আমরা কুকুরের বাচ্চা

6th July 2020 8:15 pm তারিফ আলম
আমরা কুকুরের বাচ্চা


আমরা কুকুরের বাচ্চা

লেখা -- তারিফ আলম

 

শীত টা একটু বেশিই পড়েছে । লালু আর ভুলু মায়ের দুধ খেয়ে এককোনে ময়লা জমা করে রাখার স্থানে ছেঁড়া বস্তা দেখে তার মধ্যে ঢুকে একে অপরকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল । সবে মাত্র তাদের এক মাস হল এই পৃথিবীতে । কত সুন্দর পৃথিবী । ভাই বোনদের সাথে সারাদিন খেলা করা আর তারপর মায়ের দুধু খেয়ে বস্তার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া ।
লালুর ঘুম টা হটাত ভেঙ্গে গেল – দূরে কোথাও যেন কালু কাঁদছে ।
লালু তার দাদা ভুলুকে ঠেলে তুলে বলল – “ঐ দাদা , কালুর কান্নার আওয়াজ না “?
ভুলু ঘুম থেকে জেগে কান খাড়া করে শুনে বলল – “হ্যাঁ রে “। মনে হয় নিলুর সাথে মারামারি করছে ।
ভুলু আবার ঘুমাবে বলে চোখ বন্ধ করলো ।
লালু বলল – “জানিস দাদা , কাল আমাকে না ঐ খানের একটা মেয়ে মানুষ ডাকছিল - আ তু তু করে , আমি ভাবলাম কিছু খাবার দেবে বা আদর করবে । আমি গিয়ে যখন তার পায়ে আদর করার জন্য গা দিয়েছি তখনি আমাকে এক লাথ মারল পেটে , এখনও আমার ব্যাথা করছে”।
ভুলু ঘুম ঘুম চোখে বলল – “আর যাস না ওদের কাছে “।

“কিন্তু দাদা , মা যে বলতো , ঐ দু পায়ে চলা জন্তু গুলো নাকি মানুষ । ওরা নাকি খুব দয়ালু । নিজেদের খাওয়ার বেশি হয়ে গেলে আমাদের মতো কুকুরদের খাবার দেয় । তাই খেয়ে আমারা বেঁচে থাকি” ।
ভুলু লালুর কথা শুনে বলল – “মা ঠিকই তো বলেছে । ঐ মানুষ গুলো খুব ভালো হয় । তাই আমাদের ওরাই ভগবান । ওদের উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে আমাদের বেঁচে থাকতে হয় । তাই মানুষের সব সময় উপকার করতে হয় – বুঝলি” ?
ভুলুর কথা শুনে লালু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল যে সে মানুষের কোন ক্ষতি করবে না ।
কিন্তু একটু পর আবার মোটা দাদার কান্নার আওয়াজ পেল । সেও “বাঁচাও” “বাঁচাও” বলে চিৎকার করে কাঁদছে । এবার আর তারা বস্তার মধ্যে শুয়ে থাকতে পারলো না । দুজনে দ্রুত বেরিয়ে ছুটে গেলে মোটা দাদার কান্নার আওয়াজ যেখান থেকে আসছিল ।
সামনে গিয়ে তারা অবাক হয়ে গেল । যে মানুষগুলোকে তারা ভগবান ভাবতো সেই মানুষ এর মধ্যে দু জন মোটা দাদাকে লাঠি আর রড দিয়ে খুব পেটাচ্ছে । মোটা দাদা পড়ে গিয়েছে মাটিতে । তার মাথা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে ফিনকি মেরে । পাশের কালু পড়ে আছে রক্তাক্ত অবস্থায় । মনে হয় মরে গিয়েছে সে ।
লালু ভুলু দুজনে ভয়ে কেঁদে উঠলো ।তারা ভয়ে জড়সড় হয়ে মা কে খুঁজেতে লাগলো ।
মা মা মা করে চিৎকার করে লালু বলতে লাগল ,” কালু আর মোটা দাদা কে মেরে ফেলল যে মানুষ গুলো । ম তুমি কোথায় আছো – বাঁচাও আমাদের মানুষের হাত থেকে “।
ভুলু একটা ঝোপের কাছে গিয়ে কাঁদতে লাগলো মা মা বলে । লালু এগিয়ে গিয়ে দেখল – তাদের মা পড়ে আছে । নাক মুখ থেকে রক্ত বের হচ্ছে ।
লালু কাঁদতে কাঁদতে মাকে নেড়ে বলল – উঠো মা , আমাদের বাঁচাও । ঐ মানুষ গুলো যে আমাদের মেরে দেবে । উঠো মা ...উঠো না ......আমি আর দুধু খাওয়ার বায়না করবো না --- তুমি উঠো মা । মা গো মা ...উ উ উউহু হু হু
ভুলু এসে ভাই লালু কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল – মা আর উঠবে না রে ভাই , মানুষ গুলো মাকে মেরে দিয়েছে ।
ঐ দেখ চারিদিকে আমাদের ভাই বোন এর লাশ পড়ে রয়েছে । মানুষ গুলো আমাদেরও মেরে দেবে দেখতে পেলে । চল ভাই বাইরে পালাই ।
“কিন্তু লোহার গেট তো লাগানো – কি করে বাইরে যাবো ?- লালু কাঁদতে কাঁদতে বলে ।
তাহলে চল আমরা যেখানে ঘুমিয়েছিলাম , সেই বস্তার মধ্যে লুকিয়ে পড়ি ।
দুজনে প্রানের ভয়ে ছুটে গিয়ে লুকিয়ে পড়লো বস্তার মধ্যে ।
একটু পরেই দেখল দুটো মেয়েমানুষ রড আর লাঠি নিয়ে তাদের দিকেই আসছে । লালু ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিল ।
ভুলু শুনতে পেল – মেয়ে মানুষ গুলো বলছে – আর দুটো বাকি আছে । এখনেই কোথাও লুকিয়ে আছে । খুঁজে তাদেরও মেরে দিতে হবে ।
কথা গুলো শুনে লালু ভয়ে কেঁদে উঠলো ।
ভুলু লালুকে চুপ করানোর চেষ্টা করতে লাগলো । কিন্তু তার কান্নার আওয়াজ পেয়ে গিয়েছে মেয়েমানুষ দুটো । রড আর লাঠি দিয়ে বস্তার উপরেই মারতে লাগলো জোরে জোরে ।
লাঠি আর লোহার রড এর আঘাতে দুজনের মাথা ফেটে রক্ত বের হতে লাগলো । ভুলু ছুটে গিয়ে মানুষগুলোর পায়ে ধরে বলবে ভেবেছিল তাদের প্রান ভিক্ষা দিতে । তারা কোন ক্ষতি করে নি , কেন তাদের মারা হচ্ছে জিজ্ঞাসা করতে । কিন্তু কুকুরের ভাষা তো মানুষরা বুঝে না । রড দিয়ে জোরে মেরে দিল ভুলুর মাথায় । মাটিতে পড়ে ছটপট করতে করতে মারা গেল ।
এবার সবার ছোট লালুর পালা । লালু বুঝে গিয়েছে এবার তাকেও মরতে হবে । বাঁচার কোন উপায় নেই । চুপ করে অপেক্ষা করতে লাগলো কখন রডের আঘাত এসে পড়ে তার শরীরে । এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয় । হ্যাঁ মা তো বলেছিল এই মানুষ গুলো নাকি কুকুরের ভগবান । সত্যি ?

তারিফ আলম





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?