গর্ব

17th August 2020 1:11 pm রাফিয়া সুলতানা
গর্ব


* গর্ব *
------ রাফিয়া সুলতানা 
02.02.19

ছোটবেলা থেকেই ডাকাবুকো ও পরম সাহসী স্বভাবের মেয়ে পৌলমী।স্কুল কলেজে বা পাড়াপড়শিতে, কারো প্রতি কোন অন্যায় ,জুলুম, অবিচার দেখলেই গর্জে উঠে প্রতিবাদ করে সে। পড়াশোনা,নাচ গান, এমনকি খেলাধুলাতেও সে বেশ পারদর্শী । ঠিক যেন একটা রত্ন! 
সামনেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। তাই, প্রায়দিনই অনেক রাত জেগে পড়াশোনা করতে হয় তাকে।শীতের রাত, অনেকটা বড়ো। তাই অনেকক্ষণ জেগে পড়লেও কষ্ট হয় না বিশেষ । তবে প্রত্যেকদিন সকাল সকাল উঠে, ফ্রেস হয়ে, কাঁটায় কাঁটায় ঠিক সাতটায়  নিজের আর বাবা মায়ের জন্য বেডটি বানিয়ে , তারপর তাঁদের ঘুম থেকে ডেকে তোলে পৌলমী । 

রেলস্টেশনের কাছেই তাদের বাড়িটা। তাই ট্রেনের বাঁশির আওয়াজে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো রেবতীর। দেওয়ালের উল্টো দিকে টাঙানো  ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই রেবতী দেখে প্রায় সাড়ে সাতটা বাজতে চলেছে । অথচ এখনো পৌলমীর কোন সাড়াশব্দ নেই ।
-----আজ কী হলো পৌলমীর ? এখনো চা নিয়ে এলো না? তবে কি অসুস্থ হলো নাকি মেয়েটা? পাশে ঘুমন্ত কর্তাকে উদ্দেশ্য করে এই কথাগুলো বলে, তাকে ঠেলা মেরে জাগিয়ে ধড়মড় করে লেপ ছেড়ে উঠে দরজা খুলে পৌলমীর  ঘরের দিকে প্রায় দৌড়েই গেলো রেবতী । গিয়ে দেখলো  ,তার ঘরের দরজাটা হাট করে খোলা। বাথরুমে, বারান্দায়,কি রান্নাঘরে কোথাও পৌলমীর কোন চিহ্নটুকু নেই! 
তার পড়ার টেবিলে নজর পড়তেই রেবতী দেখলো, একটা বই  চিৎ হয়ে খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। সে যে পড়া অসমাপ্ত  রেখেই কোথাও উঠে গেছে তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তৎক্ষনাৎ দোতলা থেকে তরতর করে নীচে নেমে এসে রেবতী দেখলো, সদর দরজাটাও হাট করে খোলা। আর পৌলমীর স্কুটিটাও নেই সিঁড়ির নীচে । রেবতী তো কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। ততক্ষণে রজতও  তার পিছু নিয়ে নীচে নেমে এসেছে। হাতে তার নিজের আর পৌলমীর মোবাইলটা। রেবতী সেটা দেখেই বলে উঠলো, যাঃ! পৌলমী মোবাইলটাও ফেলে গেছে  ? ফলে যা হবার তাই হলো । ফোন করে যে তার খবরাখবর নেওয়া যাবে, সে উপায়ও রইলো না । তাই দুজনেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ ।এইভাবে কেটে গেলো আরো আধঘন্টা। রজতের প্রেসার ততক্ষণে বাড়তে শুরু করেছে। দরদর করে ঘামছে রেবতীও। আর মনে মনে একাগ্রচিত্তে ঈশ্বরকে ডাকছে । ইতিমধ্যে, হঠাৎ রজতের মোবাইলটা বেজে উঠলো টুংটাং করে ।রেবতী ভাবলো, না জানি কি দুঃসংবাদ শুনতে হবে এবার ! রজত উত্তেজনায় কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইলটা ধরে হ্যালো বলতেই, ওপার থেকে ভেসে এলো পৌলমীর কণ্ঠস্বর ,

------বাবা আমি থানা থেকে বলছি। আমি এখন এখানেই আছি। একটা বিশেষ দরকারে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। তোমাদের জানানোর কোন অবকাশ ছিলো না।
 আমি এখনই বাড়ি যাচ্ছি। বাড়ি ফিরে গিয়ে সব বলবো তোমাদের । তোমরা একটুও চিন্তা কোরো না। 

রজত ও রেবতী পৌলমীর গলা পেয়ে আপাততঃ কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেও,  থানায় কেন গেছে সে , তা ভেবে কিছুই কুলকিনারা করে উঠতে পারলো না। আধঘন্টা পর স্কুটির আওয়াজ পেয়ে দুজনাই ছুটে বাইরে বেরিয়ে এলো। ধীরস্থির ভাবেই পৌলমী ঘরে ঢুকলো। কিন্তু তার বাবা-মায়ের যেন আর তর সইছিলো না। তবুও কিছুটা শান্তভাব দেখিয়ে, তাকে ধরে ধরে উপরে নিয়ে গিয়ে তার ঘরে এনে বসালো রেবতী । তারপর ধীরে ধীরে পৌলমী তাদের যা বললো  তা হলো এই ---

তখন ভোর  তিনটে। আমার পড়া প্রায় শেষ। এবারে উঠবো ভাবছিলাম। হঠাৎ কিছুর একটা গোঙানির আওয়াজ পেয়ে আমি ছুটে নীচে নেমে এসে বৈঠকখানার জানালা খুলে, বাইরের দিকে দেখি, কুয়াশার ঘন অন্ধকারে একটা কিশোরী মেয়েকে মুখ বাঁধা অবস্থায় দুজন লোক চ্যাংদোলা অবস্থায় জোর করে একটা সাদা গাড়িতে তোলার চেষ্টা করছে। মেয়েটাও গোঙাতে গোঙাতে প্রাণপণে হাত পা ছুঁড়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলো।কিন্তু দুটো লোকের সঙ্গে সে একা কিছুতেই পেরে উঠছিলো না। তারপর অবশেষে তারা তাকে গাড়িতে তুলে দ্রুত সেখান থেকে চম্পট দিলো। তাই দেখে আমার সারা শরীর ভয়ে হিম হয়ে গেলো! কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু বিবেক আমাকে ক্রমাগত খোঁচা দিচ্ছিলো এই বলে যে, নির্বাক দর্শক হয়ে না থেকে , এই জঘন্য ঘটনাটা ঠেকাতে আমার  অবিলম্বে কিছু একটা করা উচিত। তাই সেই অবস্থাতেই তড়িঘড়ি স্কুটিটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম থানার উদ্দেশ্যে। কিন্তু কিছুটা যেতেই একটা টহলদার পুলিশভ্যান চোখে পড়লো। তখন সেটাকে দাঁড় করিয়ে টহলরত পুলিশদের ব্যাপারটার সবটা  বললাম। তারা ব্যবস্থা নেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে, যেদিক দিয়ে সাদা গাড়িটা গিয়েছিলো, সেদিকেই রওনা দিলো। তবুও আমি যেন আশ্বস্ত হতে পারছিলাম না। তাই স্বয়ং থানায় গিয়েই কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারকে পুরো ঘটনাটা জানালাম। ততক্ষণে টহলদার পুলিশভ্যানটাও তাদের ধরে ফেলেছিলো।তারা ফোনে সব ট্রাফিক পুলিশদের সচেতন করে দেয়ায়, একজায়গায় সিগন্যালে তারা আটকা পড়ে। থানা থেকে অফিসার ওদের ফোন করে খোঁজ নিতে, সেটা জানা গেলো। তার বেশ কিছুক্ষণ পর পাকড়াও করা দুষ্কৃতী সহ, উদ্ধার করা মেয়েটাকে থানায় আনা হলো। লোকগুলোকে সঙ্গে সঙ্গে লকআপে ঢোকানো হলো। মেয়েটার তখন অচৈতন্য অবস্থা। কিছুক্ষণ পর তার জ্ঞান ফিরলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেলো, স্টেশনের কাছে এক ঝুপড়িতে সে মায়ের সঙ্গে ঘুমাচ্ছিলো। মা বিশেষ দরকারে একটু বাইরে বেরোতেই ,সেই সুযোগে দুজন লোক তাকে মুখে চাপা দিয়ে তুলে নিয়ে আসে।তার বাবা নেই। বহুদিন আগেই মারা গেছে। তাই মায়ের সঙ্গে একলাই থাকে সে,সেই ঝুপড়িতে । স্টেশনের হোটেল গুলোয়, মা বেটিতে বাসন মাজে। তাতেই যা দুপয়সা উপার্জন হয়, মা মেয়ের সংসার কোনরকমে চলে যায়। লোক দুটো বোধহয় বেশকিছুদিন যাবৎ ওদের উপরে নজর রেখে ছিলো। আজ সুযোগ বুঝে তাকে কিডন্যাপ করে  কোথাও পাচার করবার তালে ছিলো । আমি আজ তার গোঙ্গানির আওয়াজ  শুনতে না পেলে, বোধহয় সে চিরদিনের মত অন্ধকার জগতের অতলে হারিয়ে যেত ! 
নিয়ম রক্ষার্থে থানায় আমাকে কিছু কাগজপত্রে সইসাবুদ করতে হলো। তাই আমার এতো দেরি হলো ফিরতে । 

সব শুনে রেবতী মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো। রজত
আর রেবতী খুব খুশি  হলো তাদের মেয়ে একটা অভাগী মেয়েকে পাচারকারীদের হাত থেকে বাঁচানোর মত একটা ভালো কাজ করায় । পৌলমীর জন্য তাদের একটা অহমিকাবোধ আগে থাকতেই ছিলো। আজ আরো একবার তারা যেন উপলব্ধি করলো- সত্যি করেই পৌলমী তাদের  একটা গর্ব ! শুধু তাদেরইবা বলি কেন? দেশের গর্ব, দশের গর্ব ,জাতীর গর্ব ! এরকম মেয়েরই আজ আমাদের সমাজে বড়ো দরকার । 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা