রাখে আল্লাহ

19th August 2020 1:46 pm রাফিয়া সুলতানা
রাখে আল্লাহ


* রাখে আল্লাহ * 
----- রাফিয়া সুলতানা
17.11.18

সেদিক সকাল বেলা রুবিনা তার দুই ছেলে সাগর আর আকাশকে স্কুলে যাবার জন্য রেডি করে দিয়ে, নিজেও তাড়াতাড়ি নাকে মুখে খানিকটা গুঁজে স্কুলের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে রওনা হতে যাবে, এমন সময় একটা ফোন! বিরক্ত হয়ে, ফোনটা আবার ব্যাগ থেকে বের করতে করতে ভাবলো, কেন যে এই অসময়ে ফোন করে সব! জানে সে একটা স্কুলে চাকরি করে, এখন বেরনোর টাইম। সব আত্মীয় স্বজনকে বলা আছে, এই সময় ফোন না করতে! তবুও..... 
ভাবতে ভাবতে ফোনটা বের করতে করতেই সেটা কেটে গেলো। দেখলো মায়ের মিস কল। কল ব্যাক করতেই ওপার থেকে মায়ের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। আমি খুব অসুস্থ রে! দুদিন ধরে বিছানায় পড়ে আছি। একবার আসতে পারবি তুই? 

কলেজে পড়াকালীন ই বাবাকে হারিয়েছে রুবিনা। দুই বোনের মধ্যে সে-ই বড়ো। ছোটবোন সাবিনা মায়ের কাছেই থাকে। তার শ্বশুরবাড়ি ঐ শহরেই। তবুও বড়ো মেয়ে হওয়ার সুবাদে মায়ের অসুখ  বিসুখে, চিকিৎসা ও সেবা শুশ্রুষায় রুবিনাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। এর আগে, কলকাতায় নিয়ে গিয়ে,মায়ের বড়ো দুটো অপারেশন সে ই করিয়ে নিয়ে এসেছে। গলব্লাডারে স্টোন আর হার্নিয়া। তাই খবরটা পেয়েই বেশ বিচলিত হয়ে পড়লো রুবিনা। কিন্ত স্কুলে এখন বার্ষিক পরীক্ষা চলছে, তাই স্কুলে যেতেই হবে তাকে। 
স্কুলে গিয়ে বড়দি মনিকে জানালো তার মায়ের অসুস্থতার কথা। ছুটি চাইলো দুদিনের। কিন্তু মুখ দেখে বুঝলো, খুব একটা সন্তুষ্ট নন তিনি। বললেন, এই সময় ছুটি নিলে খুব অসুবিধা হবে । রুবিনা কাকুতি মিনতি করে বললো অন্ততঃ একদিনের ছুটি যেন মঞ্জুর করা হয় তাকে। মনে মনে ভাবলো পরের দিন গিয়ে, সেদিনই মাকে নিয়ে ফিরবে সে। প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি । যেমন কাজের চাপ, তেমনই কড়াকড়ি। ছেলের অসুখ বিসুখ হলেও মুক্তি নেই। অসুস্থ ছেলেকে বাড়িতে রেখে স্কুলে যেতে হবে। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে রুবিনার। চাকরি তো নয়, যেন দাসত্ব! 

যাইহোক পরেরদিন স্বামীকে রাজি করিয়ে একটা প্রাইভেট মারুতি ভ্যানে রওনা হলো তারা। ছেলে দুটোই ছোট। তাই কোনভাবেই বাড়িতে রেখে যাওয়া যাবে না তাদের। অগত্যা হোল্ ফ্যামিলিকেই যেতে হলো সেখানে । গিয়ে দেখলো মা আপাততঃ একটু সুস্থ আছেন। ডাক্তার দেখানো হয়েছে। বোন রান্না করে রেখেছে। মাকে তাড়াতাড়ি রেডি করে, কোনরকমে দুপুরের খাওয়াটা খেয়ে নিয়ে আবার ফিরতে হবে তাদের । প্রায় চারঘন্টার পথ। তার ওপর শীত কাল। ছোটদিনের বেলা। বড়ছেলে খুব পছন্দ করে দিদার বাড়ি আসতে। সে কিছুদিন থাকতে চায় এখানে। এখুনি আবার ফিরে যেতে হবে শুনে তার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। বোন মাকে আজই সকালে ডাক্তার দেখিয়ে এনেছে। সেই ওষুধ গুলো কেনা হয়নি। দুপুর বেলা। বেলা দুটো বাজে। সব দোকানীরাই প্রায় দোকান বন্ধ করে খেতে গেছে। ফলে এ দোকান সে দোকান ঘুরে ওষুধ পেতে, বেলা তিনটে বেজে গেলো। এত বেলায় রওনা দিতে রুবিনার স্বামীরও  খুব একটা সায় ছিলো না। কিন্ত রুবিনার স্কুলে কামাই করা যাবে না। হেডমিসট্রেসকে কথা দিয়েছে সে। তাই রুবিনার পীড়াপীড়িতে সেই অ-বেলাতেই আবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো তারা। 

সন্ধ্যাবেলা গাড়ি দাঁড় করিয়ে একজায়গায় এগরোল কিনে টিফিন করে নিলো সবাই। কে জানে, ফিরতে কত রাত হবে, সেই ভেবে। একটু পরেই অন্ধকার হয়ে গেলো। হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ী তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে হাইরোড ধরে। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না, আশেপাশের। শুধু মাঝে মাঝে সামনে থেকে ধেয়ে আসা গাড়িগুলোর জোরালো হেডলাইটে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে সবার । 

রুবিনার চার বছরের আর ন'বছরের দুই ছেলে সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসে। রুবিনা, আর তার স্বামী ও মা পিছনের সিটে মুখোমুখি বসে। রুবিনার হঠাৎ কি মনে হলো,ছোট ছেলে আকাশ কে নামিয়ে পিছনের সিটে বাবার পাশে বসালো। রাস্তার দুধারের দৃশ্য দেখা গেলে সময়টা বেশ দেখতে দেখতে কেটে যায়। কিন্ত রাতের অন্ধকারে সেটা আর হয়ে উঠছিলো না,ফলে সবারই কেমন যেন বোরিং লাগছিলো - এই জার্নি। রুবিনা সামনে দিকে চেয়েছিলো। তার হঠাৎ মনে হলো সামনে থাকা লরিটার সঙ্গে তাদের গাড়িটার ব্যবধান যেন দ্রুত কমে আসছে । ভাবতে না ভাবতেই বিকট একটা আওয়াজ করে তীব্র একটা ঝাঁকুনি দিয়ে তাদের গাড়িটা থেমে গেলো। আসলে সামনের লরিটা লাইট অফ করে বে-আইনী ভাবে, রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ছিলো ।তাদের গাড়ির ড্রাইভার সেটা বুঝতে পারেনি। বোধহয় একঘেয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে, একটু ঝিমুনিও এসেছিলো তার। 

রুবিনা আর তার মা ছিটকে পিছনের দুটো সিটের মাঝের জায়গাটায় এসে পড়লো। আকাশ আর তার বাবাও হুমড়ি খেয়ে পড়লো সামনে। বাবার চশমাটা ছিটকে কোথায় হারিয়ে গেলো। সবাই বুঝতে পারলো, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লরিটার সঙ্গে তাদের বিড়াট অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।সামনে বসা বড়োছেলের কথা মনে হতেই রুবিনা সভয়ে সামনে তাকিয়ে দেখলো, ছেলের উপর গাড়ীর সামনের অংশটা চিটিয়ে লেগে আছে আর ছেলে অস্বাভাবিক রকম স্থির হয়ে বসে আছে। কোন কিছু ভেবে ওঠার আগেই, রুবিনার মুখ দিয়ে একটা কথাই বেরিয়ে এলো,- আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নাই। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ড্রাইভারও একই কথা বলে উঠলো। রুবিনা চিৎকার করে ডাকলো, - সাগর ! 
সাগর শুধু একটু ঘাড় ঘোরালো। রুবিনা কিছুটা আশ্বস্ত হলো তাতে । রুবিনার স্বামী, মা,ছোট ছেলে সবাই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। মা বললো সাগেরর কি হলো!হায় কি সর্বনাশ হলো! স্বামী বললো, হায়রে! আমার ছেলে গুলো সব শেষ হয়ে গেলো! কারণ ঘন অন্ধকারে কেউ কিছু দেখতে পাচ্ছিলো না। গাড়ির সামনেটা পুরো চেপটে গিয়ে পিছনের দিকে সেঁটে গিয়েছিলো, কাঁচটাও ভেঙে চুরমার হয়ে যাবার কথা ছিলো। কিন্তু সেটা খুলে নীচে পড়ে গেছিলো।গাড়ির বামদিকের অংশটা, যেদিকে রুবিনার ছোটছেলে প্রথমে বসেছিলো, পুরোটাই তুবড়ে গিয়েছিলো। ভাগ্যিস, আকাশ তখন সেখানে ছিলো না, নইলে তখনই শেষ হয়ে যেতো!  রুবিনা উপলব্ধি করলো এই রাতের অন্ধকারে তাদের কি সর্বনাশা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হলো। এখন কিভাবে তারা এই মাঝরাস্তায় বিপদ থেকে উদ্ধার পাবে! তবু সবাইকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, সব ঠিক হয়ে যাবে, আল্লাহকে ডাকো। তীব্র আওয়াজ পেয়ে ততক্ষণে আশেপাশের এলাকা থেকে লোকজন ছুটে এসেছে। বিপদ বুঝে লরিটা ততক্ষণে স্টার্ট দিয়ে পালিয়ে গেলো। ভাগ্যক্রমে একটা টহলদার পুলিশভ্যান সেদিক দিয়ে যাচ্ছিলো। সেটাও তাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলো। গ্রামের লোকেরা খুব সহানুভূতি ও তৎপরতার সঙ্গে সকলকে একে একে দুমড়ে যাওয়া গাড়ির ভিতর থেকে বের করে আনলো। তারা বেশ আশ্বস্ত হলো এটা উপলব্ধি করে যে গাড়ির সকলেই সম্পূর্ণ অক্ষত আছে। একে একে সবাইকে উদ্ধার করে পুলিশভ্যানে ওঠানো হলো। সবাই খুব তাড়াহুড়ো করছিলো, কারণ, হাইরোডে রাস্তার উপর এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে, যে কোন সময় ধেয়ে আসা গাড়ি তাদের আবার পিষে দিয়ে যেতে পারে!

 রুবিনার মা ছিলেন বাতের রুগী। তিনি হাঁটু ভাঁজ করতে পারতেন না। কিন্তু তীব্র ঝাঁকুনিতে তিনি হাঁটু ভাঁজ অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলেন। ফলে তাঁর পায়ে ভীষণ আঘাত লেগেছিলো। তিনি চলতেই পারছিলেন না। বড়োছেলে সাগরের বুকে গাড়ির সামনের অংশটা এগিয়ে এসে তীব্র আঘাত করেছিলো, ফলে বেশ কিছুদিন তার বুকের হাড়েও ব্যথার রেশ ছিলো। তোবড়ানো গাড়িটা ক্রেনে করে নিয়ে যাওয়া হলো। এত বড়ো অ্যাক্সিডেন্টের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে পরিবারের সকল সদস্যই অক্ষত রয়ে গেলো, এটা ভেবে উপস্থিত সকলে এবং পরবর্তীতে আত্মীয় স্বজনেরা খুব অবাক হয়েছিলো। একেই বোধহয় বলে, রাখে আল্লাহ, মারে কে! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা