শর্ত পূরণ --- তারিফ আলম

7th July 2020 9:49 am তারিফ আলম
শর্ত পূরণ --- তারিফ আলম


পোষ্টম্যান এসে চাকরিতে যোগদানের চিঠিটা সাহিল এর হাতে ধরিয়ে দিতেই সাহিল খুশিতে ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল । তারপর মা কে আর বাব কে প্রনাম করে চিঠিটা একটা ব্যাগ এ নিয়ে ছুটে গিয়ে নিজের বাইক টা বের করলো ।
মা ডাক দিয়ে বললেন “ কোথায় যাচ্ছিস , একটু খেয়ে যা “।
মা আমি চাঁদনীর কাছে যাচ্ছি । তোমারা চিন্তা করো না আমার জন্য । আমার এখন আর খিদে নেই ।
ভর দুপুরে না খেয়েই চাঁদনীর বাড়ীতে যাওয়ার জন্য সাহিল বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল । আসলে চাঁদনী আর সাহিল দু জনেরে দেখা স্বপ্ন গুলো পুরন করার অস্ত্র তার হাতে চলে এসেছে । ভালো একটা সরকারি চাকরি সে পেয়ে গিয়েছে । এবার সে সব শর্ত পুরন করতে পারবে ।
বাইক টা একটু জোরেই চালাচ্ছিল সাহিল । চাঁদনীর সঙ্গে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা হয় আর পরিচয় হয় সাহিলের । তারপর থেকে ফেসবুক হয়াটসআপ এর মাধ্যমে বন্ধুত্ব ক্রমে ভালোবাসায় পরিনত হয়ে যায় । একে অপরকে এক মুহূর্ত ছেড়ে থাকতে পারত না । দুজনেই স্বপ্ন দেখতে থাকে বিয়ে করে সুখের সংসার গড়ার । নিজেদের বিয়ের পর হওয়া ছেলে মেয়েদের নামও দুজনে ঠিক করে নেয় । একদিন দুজনে হাতে হাত রেখে কসম খায় যে তারা তাদের সব সপ্ন গুলোকে পুরন করবে । সাহিল তার বাড়ীর সবাই কে চাঁদনী এর কথা বলে সবাই কে রাজী করিয়ে নেয় । সাহিলের বাবা মাও ছেলের ভালোবাসাকে গুরুত্ব দেন । কিন্তু যখন চাঁদনী তার বাড়ীতে জানালো সাহিল এর কথা তখন চাঁদনীর পরিবারের সকলে মিলে শর্ত দেন । সাহিল কে সরকারি চাকরি পেতে হবে বা বড় কোন বিজনেস করতে হবে । আর এই সময় এর মধ্যে যদি অন্য ভালো চাকরি করা ছেলে পেয়ে যায় তাহলে তারা চাঁদনী কে বিয়ে দিয়ে দেবেন ।
সাহিল অনুভব করল যে , এত দিন ধরে চাঁদনী এবং সে দুজনেই স্বপ্ন গুলো দেখে এসেছিল – কি তা পুরন করার দায়িত্ব যেন শুধুমাত্র সাহিলের উপরে এসে পড়েছে । কিন্তু তবুও সাহিল হাল ছাড়ল না । চেষ্টা করতে আরম্ভ করে দিল একটা চাকরির জন্য ।
কিন্তু এদিকে চাঁদনী কেমন যেন অবহেলা করতে লাগলো সাহিল কে । কেমন যেন এড়িয়ে যেতে লাগলো । ফোনে আর সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিতে লাগল । সাহিলের খুব কষ্ট হত কিন্তু সে কিছু বলতো না কারন সে চাঁদনী কে খুব ভালোবাসতো । শুধু চেষ্টা করতো একটা ভালো চাকরির । আর আজ সেই দিন এসেছে । সাহিল চাকরি পেয়ে চাঁদনীর সাথে অনেক যোগাযোগ করতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে । তাই নিজেই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে চাঁদনীর বাড়ীর উদ্দেশ্যে ।
কিছুক্ষনের মধ্যেই পৌঁছে গেল সাহিল চাঁদনীর বাড়ীর পাশাপাশি । সেখানে অনেক লোকজন এবং বিয়ের প্যান্ডেল । সাহিল বাইক দ্রুত রেখে একজন কে জিজ্ঞাসা করলো - কার বিয়ে হচ্ছে ?
লোকটি উত্তর দিল “চাঁদনীর”।
কথাটা শুনার সঙ্গে সঙ্গে সাহিলের মাথায় যেন বাজ পড়ল । চাকরিরই চিঠিটা হাতে নিয়ে ছুটে ভিড় ঠেলে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে দেখল – চাঁদনী বিয়ের সাজে বসে । আর তাকে মুসলিম ধর্ম মতে তিন কবুল করার প্রক্রিয়া চলছিল ।
চাঁদনী কবুল কবুল কবুল বলতেই সকলে আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে উঠলো । একজন সরকারি চাকরি করা ছেলের সাথে চাঁদনীর বিয়ে হয়ে গেল । সকলে আনদ করছিল । শুধু সাহিল এর কষ্টে চোখ দিয়ে জল পড়ছিল ।
ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সাহিল চাঁদনীর পাশে । চাঁদনী সাহিল কে দেখে অবাক হয়ে গেল । সাহিল তার হাতে থাকা চাকরির যোগদানের চিঠি টা চাঁদনীর হাতে তুলে দিল । চিঠি টা দেখে চাঁদনীরও চোখে জল চলে এল । সেও যে অসহায় বাবা মা আর তাদের পরিবারের সকলের ইচ্ছার কাছে ।
কান্না জড়ানো গলায় চাঁদনী বলল “ তুমি অনেক দেরি করে দিলে সাহিল শর্ত পুরনে “।
সাহিল তাকিয়ে ছিল শূন্য দৃষ্টিতে চাঁদনীর দিকে । তাদের দুজনের দেখা সব স্বপ্ন গুলো শর্তের বেড়াজালে কি ভাবে ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেল তা কেউ জানতে পারলো না ।
সাহিলের কষ্টে প্রান বেরিয়ে যেতে লাগলো । আর থাকতে পারলো না সেখানে দাঁড়িয়ে । হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে ছুটে পালিয়ে যেতে চাইল । আর সহ্য করতে পারছে না । ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এসে বাইক টা নিয়ে স্টার্ট দিল । দূরে বহু দূরে পালিয়ে যেতে চায় সে এই ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্ন গুলো থেকে । জোরে চালাচ্ছিল বাইক ...খুব জোরে । চোখের জলে সামনের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে । হটাত একটা বাস একদম সামনে । সজোরে ধাক্কা মারে সাহিলে এর বাইক কে । রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে সে । পুরো শরীর রক্তে ভরে যায় । একবার চোখ খোলার চেষ্টা করলো সাহিল । মনে হল চাঁদনী যেন ছুটে ছুটে আসছে বিয়ের সাজে – তাদের দেখা স্বপ্ন গুলো পুরন করার জন্য .........
কিন্তু ধীরে ধীরে গভীর অন্ধকার গ্রাস করে ফেলতে লাগলো সাহিল কে । এ অন্ধকার এর কোন শেষ নেই । তাদের দেখা স্বপ্ন গুলো গভীর অন্ধকারে কোথায় হারিয়ে গেল কেউ তা খোঁজ নেই নি ।

 

লেখক তারিফ আলম





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?