আজ রায়পুরের খেলার মাঠে মন্ত্রীর সভা । বহু মানুষের সমাগম হয়েছে । রজত পকেটে হাত দিয়ে দেখে নিল পিস্তল টা ঠিক ঠাক আছে কিনা । গতকাল রাতেই নেশায় মত্ত মদন গুণ্ডার অসাবধানতায় তার পকেট থেকে পিস্তল টা পড়ে গিয়েছিল মাটিতে । রজত কুড়িয়ে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিল । পিস্তলে সব গুলি ভরা ছিল । আজ ঠিকঠাক ভাবে কাজে লাগাতে হবে পিস্তলের গুলি গুলোকে ।
প্রচুর মানুষের সমাগম হয়েছে রায়পুরের এই মাঠে । সকলে কাছ থেকে একবার মন্ত্রীকে দেখতে চান , তাঁর বক্তব্য শুনতে চান । রজত ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো , কিন্তু সামনেই দু জন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে । রজত খুব সাবধানে পিঠের ব্যাগ টা নামিয়ে পকেট থেকে পিস্তল টা বের করে ব্যাগ এ রেখে ব্যাগ টা আবার কাঁধে নিয়ে নিল ।
এমন সময় পকেটে রাখা মোবাইল টা বেজে উঠলো । এখন ফোন ধরার সময় নেই । দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে তাকে মঞ্চের কাছাকাছি , দূর থেকে কাজ টা সফল হবে না ।
মন্ত্রীর গাড়ি চলে এসেছে । পুলিশ এর ঘেরাবন্দির মধ্যে দিয়ে মন্ত্রী মঞ্চে উঠে এলেন । ভিড় আরও ঠেলে আসছিল সামনের দিকে । রজত আর সামনের দিকে এগাতে পারছে না । এ দিকে পকেটে মোবাইল টা ক্রমাগত বেজে চলেছে । রজত কোন রকমে ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল । পকেট থেকে মোবাইল টা বের করে দেখল সুমির ফোন । ফোন টা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সুমি চাপা স্বরে বলল “ আমার বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেল , সামনের সোমবার বিয়ে “। রজত কথাটা শুনেই ফোন টা কেটে দিল । আর কিছু শোনার মতো মানসিক ক্ষমতা তখন আর তার ছিল না । সুমির সাথে দীর্ঘ সময় ধরে রজতের ভালোবাসার সম্পর্ক । তারা দুজনে বিয়ে করে সুখের ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে এসেছিল । কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো সুমির বাড়ীর লোকজন । তারা কিছুতেই রজতের মতো বেকার ছেলে কে বিয়ে দিতে চায় না । রজত এম এ , বি এড পাশ করেও চাকরির জন্য চেষ্টা করেও কোন চাকরি পায় নি । ছোট খাটো বিজনেস শুরু করার কথা বলেছিল রজত । কিন্তু তাতেও সুমির বাড়ীর লোকজনের মত নেই । বাধ্য হয়ে রজত বিভিন্ন কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিতে থাকে । সব জায়গায়তেই প্রায় এক্সপেরিয়ান্স সার্টিফিকেট চায় । কাজ না পেলে একপেরিয়ান্স সার্টিফিকেট কোথা থেকে পাবে সে । ফলে সেখানেও ব্যর্থ । এদিকে সরকার বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ প্রায় বন্ধ , একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হতে ৫ বছরেরও বেশি সময় লাগিয়ে দিচ্ছে , আর যে টুকু নিয়োগ হচ্ছে তার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হছে । ঘুষ দিয়ে চাকরি নেওয়ার মতো সামর্থ্য মধ্যবিত পরিবারের ছেলে রজতের নেই । আবার অনেক দপ্তরে অবসরপ্রাপ্তকর্মীদের নতুন করে নিয়োগ করা হচ্ছে , একটি পাবলিক লাইব্রেরীতে রজত ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে জানতে পারে যে , সেখানে কেবল অবসরকর্মীদের নিয়োগ করা হচ্ছে । রজতের শুনে খুব কষ্ট হয় । কোথাও কাজ না পেয়ে শেষে এই চরম সিধান্ত নিতে বাধ্য হল । সুমিকে ছাড়া সে বাঁচতে পারবে না , সুমির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অন্য ছেলের সাথে – এটা কতটা কষ্ট দায়ক কেবলমাত্র সেই অনুভব করতে পারবে যে এই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে ।
রজতের চোখের সামনে সুমির মুখ টা ভেসে উঠলো । চোখে জল চলে এল । ডান হাত দিয়ে চোখের অশ্রু মুছে নিয়ে ব্যাগ থেকে গুলি ভরা পিস্তল টা বের করে হাতে নিল । মঞ্চের ডান দিক দিয়ে এবার সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলো । অনেক কষ্টে মঞ্চের সামনে এল । কিন্তু এদিকে মন্ত্রীর ভাষণ শেষ হয়ে গিয়েছে । তিনি মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন । অগ্যতা রজত পিস্তল টা নিজের পকেটের মধ্যে রেখে ভিড় ঠেলে সভাস্থল থেকে বাইরে বেরিয়ে এল ।
খোঁজ নিয়ে জানল – মন্ত্রী চন্দনপুরে প্রশাসনিক বৈঠক সেরে সেখানেই গেস্ট হাউসে রাতে থাকবেন । রজত আর দেরি না করে পিঠের ব্যাগে পিস্তল টা ঢুকিয়ে নিয়ে বাসস্ট্যান্ড এর উদ্দেশ্যে রওনা দিল । চন্দনপুর যাওয়ার বাসে উঠে একটা সিটে বসে পকেট থেকে মোবাইল টা বের করলো । হোয়াটসআপ টা অন করে সুমি কে মেসেজ লিখল – “ জানো সুমি তোমার জন্য চারটে নাইটি কিনে লুকিয়ে রেখেছি আমার রুমের আলামারির মধ্যে । তুমি বলেছিলে আমাদের বিয়ে হলে বিয়ের রাতে তুমি নাইটি পরে ঘুমাবে । তোমার দেওয়া পেন টা এখনও আমার পকেটে আছে , কালি অবশ্য অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে , কিন্তু তবুও এটা সব সময় নিজের কাছে রাখি । আমাদের স্বপ্ন ছিল আমাদের যখন ছেলে মেয়ে হবে তখন তাদের নিয়ে হাত ধরে দুজনে মেলা দেখতে যাওয়ার – আরও কত রকম ছোট খাটো স্বপ্ন - তুমি তো সব জানো । সে স্বপ্ন গুলো আর পূরণ করা গেল না । আমার কাছে আর বেশি টাইম নেই । শুধু একটা কথা বলছি - তুমি বিয়ের পর তোমার স্বামীর সাথে সুখে ঘর – সংসার করো – একদম পাকা গৃহিণীর মতো । আর আমাকে কোন দিনও মনে করো না – ভুলে যেও । এটাই আমার শেষ মেসেজ । আর কোন দিন তোমার সাথে আমার দেখা হবে না এ জন্মে । তুমি ভালো থেকো “।
মেসেজ টা লিখতে লিখতে রজতের চোখ দিয়ে অশ্রু তার গাল বেয়ে নীচে গড়িয়ে পড়ছিল । পাশে বসে থাকা একজন বয়স্কলোক রজতে কে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন – “ কিছু হয়েছে বাবা, কাঁদছ কেন”?
রজত দ্রুত চোখে হাত দিয়ে ঘসতে ঘসতে বলল , “কিছু বালি চোখে পড়ে গিয়েছে হয়তো “। এই ভাবে নিজেকে সামলে নিল সে । বয়স্ক লোকটি আর কিছু বললেন না ।
চন্দনপুর আসতেই রজত বাস থেকে নেমে গেস্ট হাউসের খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো গেস্ট হাউস শহরের পূর্ব দিকে নদীর গায়ে আছে । রজত নদীর পাড় ধরে চলতে লাগলো । এখন রাত সবে ৯ টা বাজে । এখনও মন্ত্রী গেস্ট হাউসে প্রবেশ করেন নি । দূর থেকে দাঁড়িয়ে রজত দেখল বন্দুক হাতে পুলিশরা ঘোরাফেরা করছে । রজত অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে পা টিপে টিপে নদীর পাড় ধরে গেস্ট হাউসের পাঁচিলের সামনে এসে দাঁড়ালো । পিছন দিক বলে পাহারা বেশি নেই । খুব সাবধানে পাঁচিল টপকাল রজত । এই পিছনটাতে ফুলের বাগান । সামনেই খুব সুন্দর গেস্ট হাউস । রজত ব্যাগ থেকে পিস্তল টা বের করে হাতে নিয়ে বাগানের মধ্যে লুকিয়ে থাকলো । কিছুক্ষন পর মন্ত্রীর গাড়ি এসে দাঁড়ালো গেস্ট হাউসের সামনে । মন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে গেস্ট হাউসের দু তলার একটা রুমে গিয়ে প্রবেশ করলেন । জানালা বাগানের দিকে ছিল । সেখানে একটা বেলকনিও ছিল । রাত ১ টার দিকে রজত ধীর পায়ে চুপি চুপি গেস্ট হাউসের সামনে গিয়ে দেখল পুলিশ গুলো নিজেদের মধ্যে গল্পে মসগুল । রজত পিছন দিকে থাকা একটা পাইপ ধরে খুব সাবধানে দোতলায় উঠে এল । জানালা দিয়ে দেখল – মন্ত্রী এখনও ঘুমাননি । কিছু লিখছিলেন । রুমের দরজা টা হাল্কা করে ভেজানো ছিল ।
রজত রুমের দরজা টা খুলে হাতে বন্দুক নিয়ে দ্রুত ঢুকে পড়ে মন্ত্রীর রুমে । মন্ত্রী রজতকে বন্দুক হাতে ঢুকতে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে জিজ্ঞাসা করেন – “কে তুমি “?
রজত শান্ত স্বরে বলে –“ আমি আপনার রাজ্যের একজন উচ্চ শিক্ষিত বেকার ছেলে “।
মন্ত্রীঃ ‘কি চাও তুমি”?
রজতঃ “কাজ চাই” ।
মন্ত্রীঃ “ বিভিন্ন চাকরির জন্য যে পরীক্ষা গুলো নেওয়া হচ্ছে তা দাও নি কেন “?
রজতঃ “ চাকরির পরীক্ষা আর কত দেব? এক – একটা বিভাগে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হতে ৫ বছর লেগে যাচ্ছে , আমাদের যৌবনের মুল্যবান সময় টা তো শেষ হয়ে গেল । আর বেশির ভাগ চাকরি নেতারা লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে বড় লোকদের ছেলেদের পাইয়ে দিচ্ছে । আবার অনেক ক্ষেত্রে এক্সপেরিয়ান্স সার্টিফিকেট চাইছে । কাজ না পেলে এক্সপেরিয়ান্স সার্টিফিকেট কোথায় পাবো বলুন । তাছাড়া অনেক জায়গায় অবসরপ্রাপ্তকর্মীদের পুরনায় নিয়োগ করা হচ্ছে – কি করে আমরা সাধারন বাড়ীর ছেলে – মেয়েরা চাকরি পাবো বলুন “?
মন্ত্রীঃ ‘ কোন ব্যাবসা করো নি কেন ? সরকার থেকে তো ঋণ দেওয়া হয় “।
রজতঃ “ ঋণ নেওয়ার সনয় জব করা কাউকে গেরেন্টার রাখতে হয় । কেউ এই দায়িত্ব নেবে কেন বলুন “। তাছাড়া তেলে ভাজা বা চা বিক্রি করলে বা টোটো চালালে আমাকে বিয়ে দেবে না সুমির বাড়ীতে ।
মন্ত্রীঃ সুমি কে ? তাছাড়া তোমার চোখে জল , তুমি কাঁদছ কেন ?
রজতঃ ( বান হাত দিয়ে চোখের জল মুছে নিয়ে ) আমি সুমিকে ভালোবাসি । তার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অন্য ছেলের সাথে । আমি বেকার বলে তার বাড়ীর লোকেরা আমাকে বিয়ে দেবে না ।
আমরা শিক্ষিত বেকার যুব সমাজ আপনাদের ভোট দিয়ে আজ সাধারন মানুষ থেকে মন্ত্রী বানিয়েছি । আপনারা সকলের জন্য ভাললেও আমাদের মতো উচ্চ শিক্ষিত বেকার ছেলে – মেয়েদের কথা ভাবেন না কেন ?
একজন কৃষক আত্মহত্যা করলে দেশের আইন সভা পর্যন্ত নড়ে যায় । লক্ষ লক্ষ কৃষকের কোটি কোটি টাকা লোণ মাফ হয়ে যায় । কিন্তু একজন বেকার আত্মহত্যা করলে সেটাকে ব্যর্থ প্রেমে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয় । কিন্তু এর গভীরে প্রবেশ করে দেখা হয় না । প্রায় প্রতিটা ব্যর্থ প্রেম এর জন্য দায়ী এই “বেকারত্ব”। চাকরি পেলে তার মনের মানুষকে হারাতে হত না । এই কষ্ট সেই শুধুমাত্র বুঝবে যে সত্যিকারের কাউকে ভালোবেসেছে ।
মন্ত্রিঃ তুমি হাতের বন্দুক ফেলে দাও । তোমাকে একটা চাকরি দেব ।
রজত হাতের বন্ধুক উঁচিয়ে ধরে বলল “ আমার একার জীবনের কাহিনী এটা নয় । এটা আমার মতো সকল বেকারদের কাহিনী । তারা কোন না কোন ভাবে বেকারত্বের জ্বালায় জ্বলে পুড়ে মরছে রোজ রোজ । কিন্তু মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতে পারছে না । আমার মতোই তাদের সবার জীবনের সব স্বপ্ন গুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে “।
মন্ত্রীঃ মাথা ঠাণ্ডা করো । বন্দুক ফেলে দাও ।
রজতের ততক্ষণে বন্দুকের টিগারে জোর করে চেয়ে দিয়েছে ।
গুগুগু ড়ু ড়ু ড়ু ম ম ম ম ্্্্্্,
খুব জোরে একটা আওয়াজ । নীচে থাকা নিরাপত্তা রক্ষীগণ ছুটে গেল বন্দুক উঁচিয়ে । মন্ত্রীর রুমে প্রবেশ করে দেখল মেঝেতে একটা অচেনা ছেলের রক্তাক্ত দেহ পড়ে রয়েছে । কানের কাছে গুলি মেরেছে । রক্ত চুইয়ে পড়ছে কানের কাছে থেকে । ছেলেটার চোখ দুটো চেয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মন্ত্রীর দিকে । চোখ দিয়ে যেন দু ফোটা অশ্রু বেরিয়ে মাটিতে চুইয়ে পড়ল গাল বেয়ে ।
হ্যাঁ – একটা বেকার ছেলে আবার আত্মহত্যা করলো । সবাই তাই বলবে । কিন্তু কারন এর গভীরে কেউ প্রবেশ করলে সে বুঝতে পারবে এটা আসলে “হত্যা”। “বেকারত্ব” হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার ছেলে - মেয়েদের স্বপ্নের এভাবেই হত্যা করে চলেছে প্রতিনিয়ত – প্রতি ঘণ্টা ।