সেই যে আমার নানারঙের দিনগুলি

17th August 2020 12:48 pm রাফিয়া সুলতানা
সেই যে আমার নানারঙের দিনগুলি


*সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি *
---- রাফিয়া সুলতানা 
18.07.19


ছেলেবেলার কথা মনে পড়তেই যেটা চোখে ভেসে ওঠে, সে হলো আমার নানারবাড়ির কথা। সেখানকার গাছপালা, নদীনালা, নদীর পাড়, রেললাইনের ধার, বলখেলার মাঠ, পুরনো নোনাধরা দালানবাড়ির খোলা বারান্দা, কাঁচা উঠান, আধভাঙা বাঁধানো দাওয়া, বাতাবী লেবু, গন্ধরাজ, রঙ্গন ফুল, কাঁঠাল চাঁপা, বাঁশঝাড়, পুকুর পাড়ের কাঠসীম গাছ, মালাফুলেভরা হিজল গাছ, আম, আতাতলা, লাল রক্তজবার শাখায় শাখায় কালো হলুদ প্রজাপতির মেলা, আরো কত কিযে, তা আর  বলে শেষ করা যাবে না!

 à¦¬à¦°à§à¦§à¦®à¦¾à¦¨à§‡à¦° মেমারীর কাছে, নিমোস্টেশনের পাশেই আমার নানার বাড়ি- কাঁঠাল গাছি গ্রাম। আমার বাড়ি বীরভুমের সিউড়ী শহর থেকে সেখানে দুবার বাস পাল্টে  পৌঁছাতে লাগতো পাক্কা পাঁচ ছ'ঘন্টা। অভুক্ত পেটে ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে আব্বার হাত ধরে ছিনুই সাঁকো বাসস্টপে যখন নামতাম, নদীর ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে সব ক্লান্তি, অবসন্নতা দূর হয়ে যেতো -- দূর থেকে লাল লাল ফুলে ঢাকা কৃষ্ণচুড়া গাছটা চোখে পড়তেই। ওটাই ছিলো নিশানা আমাদের গন্তব্যের।

 à¦šà§‡à¦¨à¦¾ চেনা জংলী ঘেঁটু, আকন্দ, ভ্যারেন্ডা, বাঘজঙ্গল ফুলের পাশ দিয়ে নদীর বাঁধ ধরে হাঁটতে হাঁটতে একরকম সুমিষ্ট প্রসন্নতা ও প্রফুল্লতায় ভরে উঠতো প্রাণমন। কখনো কখনো মাসতুতো ভাইবোনরা দূর থেকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে আসতো। কখনো নিঃশব্দে বাড়িতে ঢুকে সবাইকে চমকে দিতাম। ভাইবোন, খালা, নানী সবাই আনন্দে আটখানা হয়ে যেতো আমাদের দেখে। 

তখন গ্রামে ইলেকট্রিক ছিলো না। সন্ধ্যা হলেই হ্যারিকেনের আলোয় আড্ডা বসতো আমাদের, খোলা দাওয়ায়, খোলা আকাশের নীচে।আমরা বলতাম-- সভা। মাসতুতো দুই ভাই, দুইবোন আর আমার নিজের ছোটবোন, সব নিয়ে ছয় ভাইবোন ছিলাম আমরা।সেই সভায়, সে যা জানতো ,তাই করতো।  ছড়া, আবৃত্তি,গান ইত্যাদি। আমিই বেশি পার্টিসিপেট করতাম। আমার স্কুলের বাৎসরিক অনুষ্ঠানের মঞ্চস্থ নাটকের,বিভিন্ন কলাকুশলীদের করা অভিনয় ক্যারিক্যাচার করে দেখাতাম। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মা,খালা, নানীও এসে জুটতেন সেই তামাশা দেখতে।বড় উপভোগ করতেন তাঁরা। 

 à¦•খনো বা চাঁদের আলোয় ফুটবল খেলার মাঠে সবুজঘাসের গালিচায় বসে হাওয়া খেতাম, আর তারা গুণতাম আকাশের! আর চলতো ভাইবোন সবাই মিলে গল্প গুজব আড্ডা। 
রাতে বা দিনে কোন সময়ই পড়াশোনার কোন বালাই ছিলো না। ছিলো না এখনকার মত এত পড়ার চাপও। তাই সারা গ্রীষ্ম বা শীতের ছুটি গুলো হৈহুল্লোড় করেই কাটিয়ে দিতাম।

 à¦¸à¦•ালে উঠে কাজ ছিলো বোনদের সঙ্গে কোঁচড় ভরে ঘাসে বিছিয়ে থাকা শিউলি ফুল কুড়ানো। তারপর তাই দিয়ে মালা গাঁথা। কখনো বনে বাদারে ঘুরে হাজার রকম রংবেরং এর নাম না জানা বুনো ফুল সংগ্রহ করে আনতাম। কোনো কোনোদিন ঝোঁক উঠতো ছিপে করে মাছ ধরার। মাসতুতো ছোট ভাইয়ের উপর দায়িত্ব পড়তো ছিপ বানানোর।  দোকান থেকে বঁড়শি কিনে, ঝাড় থেকে কঞ্চি কেটে বানানো হতো ছিপ। তারপর মাটি খুঁড়ে সংগ্রহ করা হতো কেঁচো, মাছের চার হিসাবে।তাই নিয়ে দুই ভাইবোনে পুকুর পাড়ে কাটিয়ে দিতাম ঘন্টার পর ঘণ্টা। কখনো খালার কাছে বায়না করতাম কুঁড়োজালি বানিয়ে দেয়ার। ছেঁড়া কাপড় বা মশারী আর কঞ্চি দিয়ে বানিয়ে দিতেন সেটা। তারপর নদীর পাঁকে নেমে সেটা পেতে -- ধরতাম চিংড়ি, পুঁটি।ক্যাঁকড়াও পড়তো দুএকটা। 

 à¦¦à§à¦ªà§à¦°à§‡ সবাই মিলে দল বেঁধে নদীরজলে চলতো হুটোপাটি, খেলা ধুলা, কলার গাছ কেটে ,তাকে অবলম্বন করে সাঁতার শেখার চেষ্টা। ঘন্টা দুয়েক পর বড়দের বকুনি খেয়ে,নদীর জলে চোখ লাল করে তবেই উঠে আসতাম পাড়ে।

 à¦¬à¦¿à¦•েলে মাসতুতো বোনদের নিয়ে,নদীর বাঁধ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছাতাম রেল লাইনের ধারে। বর্ধমান হাওড়া মেন লাইন। নীচ দিয়ে বয়ে চলা নদী। আগে ছিলো গাঙ্গুর নদী। এখন সেটা ডিভিসি ক্যানেল। সেই ক্যানেলের পাশে বসে গল্প করতাম আর ট্রেন গেলে তার কামরা গুণতাম।কখনো বা মুদির দোকান থেকে চানাচুর, ছোলাভাজা কিনে তাই খেতে খেতে দিব্যি কেটে যেতো সময়! 

 à¦¶à§€à¦¤à§‡à¦° মরশুমে আলুতোলার সময় হলে, পড়ে যেত আলু পুড়িয়ে খাওয়ার ধুম! এছাড়াও ক্ষেত থেকে বেথো শাক, সরষে শাক,বন বাদার পুকুর থেকে বাঁশপাতা শাক, কাঁটানটে, জলকলমী শাক যা পেতাম তাই কোঁচড় ভরে তুলে এনে ,কখনো বা ডুমুর তুলে, নানীর কাছে আবদার করতাম তা রেঁধে দেবার জন্য।ছোটবেলায় শাকসবজি বিশেষ পছন্দের না থাকলেও, নিজের হাতে তোলা সেসবের স্বাদই ছিলো আলাদা! আতা, আঁকড়গাছে ঝুলে ঝুলে চলতো সে সব ফল সংগ্রহ। আমের সময় কত যে আম সাবাড় করতাম তার আর হিসাব ছিলো না! কখনো লম্বা লগা নিয়ে নদী পেরিয়ে,ওপারে যেতাম জাম পাড়তে। পুকুরপাড়ে হেলে পড়া ডালে চড়ে লিচুই যে কত পেড়েছি!খেজুর তলায় খুঁজে খুঁজে কুড়িয়েছি খেজুর। কুলের সময় ঢিল মেরে কুল পাড়ার সে কি আনন্দ! কাঁচা কাঁচা পেয়ারা, ডেলো, ফলসা ফল আরো কতকি যে হাবিজাবি উদরস্যাৎ করা হতো তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! 

যখন ধান ওঠার সময় হতো, আমরা সবাই মিলে গরুরগাড়ি চেপে রওনা হতাম দূর দূরান্তের কোন মাঠে।সেবার লক্ষীর ভাঁড় ভেঙে জমানো পয়সা এনেছিলাম সঙ্গে। আগেকার ভারি ভারি তামার পয়সা।তাই দিয়ে চানাচুর কিনে খেতে খেতে যাওয়া। সে মজাই আলাদা। সেইসময় আঙিনার ঘাস চেঁছে ফেলে গোবর দিয়ে নিকানো হতো সারা চত্বর। তারপর শুরু হতো ধান পিটানো অর্থাৎ ঝাড়ার কাজ। আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকতো মস্ত মস্ত ধানের পালুই। আর তারই ফাঁকে ফাঁকে জমে উঠতো আমাদের লুকোচুরি খেলা। কখনো কখনো মইয়ে করে ছাদে উঠে, সেখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়লাম খড়ের গাদায়।খড়ের ধারালো কিনারায় ছড়ে যেত হাত পা। পানি লেগে যখন জ্বালা করতো, তখনই খালি টের পেতাম। তবুও গ্রাহ্য ছিলো না। গ্রীষ্মের দাবদাহ, শীতের কনকনানি,বর্ষায় কাদার প্যাঁচপ্যাঁচানি কিছুতেই যেন ছিলো না কোন ভ্রূক্ষেপ! 

গ্রীষ্মের বিকেল বেলায় মাঝে মাঝে আকাশ কালো করে মেঘ জমতো। শুরু হতো কালবৈশাখীর ঝড়। ছুটতাম নদীর ধারে সেই প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে। কালো মেঘের বুকে সার দিয়ে উড়ে যেতো সাদা বক। কী অপরূপ দৃশ্য! ভাইবোনরা কেউ কেউ বলে উঠতো, চলো আম বাগানে,খুব আম পড়বে। সঙ্গে সঙ্গে পড়িমরি করে ছুট লাগাতাম সেখানে। চারিদিকে ঢুপঢাপ করে আম পড়তো কত। কিযে মজার ছিলো সেই দিনগুলো,যে কি বলবো ! আম কুড়ানোর নেশায় একবার তো মাড়িয়েই ফেললাম গ্রাম বাসীর বর্জ্যপদার্থ! সেখানে কেউ কেউ প্রাতঃকৃত্য সারতো কিনা! তারপর কাঁদো কাঁদো অবস্থায় মায়ের শরণাপন্ন হলে, তিনি আবার সাফ সুতরো করে দিলেন। 

রাতের বেলায় নানীর কাছে চলতো সাতভাই চম্পা আর রাম-সীতার গল্পশোনার পালা! কখনো কখনো ঠাকুমার ঝুলি থেকে পড়া  রূপকথার রাক্ষস আর রাজারাণীর গল্প শুনিয়ে জয় করে নিতাম সবার মন।

 à¦­à§‹à¦°à§‡à¦° বেলায় খালার হাতে কখনো কাঁচা ছোলা দিয়ে চিরতা ভিজানো পানি, কখনো খেজুরের রস খাওয়া, খুব মনে পড়ে। নানার সঙ্গে ক্যারাম খেলা,হারমোনিয়াম বাজিয়ে, সারেগামা, ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা গান শেখা সেও মনে পড়ে বেশ । তবে নানার অঙ্ক পরীক্ষা আর ইংরেজি ডিকটেশন নেয়া,ছিলো আমার কাছে খুব আতঙ্কের বিষয় !কেননা তাই দিয়ে আমার সমবয়সী মাসতুতো দাদার সঙ্গে আমার তুলনা করা হতো।আর তার কাছে বারবার হেরে যেতাম আমি। কারণ সে ক্লাস ওয়ানের ছাত্র হয়েও ক্লাস থ্রির অঙ্ক করতে পারতো। আর "আলিবাবা এন্ড ফরটি থিভসের" ইংরেজি গল্প অনায়াসে লিখে ফেলতে পারতো সঠিক বানানে, ডিকটেশন শুনে শুনে। বলাইবাহুল্য নানার প্রশিক্ষণ থাকতো তার। আর আমার হতো ভুরি ভুরি ভুল! যোগবিয়োগ,গুণভাগ কোনটাই সঠিক হতো না। আর ইংরেজি বানান? নানা বলতেন ওয়ার্ড গুলোতে দেখছি, এ ই আই ও ইউ কোনটাই বসাতে আর বাদ রাখিসনি! এই ছিলো অবস্থা! সেই হিউমিলিয়েশন আমার যেন সহ্য হতো না ! তাই ,বিপদের আঁচ পেলেই আমি পানির বদনা নিয়ে  কেটে পড়তাম টয়লেট যাওয়ার অযুহাতে ! এই ব্যাপারটা ছাড়া নানার বাড়িতে আমার বেশ জনপ্রিয়তাই ছিলো! 

ছেলেবেলার, নানার বাড়ির সেইসব দিন --জুড়ে আছে আমার জীবনের একটা বড়ো ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।বারেবারে ভেসে ওঠে স্মৃতির পর্দায় তা ! বড্ড মনে পড়ে, হারিয়ে যাওয়া,সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলির কথা ! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 à¦—ীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 à¦à¦‡ বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ!