হত্যা --- তারিফ আলম

6th July 2020 9:18 pm তারিফ আলম
হত্যা --- তারিফ আলম


আজ রায়পুরের খেলার মাঠে মন্ত্রীর সভা । বহু মানুষের সমাগম হয়েছে । রজত পকেটে হাত দিয়ে দেখে নিল পিস্তল টা ঠিক ঠাক আছে কিনা । গতকাল রাতেই নেশায় মত্ত মদন গুণ্ডার অসাবধানতায় তার পকেট থেকে পিস্তল টা পড়ে গিয়েছিল মাটিতে । রজত কুড়িয়ে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিল । পিস্তলে সব গুলি ভরা ছিল । আজ ঠিকঠাক ভাবে কাজে লাগাতে হবে পিস্তলের গুলি গুলোকে ।
প্রচুর মানুষের সমাগম হয়েছে রায়পুরের এই মাঠে । সকলে কাছ থেকে একবার মন্ত্রীকে দেখতে চান , তাঁর বক্তব্য শুনতে চান । রজত ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো , কিন্তু সামনেই দু জন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে । রজত খুব সাবধানে পিঠের ব্যাগ টা নামিয়ে পকেট থেকে পিস্তল টা বের করে ব্যাগ এ রেখে ব্যাগ টা আবার কাঁধে নিয়ে নিল ।
এমন সময় পকেটে রাখা মোবাইল টা বেজে উঠলো । এখন ফোন ধরার সময় নেই । দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে তাকে মঞ্চের কাছাকাছি , দূর থেকে কাজ টা সফল হবে না ।
মন্ত্রীর গাড়ি চলে এসেছে । পুলিশ এর ঘেরাবন্দির মধ্যে দিয়ে মন্ত্রী মঞ্চে উঠে এলেন । ভিড় আরও ঠেলে আসছিল সামনের দিকে । রজত আর সামনের দিকে এগাতে পারছে না । এ দিকে পকেটে মোবাইল টা ক্রমাগত বেজে চলেছে । রজত কোন রকমে ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল । পকেট থেকে মোবাইল টা বের করে দেখল সুমির ফোন । ফোন টা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সুমি চাপা স্বরে বলল “ আমার বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেল , সামনের সোমবার বিয়ে “। রজত কথাটা শুনেই ফোন টা কেটে দিল । আর কিছু শোনার মতো মানসিক ক্ষমতা তখন আর তার ছিল না । সুমির সাথে দীর্ঘ সময় ধরে রজতের ভালোবাসার সম্পর্ক । তারা দুজনে বিয়ে করে সুখের ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে এসেছিল । কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো সুমির বাড়ীর লোকজন । তারা কিছুতেই রজতের মতো বেকার ছেলে কে বিয়ে দিতে চায় না । রজত এম এ , বি এড পাশ করেও চাকরির জন্য চেষ্টা করেও কোন চাকরি পায় নি । ছোট খাটো বিজনেস শুরু করার কথা বলেছিল রজত । কিন্তু তাতেও সুমির বাড়ীর লোকজনের মত নেই । বাধ্য হয়ে রজত বিভিন্ন কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিতে থাকে । সব জায়গায়তেই প্রায় এক্সপেরিয়ান্স সার্টিফিকেট চায় । কাজ না পেলে একপেরিয়ান্স সার্টিফিকেট কোথা থেকে পাবে সে । ফলে সেখানেও ব্যর্থ । এদিকে সরকার বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ প্রায় বন্ধ , একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হতে ৫ বছরেরও বেশি সময় লাগিয়ে দিচ্ছে , আর যে টুকু নিয়োগ হচ্ছে তার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হছে । ঘুষ দিয়ে চাকরি নেওয়ার মতো সামর্থ্য মধ্যবিত পরিবারের ছেলে রজতের নেই । আবার অনেক দপ্তরে অবসরপ্রাপ্তকর্মীদের নতুন করে নিয়োগ করা হচ্ছে , একটি পাবলিক লাইব্রেরীতে রজত ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে জানতে পারে যে , সেখানে কেবল অবসরকর্মীদের নিয়োগ করা হচ্ছে । রজতের শুনে খুব কষ্ট হয় । কোথাও কাজ না পেয়ে শেষে এই চরম সিধান্ত নিতে বাধ্য হল । সুমিকে ছাড়া সে বাঁচতে পারবে না , সুমির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অন্য ছেলের সাথে – এটা কতটা কষ্ট দায়ক কেবলমাত্র সেই অনুভব করতে পারবে যে এই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে ।
রজতের চোখের সামনে সুমির মুখ টা ভেসে উঠলো । চোখে জল চলে এল । ডান হাত দিয়ে চোখের অশ্রু মুছে নিয়ে ব্যাগ থেকে গুলি ভরা পিস্তল টা বের করে হাতে নিল । মঞ্চের ডান দিক দিয়ে এবার সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলো । অনেক কষ্টে মঞ্চের সামনে এল । কিন্তু এদিকে মন্ত্রীর ভাষণ শেষ হয়ে গিয়েছে । তিনি মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন । অগ্যতা রজত পিস্তল টা নিজের পকেটের মধ্যে রেখে ভিড় ঠেলে সভাস্থল থেকে বাইরে বেরিয়ে এল ।
খোঁজ নিয়ে জানল – মন্ত্রী চন্দনপুরে প্রশাসনিক বৈঠক সেরে সেখানেই গেস্ট হাউসে রাতে থাকবেন । রজত আর দেরি না করে পিঠের ব্যাগে পিস্তল টা ঢুকিয়ে নিয়ে বাসস্ট্যান্ড এর উদ্দেশ্যে রওনা দিল । চন্দনপুর যাওয়ার বাসে উঠে একটা সিটে বসে পকেট থেকে মোবাইল টা বের করলো । হোয়াটসআপ টা অন করে সুমি কে মেসেজ লিখল – “ জানো সুমি তোমার জন্য চারটে নাইটি কিনে লুকিয়ে রেখেছি আমার রুমের আলামারির মধ্যে । তুমি বলেছিলে আমাদের বিয়ে হলে বিয়ের রাতে তুমি নাইটি পরে ঘুমাবে । তোমার দেওয়া পেন টা এখনও আমার পকেটে আছে , কালি অবশ্য অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে , কিন্তু তবুও এটা সব সময় নিজের কাছে রাখি । আমাদের স্বপ্ন ছিল আমাদের যখন ছেলে মেয়ে হবে তখন তাদের নিয়ে হাত ধরে দুজনে মেলা দেখতে যাওয়ার – আরও কত রকম ছোট খাটো স্বপ্ন - তুমি তো সব জানো । সে স্বপ্ন গুলো আর পূরণ করা গেল না । আমার কাছে আর বেশি টাইম নেই । শুধু একটা কথা বলছি - তুমি বিয়ের পর তোমার স্বামীর সাথে সুখে ঘর – সংসার করো – একদম পাকা গৃহিণীর মতো । আর আমাকে কোন দিনও মনে করো না – ভুলে যেও । এটাই আমার শেষ মেসেজ । আর কোন দিন তোমার সাথে আমার দেখা হবে না এ জন্মে । তুমি ভালো থেকো “।
মেসেজ টা লিখতে লিখতে রজতের চোখ দিয়ে অশ্রু তার গাল বেয়ে নীচে গড়িয়ে পড়ছিল । পাশে বসে থাকা একজন বয়স্কলোক রজতে কে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন – “ কিছু হয়েছে বাবা, কাঁদছ কেন”?
রজত দ্রুত চোখে হাত দিয়ে ঘসতে ঘসতে বলল , “কিছু বালি চোখে পড়ে গিয়েছে হয়তো “। এই ভাবে নিজেকে সামলে নিল সে । বয়স্ক লোকটি আর কিছু বললেন না ।
চন্দনপুর আসতেই রজত বাস থেকে নেমে গেস্ট হাউসের খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো গেস্ট হাউস শহরের পূর্ব দিকে নদীর গায়ে আছে । রজত নদীর পাড় ধরে চলতে লাগলো । এখন রাত সবে ৯ টা বাজে । এখনও মন্ত্রী গেস্ট হাউসে প্রবেশ করেন নি । দূর থেকে দাঁড়িয়ে রজত দেখল বন্দুক হাতে পুলিশরা ঘোরাফেরা করছে । রজত অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে পা টিপে টিপে নদীর পাড় ধরে গেস্ট হাউসের পাঁচিলের সামনে এসে দাঁড়ালো । পিছন দিক বলে পাহারা বেশি নেই । খুব সাবধানে পাঁচিল টপকাল রজত । এই পিছনটাতে ফুলের বাগান । সামনেই খুব সুন্দর গেস্ট হাউস । রজত ব্যাগ থেকে পিস্তল টা বের করে হাতে নিয়ে বাগানের মধ্যে লুকিয়ে থাকলো । কিছুক্ষন পর মন্ত্রীর গাড়ি এসে দাঁড়ালো গেস্ট হাউসের সামনে । মন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে গেস্ট হাউসের দু তলার একটা রুমে গিয়ে প্রবেশ করলেন । জানালা বাগানের দিকে ছিল । সেখানে একটা বেলকনিও ছিল । রাত ১ টার দিকে রজত ধীর পায়ে চুপি চুপি গেস্ট হাউসের সামনে গিয়ে দেখল পুলিশ গুলো নিজেদের মধ্যে গল্পে মসগুল । রজত পিছন দিকে থাকা একটা পাইপ ধরে খুব সাবধানে দোতলায় উঠে এল । জানালা দিয়ে দেখল – মন্ত্রী এখনও ঘুমাননি । কিছু লিখছিলেন । রুমের দরজা টা হাল্কা করে ভেজানো ছিল ।
রজত রুমের দরজা টা খুলে হাতে বন্দুক নিয়ে দ্রুত ঢুকে পড়ে মন্ত্রীর রুমে । মন্ত্রী রজতকে বন্দুক হাতে ঢুকতে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে জিজ্ঞাসা করেন – “কে তুমি “?


রজত শান্ত স্বরে বলে –“ আমি আপনার রাজ্যের একজন উচ্চ শিক্ষিত বেকার ছেলে “।
মন্ত্রীঃ ‘কি চাও তুমি”?
রজতঃ “কাজ চাই” ।
মন্ত্রীঃ “ বিভিন্ন চাকরির জন্য যে পরীক্ষা গুলো নেওয়া হচ্ছে তা দাও নি কেন “?
রজতঃ “ চাকরির পরীক্ষা আর কত দেব? এক – একটা বিভাগে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হতে ৫ বছর লেগে যাচ্ছে , আমাদের যৌবনের মুল্যবান সময় টা তো শেষ হয়ে গেল । আর বেশির ভাগ চাকরি নেতারা লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে বড় লোকদের ছেলেদের পাইয়ে দিচ্ছে । আবার অনেক ক্ষেত্রে এক্সপেরিয়ান্স সার্টিফিকেট চাইছে । কাজ না পেলে এক্সপেরিয়ান্স সার্টিফিকেট কোথায় পাবো বলুন । তাছাড়া অনেক জায়গায় অবসরপ্রাপ্তকর্মীদের পুরনায় নিয়োগ করা হচ্ছে – কি করে আমরা সাধারন বাড়ীর ছেলে – মেয়েরা চাকরি পাবো বলুন “?

মন্ত্রীঃ ‘ কোন ব্যাবসা করো নি কেন ? সরকার থেকে তো ঋণ দেওয়া হয় “।

রজতঃ “ ঋণ নেওয়ার সনয় জব করা কাউকে গেরেন্টার রাখতে হয় । কেউ এই দায়িত্ব নেবে কেন বলুন “। তাছাড়া তেলে ভাজা বা চা বিক্রি করলে বা টোটো চালালে আমাকে বিয়ে দেবে না সুমির বাড়ীতে ।

মন্ত্রীঃ সুমি কে ? তাছাড়া তোমার চোখে জল , তুমি কাঁদছ কেন ?

রজতঃ ( বান হাত দিয়ে চোখের জল মুছে নিয়ে ) আমি সুমিকে ভালোবাসি । তার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অন্য ছেলের সাথে । আমি বেকার বলে তার বাড়ীর লোকেরা আমাকে বিয়ে দেবে না ।
আমরা শিক্ষিত বেকার যুব সমাজ আপনাদের ভোট দিয়ে আজ সাধারন মানুষ থেকে মন্ত্রী বানিয়েছি । আপনারা সকলের জন্য ভাললেও আমাদের মতো উচ্চ শিক্ষিত বেকার ছেলে – মেয়েদের কথা ভাবেন না কেন ?
একজন কৃষক আত্মহত্যা করলে দেশের আইন সভা পর্যন্ত নড়ে যায় । লক্ষ লক্ষ কৃষকের কোটি কোটি টাকা লোণ মাফ হয়ে যায় । কিন্তু একজন বেকার আত্মহত্যা করলে সেটাকে ব্যর্থ প্রেমে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয় । কিন্তু এর গভীরে প্রবেশ করে দেখা হয় না । প্রায় প্রতিটা ব্যর্থ প্রেম এর জন্য দায়ী এই “বেকারত্ব”। চাকরি পেলে তার মনের মানুষকে হারাতে হত না । এই কষ্ট সেই শুধুমাত্র বুঝবে যে সত্যিকারের কাউকে ভালোবেসেছে ।

মন্ত্রিঃ তুমি হাতের বন্দুক ফেলে দাও । তোমাকে একটা চাকরি দেব ।

রজত হাতের বন্ধুক উঁচিয়ে ধরে বলল “ আমার একার জীবনের কাহিনী এটা নয় । এটা আমার মতো সকল বেকারদের কাহিনী । তারা কোন না কোন ভাবে বেকারত্বের জ্বালায় জ্বলে পুড়ে মরছে রোজ রোজ । কিন্তু মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতে পারছে না । আমার মতোই তাদের সবার জীবনের সব স্বপ্ন গুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে “।

মন্ত্রীঃ মাথা ঠাণ্ডা করো । বন্দুক ফেলে দাও ।
রজতের ততক্ষণে বন্দুকের টিগারে জোর করে চেয়ে দিয়েছে ।

গুগুগু ড়ু ড়ু ড়ু ম ম ম ম ্‌্‌্‌্‌্‌্‌,

খুব জোরে একটা আওয়াজ । নীচে থাকা নিরাপত্তা রক্ষীগণ ছুটে গেল বন্দুক উঁচিয়ে । মন্ত্রীর রুমে প্রবেশ করে দেখল মেঝেতে একটা অচেনা ছেলের রক্তাক্ত দেহ পড়ে রয়েছে । কানের কাছে গুলি মেরেছে । রক্ত চুইয়ে পড়ছে কানের কাছে থেকে । ছেলেটার চোখ দুটো চেয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মন্ত্রীর দিকে । চোখ দিয়ে যেন দু ফোটা অশ্রু বেরিয়ে মাটিতে চুইয়ে পড়ল গাল বেয়ে ।

হ্যাঁ – একটা বেকার ছেলে আবার আত্মহত্যা করলো । সবাই তাই বলবে । কিন্তু কারন এর গভীরে কেউ প্রবেশ করলে সে বুঝতে পারবে এটা আসলে “হত্যা”। “বেকারত্ব” হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার ছেলে - মেয়েদের স্বপ্নের এভাবেই হত্যা করে চলেছে প্রতিনিয়ত – প্রতি ঘণ্টা ।

 





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?