প্ৰবন্ধ :- " ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র চট্যোপাধ্যায়"
লেখক :- গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
*****
যাঁর হৃদয়ের গভীর থেকে জাতীয় কল্যাণে উদ্দীপনাময় মন্ত্রের আবির্ভাব হল এবং সেই মন্ত্রই দেশকে অথবা মাতৃভূমিকে মায়ের আসনে বসিয়ে শ্রদ্ধা করার এবং ভালবাসার শিক্ষা দিয়ে জাতীয় মনকে উৎসাহিত করে সাহস যোগায় স্বাধীন হবার, সম্পূর্ণ ভারতবর্ষে জাতি,ধর্ম,ভাষা নির্বিশেষে সমস্বরে উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হল "বন্দে মাতরম"। সেই মন্ত্র স্রষ্টাই তো "মহর্ষী"!
আজ, সেই মন্ত্রদ্রষ্টা , মহর্ষী , জাতীয় চেতনার উৎপ্রেরক সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্যোপাধ্যায়ের ১৮২ তম জন্মদিনে ওনাকে জানাই আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম এবং শ্রদ্ধাঞ্জলী।
ঋষি বঙ্কিম চন্দ্রের পূর্বে জন্মভূমি কে মায়ের আসনে বসিয়ে এত সুন্দর মধুর জীবন্ত স্তুতী মনে হয় আর কেউই তদর্থে কোন লেখক বা সাহিত্য রচনাকার করেন নি। যে স্তব বা স্তুতি গানে আছে ভক্তি, উন্মাদনা, আছে শক্তি !
যে মহামন্ত্রকে অবলম্বন করে জাতি,ধর্ম,ভাষা, নির্বিশেষে উন্মত্ত আবাল বৃদ্ধ বনিতা এগিয়ে এসেছিলেন স্বাধীনতা লাভের আন্দোলনে, সমস্বরে গেয়েছিলেন গান,করেছিলেন জীবন বলিদান , সেই মহামন্ত্রই হচ্ছে "বন্দে মাতরম"। কী সুন্দর জীবন্ত মাতৃভূমির বর্ণনা! !
কোন একটা ভৌগলিক ভূ - খণ্ডকে মাতৃরূপে বর্ণনা করে লেখা গান বা কবিতা বা স্তব,তা সে যাই হোক না কেন,সেই রচনার মাধ্যমে কোন ভূ-খণ্ডকে মাতৃরূপে প্রত্যক্ষ করান এবং সেই স্তব বা গানকে জাতীয় আন্দোলনে মূল শ্লোগান বা মহামন্ত্রের রূপ দেওয়ান সহজ কথা নয়! ! সেই সময় ভারতবর্ষ বিশালবড় এক ভূ-খণ্ড! পরাধীনতার গ্লানীর লজ্জায় লজ্জিত সম্পূর্ণ ভারতবর্ষ। স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্য ছটফট করছে সম্পূর্ণ দেশবাসী। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন,কংগ্রেস বা অকংগ্রেসী,সাধু - দস্যু সমেত সমস্ত জাতি ধর্ম, ভাষা নির্বিশেষে সর্ব ভারতবাসী, স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য উন্মুখ। স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনকারীগণ সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছেন ইংরেজ শাসকের নিষ্ঠুর অত্যাচার এবং দমনকে। তবুও, লক্ষ তো একটাই, স্বাধীনতা চাই। উপযুক্ত সময়েই ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র দেশকে দিয়েছিলেন এই মহামন্ত্র " বন্দে মাতরম "। স্বদেশী আন্দোলনের রাজনৈতিক পটভুমীতে লেখা ওনার বিখ্যাত উপন্যাস "আনন্দ মঠের" মাধ্যমে। বর্তমানে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা প্রাপ্ত গান " বন্দে মাতরম "। তখন কিন্তু ধর্মের সংকীর্ণ গণ্ডী স্পর্শ করতে পারেনি "বন্দে মাতরম" কে অথবা কোন রকমের আলোচনা, চর্চা অথবা "বন্দে মাতরম" গান কোন ধর্মের নীতি বিরুদ্ধ - এরকম তর্কের সম্মুখীন হতে হয় নি। কেননা দেশ তখন ছিল পরাধীন! নিজস্ব সত্বা, সম্মান, অধিকার,পরাধীনতা জনিত লজ্জা এসব থেকে মুক্তি পেতে একমাত্র অবলম্বন ছিল আন্দোলন এবং আন্দোলনের অবলম্বন ছিল মাতৃভূমি। সুতরাং তখন " বন্দে মাতরম " কোন দোষের ধ্বনি ছিল না, ছিল গর্বের ধ্বনি।
ইংরেজী তারিখ অনুসারে ২৭শে জুন ১৮৩৮ এবং বাংলা তারিখ অনুযায়ী ১৩ ই আষাঢ় ১২৪৫ এ ভারতবর্ষ অথবা বিশ্ব পেয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্র চট্যোপাধ্যায়ের মতো একজন স্বনামধন্য নিষ্ঠাবান সন্তানকে যিনি ছিলেন নির্ভিক প্রশাসক, লেখক, কবি এবং সাংবাদিক। জন্মলগ্ন থেকেই মেধাবী ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। বাংলা, সংস্কৃত, ইংরাজী বিষয়ে প্রচণ্ড জ্ঞানের দখল নিয়ে স্কুলের প্রতিটি পরীক্ষা গুলিতে পুরস্কৃত হতেন। পরবর্তীকালে হুগলী মহসীন কলেজ থেকে পড়াশুনা আরম্ভ করে কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজ। বঙ্গের অত্যন্ত গর্বের বিষয়, ১৮৫৮ সালে আর্টস এর বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র হলেন প্রথম স্নাতক (গ্রাজুয়েট)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ( Law) বিষয়ে ডিগ্রী প্রাপ্ত করেন।
১৮৫৮ সালেই বৃটীশ সরকার বঙ্কিমচন্দ্রকে ডেপুটী ম্যাজিস্ট্রেটের পদে চাকুরীতে নিযুক্ত করে। পরে বঙ্কিমচন্দ্র নিজ এবং কর্তব্যনিষ্ঠার জন্য তাঁর ডেপুটী কালেক্টরের পদেও পদোন্নিত হয়েছিল। উল্লেখ্য এই যে বঙ্কিমচন্দ্রের পিতা নিজেও বৃটীশ সরকারে একজন ডেপুটী কালেক্টর ছিলেন।
দীর্ঘ ৩২ বছর সুনাম এবং নিষ্ঠার সঙ্গে চাকুরী করার পরে আরম্ভ হয় ওনার সাহিত্য চর্চা। প্রথম প্রথম বঙ্কিমচন্দ্রের রূচী ছিল কবিতা লেখায়। ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত মহাশয়ের পত্রিকা "সংবাদ প্রভাকর" এ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম আবির্ভাব। প্রতিযোগিতায় দেবার জন্যে বঙ্কিমচন্দ্র ইংরেজী ভাষায় লেখা "রাজমোহনস ওয়াইফ " উপন্যাসটিকে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু, লেখাটা পুরস্কৃতও হয়নি এবং ছাপাও হয় নি। সাহিত্য জগত থেকে সেরকম প্রতিক্রিয়া না পেয়ে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা ভাষাতেই লিখতে আরম্ভ করেন ।
প্রকাশন করলেন মাসিক পত্রিকা "বঙ্গদর্শণ" এর। এই পত্রিকাতেই বঙ্কিমচন্দ্রের কবিতা, উপন্যাস আদি ছাপা হত। পাঠক মহলে প্রচণ্ড সারা পেয়ে প্রসিদ্ধ হতে লাগল ওনার একের পরে এক উপন্যাস। স্বদেশী আন্দলনের বিচার ধারায় বঙ্কিমচন্দ্র রচিত "বন্দে মাতরম" গান জনমানসকে এতবেশী প্রভাবিত করেছিল যে পরবর্তী কালে লালা লাজপত রায় "বন্দে মাতরম" নাম করণ করে একটি স্বদেশী পত্র পত্রিকার প্রকাশন করেছিলেন। প্রভাবিত হলেন প্রখ্যাত বিপ্লবী বিপিন চন্দ্র পাল। ১৮৬৫ তে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস "দূর্গেশ নন্দিনী" থেকে শুরু হয়ে পর্যায় ক্রমে চলতে থাকে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য চর্চা। প্রকাশিত এবং সারা ভারতে উচ্চ প্রশংসিত হতে থাকে ওনার একটির পর একটি উপন্যাসের।
প্রকাশিত হল - কপাল কুন্ডলা,মৃণালিনী, বিষবৃক্ষ , চন্দ্রশেখর, রজনী,কৃষ্ণকান্তের উইল, আনন্দমঠ , দেবী চৌধূরানী,সীতারাম, রাজসিংহ, কমলা কান্তের দফ্তর, বিজ্ঞান রহস্য, লোক রহস্য, ধর্মতত্ব ইত্যাদি।
১৮৯৪ সালে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনাবসান হয়। বিশ্ব হারালো এক নিষ্ঠাবান দেশভক্ত, বিদ্যান সন্তানকে।
ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় দেশবাসীকে শিক্ষা দিয়ে বলেছেন যে - " একমাত্র জন্মভূমিই হচ্ছেন আমাদের মা। আমাদের জন্মভূমি স্বর্গ থেকেও বড়। ভারত মা ই আমাদের মা। কোন পিতা, ভাই, ভগিনী, স্ত্রী, সন্তান, আবাস এবং অন্তর বলে আমাদের আর কোনো কিছুই নেই - আমাদের , কেবল মা ই আছেন "॥
বন্দে মাতরম॥