প্রবঞ্চক

4th August 2020 9:43 am রাফিয়া সুলতানা
প্রবঞ্চক


* প্রবঞ্চক *
--- রাফিয়া সুলতানা

পাড়ার সবচেয়ে ধনী পরিবার, মুকুন্দবাবুর বাড়িতে ঠিকেয় কাজ করতো, চৌদ্দ বছরের ময়না। মিষ্টি চেহারার মতই মিষ্টি ছিলো তার স্বভাব। গৃহকর্মের সব কাজেই ছিলো সে সিদ্ধহস্ত। প্রতিটি কাজেই যেন ছিলো তার সযত্ন হাতের পটুত্বের ছাপ। মুকুন্দবাবুর একমাত্র ছেলে আনন্দ তখন থার্ডইয়ার ডিগ্রীকোর্সের ছাত্র। দাদাবাবু বলতে ময়না যেন  অজ্ঞান!বোধহয় তা উঠতি বয়সের ধর্মের কারণেই। কর্তাবাবু ও গিন্নিমার মতই তার সেবা যত্নেরও এতটুকু ত্রুটি হতে দিতো না ময়না। দাদাবাবুর বইয়ের শেল্ফ গুছিয়ে রাখা, পরিপাটি করে- টিফিন সাজিয়ে দেওয়া, জামাকাপড় কেচে পরিস্কার ক'রে আইরন ক'রে ওয়েরড্রবে তুলে রাখা, ইত্যাদি যাবতীয় কাজকর্ম করতো খুবই দরদের সঙ্গে। দেখতে দেখতে কবে যেন সে ঐ বাড়িরই একজন সদস্যা হয়ে উঠেছিলো,সে নিজেও বোধহয় টের পায়নি! 

মুকুন্দবাবু একবার সস্ত্রীক গয়া গেলেন তীর্থ করতে,ময়নাকে সংসারের সব খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিয়ে। বেশ ভালোই চলছিলো সব। এরমধ্যে একদিন আবার আনন্দ হঠাৎ ভীষণ রকম ভাবে ভাইরাল ফিভারে আক্রান্ত হলো। । স্বভাবতঃই তাকে সামলানোর সব দায়িত্বই গিয়ে বর্তালো ময়নার একার ঘাড়ে। ডাক্তার ডাকা, ওষুধপথ্য খাওয়ানো সবকিছুই করতে হলো তাকে। ময়নার একনিষ্ঠ সেবাযত্ন আকৃষ্ট করে আনন্দের হৃদয়, ফলে আস্তে আস্তে তারা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। মাস খানেক পরে কর্তাগিন্নী যখন ফিরে এসে দেখেন, সবকিছু একদম ঠিকঠাক আছে তখন তাঁরা যারপরনাই আশ্বস্ত হলেন। কিন্তু লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রকৃতি যে তার খেলাটুকু কখন সেরে রেখেছে, সে কথার একবিন্দুও তখনও তাঁরা টেরই পাননি। 

মাসখানেক পর, একদিন যখন ময়নার বাড়ির লোক জানতে পারে,যে বাবুদের ছেলের কারণে তাদের মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা ,তখন তারা তা জানাতে আসে   গৃহকর্ত্রী রত্নাদেবীকে। তিনি তখন সব শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। তাদের যারপরনাই  অপমান করে দূর দূর বলে,  তাড়িয়ে দেন বাড়ি থেকে। ময়নার কাজটুকুও  খোয়া যায় যথারীতি। এবং শুধু তাই নয়, এই বলেও শাসানো হয় তাদের, ময়নাকে যেন এরপর থেকে এই এলাকার ত্রিসীমানায়  দেখা না যায়! ফলে, ময়নার তখন ঠাঁই হলো গিয়ে তাদের গ্রামের বাড়িতে, তার বিপত্নীক ও নিঃসন্তান - একমাত্র মামার কাছে। 

দশবছর পর মামার মৃত্যুতে সে আবার তার নয় বছরের মেয়ে টুকটুকিকে নিয়ে ফিরে আসে নিজের বাবার শহরে। সেখানে এসে সে একটি নার্সিংহোমে আয়ার কাজ নেয়। 

পাড়ার লোকেদের কানাঘুষোতে টুকটুকি যখন  জানতে  পারে, পাড়ার বাবুদের ছেলে,পাঁচ বছরের ফুটফুটে বাবন তারই ভাই,এবং তার বাবা আনন্দবাবু তারও বাবা, তখন তার কিশোরী মন কিছুতেই যেন বুঝে ওঠে না,   কেন সে তার বাবার স্নেহ-আদর থেকে বঞ্চিত? তাই সে, প্রতিদিন টেরিবাগানো স্যুটবুট পরিহিত  , প্রাইভেট গাড়িতে চড়ে অফিসগামী তার বাবার যাতায়তের পথে, পিতৃস্নেহ কাতর দৃষ্টিতে, তাকিয়ে থাকে রোজ একভাবে, রাস্তার ধারের লাইট পোষ্টটার আড়ালে!আর তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে, যখন বাবন আর তার মা রোজ গেটের বাইরে আসে তাকে সি-অফ করতে। 

একদিন  বিকেলে, যখন বাড়ির সামনের পাকা রাস্তায় বাবন তার লাল টুকটুকে ট্রাইসাইকেলটা নিয়ে চক্কর দিচ্ছিলো, অদূরেই লোভাতুর দৃষ্টিতে, সেই দিকেই তাকিয়ে ছিলো টুকটুকি। তারও খুব শখ হচ্ছিলো এমন একটা লাল সাইকেল নিয়ে চালাতে!আর মনে মনে ভাবছিলো, যদি তা পারতো, কি মজা হতো তাহলে! এদিকে, এই ভাবে চালাতে চালাতে  একসময় টাল সামলাতে না পেরে হঠাৎ হুড়মুড় করে বাবন যখন সাইকেল নিয়ে পড়ে গিয়েছিলো রাস্তার উপরে, টুকটুকি তখন দৌড়ে গিয়ে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার কাটাছড়া হাঁটুতে  তুলোয় ক'রে,যত্নসহকারে  লাগিয়ে দেয়   অ্যান্টিসেপটিক লোসন তার মা ময়নারই ফাস্টএডের বাক্স থেকে । তারপর তাকে পাঁজা কোলা ক'রে কোলে তুলে নিয়ে পৌঁছাতে আসে তার বাড়ির গেটের দিকে । এমন সময় চারচাকা ক'রে তাদের বাড়ির সামনে এসে হাজির হয় আনন্দ ও তার স্ত্রী গায়ত্রী। বোধহয় তারা একসঙ্গে মার্কেটিং এ গিয়েছিলো। তারা তো তাদের দুজনকে এভাবে একসাথে আসতে দেখে রাগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো ! গায়ত্রী বাবনকে টুকটুকির কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে  খেঁকিয়ে ওঠে এই বলে,
"কেন হাত দিয়েছো ওর গায়ে ?"
আর তারপর ক্রমাগত রাগে গজগজ করতে থাকে। আনন্দ তাদের দারোয়ানকে ডেকে, চিৎকার ক'রে বকতে থাকে 
 "কোথায় থাকো তোমরা? কেন মিশতে দাও বাবনকে এইসব ছোটলোকদের সঙ্গে? আর যদি কোনদিন দেখি, দূর করে দেবো সব্বাইকে ! যত্তসব ইতর ছোটলোকের দল !"
তার মায়ের মুখ টিপে ধরে অভিযোগের সুরে তৎক্ষনাৎ বলে ওঠে বাবন, 
"তোমরা বকছো কেন দিদিটাকে! কত্ত ভালো ও ! আমাকে ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছে। ডাকো ওকে! ও দিদি! ও দিদি !এসো এদিকে!  চলে যেও না! "
চোখ কটমট ক'রে, কড়াং ক'রে তাকে একটা ধমক দিয়ে চটপট অন্দরে প্রবেশ করে গায়ত্রী। 

এদিকে, তাদের এই রুঢ় ব্যবহারে হতভম্ব হয়ে যায় টুকটুকি। ততক্ষণে তার মা কাজ থেকে ফিরে এসেছিলো। সে অদূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলো  এতক্ষণ। আনন্দের কথাগুলো যেন তীক্ষ্ণ শেলের মত বিঁধলো গিয়ে তার বুকে! ওরা ফিরে গেলে, সে এবার কাছে গিয়ে টুকটুকিকে হাত ধরে টেনে বাড়ি নিয়ে যেতে বলতে থাকে,
"কেন যাস মা ওদের কাছে? যতসব ঠগ, প্রবঞ্চকের দল! " 
কাঁদো কাঁদো স্বরে অবুঝভাবে প্রশ্ন করে টুকটুকি, "কেন মা ওরা এমন করলো আমার সাথে ?  কি দোষ আমার ? " 
"আমরা যে গরিব মা! এটাই আমাদের দোষ!" ময়না আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে উত্তর দেয় তাকে। 

কি জানি কত প্রবঞ্চকরা এভাবে সমাজের বুকে দর্পভরে ,বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, আর এই সব ময়না ও টুকটুকি আজীবন বেঁচে থাকে তাদের প্রবঞ্চনার শিকার ও ছোটলোক হয়ে! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা