অস্ফুট ভালোবাসা

17th August 2020 12:17 pm রাফিয়া সুলতানা
অস্ফুট ভালোবাসা


* অস্ফুট ভালোবাসা *
---- রাফিয়া সুলতানা 
14.08.19

তৃপ্তি আর তরুণ, দুইজনেই প্রাইমারীতে পড়ে। তাদের মধ্যে খুব ভাব! ভীষণ বন্ধুত্ব দুজনের! সমবয়সী কিনা! তরুণরা ভাড়া থাকে তৃপ্তিদের বাড়িতে। তরুণের বাবা হকার। মা গোটা কতক টিউশনি পড়ায়। মোটামুটি চলে যায় কোনরকমে তাদের এই তিনজনের ছোট্ট সংসার। 
তৃপ্তি ভাইবোনদের মধ্যে সবার ছোট। তিন দাদার পর তার আগমন। তাই বলাই বাহুল্য ,সবার খুব আদরের সে । তরুণও খুব ভালো বাসে তৃপ্তিকে। বলতে গেলে একটু বেশিই ভালোবাসে । স্কুল থেকে রোজ তার জন্য চুরি করে চক আনে। আর হাতে দুটো পয়সা পেলেই টকঝাল লজেন্স কিনে এনে হাতে দেয় তার। তৃপ্তি খুব খুশি হয়ে, চোখ তুলে মিষ্টি হেসে বলে থ্যান্কিউ। আর তার মুখ থেকে সেটাই শুনতে চায় তরুণ। 

ক্রমে দুজনে বড় হয়ে ওঠে। তরুণদের বাড়িতে তৃপ্তির অবাধ বিচরণ। তরুণের মার একটাই ছেলে। তাই তৃপ্তিও কবে যেন তাদের সন্তানতুল্য হয়ে গেছে। আজ তরুণের বাড়িতে সরস্বতী পুজো। তাই তৃপ্তির ডাক পড়েছে, ফলমুল কেটে তরুণের মাকে সাহায্য করার জন্য। তৃপ্তিও হাজির যথাসময়ে। এরকম ডাক পেয়ে সে খুব উৎসাহিত। নিজের বাড়িতে কাজকর্মের সচরাচর বড় একটা সুযোগ মেলে না কিনা । বৌদিরাই করে সব। তাই ফলের ঝুড়িটা টেনে নিয়ে খুশিমনে বঁটি নিয়ে কাটতে বসলো সে। তরুণ পাশে বসে  অপলক দৃষ্টিতে  দেখছিলো তাকে। তৃপ্তিকে সারাদিন দুচোখ ভরে দেখেও যেন আশ মেটে না তার। তাই খুব মনোযোগ সহকারে দেখছিলো আজকেও। দেখছিলো তার কার্যকলাপ। খুব চঞ্চল আর উচ্ছল প্রকৃতির মেয়ে তৃপ্তি। খুব বকবক করে। আর কথায় কথায় হেসে গড়িয়ে যায়। তাই মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে তরুণ তার দিকে। অথচ তৃপ্তি যেন কিছুই বোঝে না। সে শুধু নিজের তালেই থাকে। 
কখন যেন, অন্যমনষ্ক হয়ে হঠাৎ ঘচ করে হাত কেটে ফেলে তৃপ্তি। গলগল করে রক্ত ঝরতে থাকে আঙুল বেয়ে। তরুণ আঁৎকে উঠে লাফ দিয়ে এগিয়ে আসে কাছে। 
---যাঃ! এটা কি করলি তুই? কাটলি তো হাতটা? সবকাজে এত ছটফট করিস কেন?
যেন মৃদু ধমকের সুর। 
তার পরেই নিজের দুহাতে চেপে ধরে তার আঙুলটা ।কিন্তু রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। কনকন করে ওঠে তরুণের বুকটা।দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে, কি করবে কিছুই যেন বুঝতে পারে না সে । পরক্ষণেই নিজের মুখে ঢুকিয়ে নেয় তৃপ্তির কাটা আঙুলটা। জিভ দিয়ে চেপে ধরে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করে প্রাণপণে ।  
যাক,কিছুক্ষণ পর রক্ত পড়া বন্ধ হলে, মায়ের শাড়ি ছেঁড়া দিয়ে খুব যত্ন করে ব্যান্ডেজ করে দেয় আঙুলটা । তৃপ্তি কৌতুক ভ'রে এতক্ষণ ধরে তার ক্রিয়াকলাপ দেখছিলো! খুব মজা লাগছিলো তার! হাতটা যেন তরুণেরই কেটেছিলো। মনে মনে হাসে আর ভাবে- বড্ড ছেলেমানুষ ছেলেটা! 

এইভাবে হেসেখেলে তাদের দিন চলে যায়। এরমধ্যে তৃপ্তি কলেজে ভর্তি হয়েছে। তরুণও কলকাতায় ভর্তি হয়েছে, ভালো একটা কলেজে। বরাবরই খুব ভালো স্টুডেন্ট সে। স্কলারশিপ নিয়ে, হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। ছুটিতে ছুটিতে আসে, তৃপ্তির জন্য নানারকম গিফ্ট নিয়ে। নেলপলিস, পারফিউম। সেইদিনের ছোট্ট পারফিউমের শিশিটা পেয়ে খুব আনন্দ হয়েছিলো তৃপ্তির। যত্ন করে রেখেছিলো সে সেটা, অনেকদিন। 

তরুণ তাকে অনেকদিন অনেকবার কি যেন বলতে চায়। কিন্তু বলতে গিয়েও বলে না। 
শুধু বলে, ----তুই কি কিছু বুঝিস না? 
সত্যিই বোঝে না তৃপ্তি, তরুণ ঠিক কি বোঝাতে চায়। একদিন মেজবৌদিকে বলেই ফেললো তৃপ্তি। 
তরুণ শুধু বলে, -----তুই কিছু বুঝিস না। আচ্ছা বৌদি বলো তো-কি বুঝি না আমি? 
বৌদি হেসে বলে,- আসলে ও তোকে খুব ভালো বাসে। 
-----ধ্যুৎ কি যে বলো! ভালোবাসে! হেসেই উড়িয়ে দেয় তৃপ্তি। 

একদিন ছুটিতে বাড়ি এসে তরুণ বললো,---- সিনেমা হলে, শাহরুক খানের ছবি এসেছে, যাবি দেখতে?শাহরুক খানের নামে তৃপ্তি একেবারে লাফিয়ে উঠলো। 
পরের দিন ম্যাটিনি শো'তে দুজনে গেলো মুভি দেখতে। হাফ টাইমে দুজনে মিলে পটেটো চিপস আর বাদাম ভাজা খেলো। তৃপ্তি বাইনা ধরলো কোল্ডড্রিঙ্কস খাবে। ততক্ষণে শো আবার চালু হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও তরুণ ওর জন্য স্প্রাইট কিনে আনলো। দুজন তাতে মুখ লাগিয়ে খেলো। একসময় কি মনে করে তরুণ তৃপ্তির হাতদুটো নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিলো। তৃপ্তি একঝটকায় তার হাতটা সরিয়ে নিয়ে বললো,
--- অ্যাই! কি হলো আবার?
তরুণ শুধু করুণ সুরে বললো, --- তুই কিছু বুঝিস না! 

তরুণ হোস্টেল থেকে প্রতিমাসে তৃপ্তিকে একটা করে চিঠি পাঠাতো। কুশল বিনিময় ও সাধারণ কিছু কথাবার্তা ছাড়া তেমন কিছু থাকতো না সেই চিঠিতে।তাই তৃপ্তিও বিশেষ কিছু টের পায়নি। তবু খুব ভালো লাগতো তৃপ্তির সেই চিঠি। কারণ, খুব সাধারণ কথাকেও এমন সুন্দর ভাবে লিখতে পারতো তরুণ!

একদিন এয়ারফোর্সের একটা চাকরি পেয়ে রাজস্থানে চলে গেলো সে। ততদিনে তার বাবামাও তৃপ্তিদের বাড়ি ছেড়ে শহরের অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে।

 à¦¤à¦°à§à¦£ একটা চিঠিতে লিখলো, ----আমি এবার নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। এবার বাড়ি ফিরলে তোকে একটা সারপ্রাইজ দেবো। 

তৃপ্তি মনেমনে খুব হাসলো, আর ভাবলো, কি জানি কি সারপ্রাইজ  অপেক্ষা করছে তার জন্য। হয়তো আরো ভালো কোনো গিফ্ট পাবে সে। হাজার হোক, চাকুরে তো!
তরুণের চাকরি পাওয়ার সংবাদে তৃপ্তি খুব খুশি হয়েছিলো। সারাজীবন অভাবঅনটনে মানুষ হয়েছে ছেলেটা। এবারে খুব স্বাচ্ছল্য আসবে তাদের পরিবারে! 
কিন্তু ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি সে, ভারি একটা দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছিলো তার জন্য। কিছুদিনের মধ্যেই খবর পেলো, একটা পথদুর্ঘটনায় পড়ে মারা গেছে তরুণ! হঠাৎ যেন তার মাথায় বজ্রপাত হলো খবরটা শুনে! কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইলো না তৃপ্তির মন। ছুটে গেলো সে, তরুণের বাবা মা'র নতুন ঠিকানায়। গিয়ে দেখলো শোকস্তবধ সারা বাড়ি। তাকে দেখে তরুণের মা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললো। 
বললো, ----তোকে সে খুব ভালো বাসতো রে! কিন্তু তুই কোনদিনও বুঝিস নি।তাই খুব দুঃখ ছিলো তরুণের মনে। আমাকে প্রায় বলতো সে কথা। 
তৃপ্তির বুকে যেন শেল বিঁধলো সেই কথাটায়! সত্যি তাকে ভালোবাসতো তরুণ? ভালো তো সেও বাসতো। কিন্তু এ ভালোবাসা তো অন্য! কেন বোঝেনি সে এতদিন? তরুণ কেন মুখ ফুটে বললো না একবারও! সত্যিতো! সে তো শুধু বলতো, ---তুই কিছু বুঝিস না,তুই কিছু বুঝিস না। তৃপ্তিতো কোনদিন বোঝার চেষ্টাও করেনি! এতো বোকা ছিলো সে?
আসলে এতদিন, তৃপ্তির ঔদাসীন্য আর উচ্ছলতার উদ্যাম স্রোতে খড়কুটোর মত ভেসে গিয়েছিলো তরুণের অসহায় ভালোবাসা! 

প্রথামত তৃপ্তিরও খুব ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিলো একদিন। একটা পুত্রসন্তানও হয়েছিলো তার। শ্বশুর শাশুড়ি নিয়ে ভরাট সংসার। কিন্তু বিয়ের বাইশ বছর পর ,আজ যেন মনে হচ্ছে তৃপ্তির, তরুণের সেই নিষ্পাপ ভালোবাসার মত ভালোবাসা আজও তার পাওয়া হলো না! কি সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলো তরুণ তাকে? সে তো আর জানা হলো না! বড় মনে পড়ে তৃপ্তির আজ তরুণকে! আর মিস করে সে, তার সেই অস্ফুট ভালোবাসা! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 à¦—ীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 à¦à¦‡ বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ!