন্য কোনভাবে জোগাড় করে নিতে। রুবিনার ইচ্ছা হলো প্রয়োজনীয় সব টাকাটাই তাকে দিয়ে দেয়, কারণ এই রিক্সাটাই তার যাতায়তের একমাত্র সম্বল। পায়ে বোধহয় পোলিও ছিলো লোকটার।হাঁটতে পারতো না একদম। কিন্ত, মায়ের ভয়ে, এবং বুড়োটারও লোভ দিন কে দিন বেড়ে যাবে, এই আশঙ্কায়, তাকে পুরো টাকাটা দিলো না রুবিনা । কিন্তু কিছুদিন পর সে আবার এসে হাজির। বাকি টাকাটা জোগাড় করতে পারেনি । কোনরকমে আরও দুশো টাকা জোগাড় করেছে। আরও তিনশ টাকা না পেলে, সারাইয়ের দোকানে তাকে, রিক্সাটা ফেরত দেবে না বলেছে। অগত্যা রুবিনা, তাকে বাকি টাকাটা দিয়েই দিলো। বুড়ো খুব খুশি!আবার সে রিক্সা নিয়ে সব্জি ফেরি করে বেড়ায় আর রুবিনাকে দেখলেই বলে,
 "মা ,তোমার উপকার আমি জীবনে কোনদিনও ভুলবো না।"
 রুবিনারও তৃপ্তি হয় এই ভেবে, একটা অসহায় লোকের কিছুটা উপকার করতে পেরেছে সে।

         বছর খানেক বাদে, রুবিনার পরিবার, সেই বাড়ি ছেড়ে,পাশের পাড়ায়, অন্য ভাড়াবাড়িতে চলে গেলো। সবজি ওয়ালা বুড়ো আর আসে না তার এই নতুন বাড়িতে।তাই, সব সময় কি যেন একটা অভাব অনুভব করে রুবিনা। একদিন বাজারে বুড়োটার সঙ্গে দেখা হলো রুবিনার। রুবিনা তাকে নিজের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে, চা খেতে আসতে বললো। কিন্তু বুড়োটা এলো না। স্বামীর কাছে দুঃখ করে সে কথা বলতেই, তার স্বামী একদিন বাজার থেকে তাকে পথ চিনিয়ে নিয়ে এলো এই বাড়িতে । রুবিনা তো খুব খুশি, বুড়োর মুখে আবার মা ডাক শুনতে পেয়ে। তবে সে আজকাল আর সব্জি বেচতে পারে না। লোকের কাছে চেয়ে চিনতে দুটো মুড়ি, এক কাপ চা খেয়ে ,পথে পথেই কাটিয়ে দেয় সারাটাদিন, বা কোন গাছতলায়। রুবিনার ইচ্ছা করে তাকে প্রতিমাসে মাসোহারা বাবদ সামান্য কিছু দেয়। সেই সঙ্গে যদি তার পরকালেরও কিছু সুব্যবস্থা করা যায়, তো মন্দ হয় না। তাই, রুবিনা একদিন তাকে ডেকে বললো, "সারাজীবনই তো কষ্ট করেই কাটালে! শেষ জীবনে একটু উপরওয়ালাকে স্মরণ কর, যাতে পরের জীবনটা সুখের হয়।তোমাকে তো দেখি গাছতলায় ঘন্টার পর ঘণ্টা অলস ভাবে বসে থাকো। শুধু শুধু বসে না থেকে যদি একটু ঈশ্বরকে স্মরণ কর, তো তিনিও তোমাকে স্মরণ করবেন। তোমার পরজীবনে মঙ্গল হবে। তুমি যদি কথা দাও, যা বললাম তা করবে, তাহলে,তোমাকে প্রত্যেক মাসে একশোটা করে টাকা দেবো। মাসের প্রথম হলেই, এসে সেটা নিয়ে যাবে।"
বুড়ো তৎক্ষনাৎ তাতে রাজি হয়ে গেলো। রুবিনা দেখলো সে ঈশ্বরের নাম, গান ভালোই জানে। ভালোই হলো, এরপর থেকে প্রত্যেক মাসে তারজন্য একশোটা টাকা রুবিনা বরাদ্দ করে রাখে। বুড়োটাও কোন ভুল করে না,এসে সে টাকা নিয়ে যেতে। মাঝে মাঝে, সে টাকা পাওয়ার পরও, কয়েকদিন বাদে আবার এসে বলে, "মা,কিছু টাকা লাগবে। আমার রিক্সার চাকা পাংচার হয়ে গেছে, শ'তিনেক টাকা দিও"।

-------কি? এই তো সেদিন চাকা সারাতে টাকা নিলে! আবার? 
-------না মা,সেবার তো পুরনো টায়ার লাগিয়েছিলাম। আবার নষ্ট হয়ে গেছে! 
-------তুমি এত ঘনঘন টাকা চাইলে, কোথায় পাবো! 
টাকা কি গাছে ফলে? 

সে মাথা নেড়ে অমায়িক হাসি হেসে বলে,
-------- না মা!
রুবিনা মনে মনে ভাবে, ফলে না তো! সেই জন্যই তো সে বার বার আসে। নইলে তো গাছ থেকেই পেড়ে নিতো! 
কিন্তু মুখে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলে, 
---------এই শেষ বার! ফের যদি চেয়েছো, ভালো হবে না কিন্ত। 
এই বলে আবার মাসকাবারী খরচা থেকে, টাকা এনে দেয় তাকে। বুঝতে পারে, এ মাসে একটু টানাটানি হবে, অনেক গুলো উপরি খরচা হয়ে গেছে ।ছেলের চারখানা ওয়ার্কবুক, ডাক্তার খরচ। তার উপর এই সব! তবু জানে, মাস ঠিক চলে যাবে, উপরওয়ালার কেরামতিতে ! দান করলে যে, ধন কমে না! দশগুন বৃদ্ধি পায়! একটা ধান পুঁতলে, সে গাছ থেকে যেমন দশটা ধানের শীষ গজায়, ঠিক তেমনি। 

        রুবিনার আশঙ্কা, মাস চারেক পরই তাদের চলে যেতে হবে, নিজেদের কেনা নতুন ফ্ল্যাটে। সেটা এখান থেকে অনেক দূরে। তখন সত্যি করেই হারাতে হবে তার এই বুড়ো ছেলেটাকে।তখন কি হবে! বড় মায়া পড়ে গেছে যে ,তার এই কাঙাল ছেলেটার উপর !





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা