কবির জন্য - কথাকলি

30th May 2020 5:01 pm গল্প
কবির জন্য - কথাকলি


কথাকলির লেখা একটি অসাধারন গল্প

*কবির জন্য*

চেয়ারটা তখনও অল্প অল্প দুলছে। একটা পুরনো আরামকেদারা। মাথার কাছে টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে অনেকটা জল খেলো মণি। গায়ের চাদরটা সরিয়ে এ.সি বন্ধ করে দিলো। বাথরুমে যেতে যেতে ঘড়ির দিকে তাকয়ে দেখলো ঠিক ভোর তিনটে পাঁচ। গত একসপ্তাহ ধরে ঠিক এইরকম সময় ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। আর প্রত্যেকদিনই একই ঘটনা ঘটছে।
বাড়িটা বেশ পুরনো। প্রায় বছর পঞ্চাশ আগের। এক নিঃসন্তান দম্পতি বাস করতেন। শেষের দুবছর বৃদ্ধা একা থাকতেন। তিনি থাকতে থাকতেই শিবনাথ ভাদুড়ীর কাছে বাড়িটি হস্তান্তরিত হয়। চুক্তি ছিলো, তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন অন্য কেউ বসবাস করতে পারবে না। আজ দুবছর হলো বৃদ্ধা মারা গেছেন। শিবনাথ বাড়িটি বেশ কম দামে বিক্রি করে বিদেশ পাড়ি দিয়েছে। বর্তমানে বাড়ির মালিক মণিময় সান্ন্যাল।
বেশ ভালোই চলছিলো সবকিছু। মণি বিপত্নিক। নিজের এবং শ্বশুরবাড়ি মিলিয়ে অগাধ সম্পত্তি। একমাত্র মেয়ে রাণাঘাটে থাকে। বাবার একগুঁয়ে আচরণের জন্য এবাড়িতে বিশেষ যাতায়াত নেই। বছরে ছয়মাসে একবার উৎসবে পার্বণে দেখা সাক্ষাৎ হয়। এবাড়িতে মণির সবসময় দেখাশোনা করার লোক আছে, নসু। তারও বয়স প্রায় বাবুর কাছাকাছি পঞ্চাশোর্ধ।
বয়সের কারণেই মণির আজকাল ঘুম খুব কমে গেছে। ওষুধ খেয়েই কোনমতে শুয়ে পরতে হয়। গত কয়েকদিন ধরে ঘুমের মধ্যে মনে হয় যেনো ঘরে সে ছাড়াও অন্য আরও একজন আছে। ঘরে বড়ো একটি খাট ছাড়া দরজার পাশেই আছে একটি কাঠের আলমারি। খাটের পাশে ছোট্ট একটা তেপায়া টেবিল মতো। জল ওষুধপত্র এসব থাকে। আর রয়েছে একটা শখের পুরনো আরামকেদারা। তবে সেটা বিশেষ রকম মজবুত এবং বাবুর খুব প্রিয়। এখন গরমকাল, ঘরের জানলা দরজা বন্ধ থাকে। ভিতরে ঠান্ডা মেশিন চলে। মণির খুব বই পড়ার নেশা। যেকোনো সময় বই না পড়লে ঘুমই আসে না। আর তাছাড়া উনার টিভি দেখার অভ্যাস নেই। বাইরের ঘরে নসু দেখে মাঝে মাঝে বাংলা ছবি।
এই কয়েকদিন হলো লেখক 'হুমায়ুন আহমেদ' এর গল্প সংকলন শেষ করেছে মণি। এখন পড়ছে একটা নতুন লেখকের কবিতার বই। অসম্ভব সুন্দর লেখা। মন ছুঁয়ে যায়। এর আগে কোনোদিন সেভাবে কবিতার বই পড়ে দেখা হয় নি। কিন্তু এই লেখকের লেখার মধ্যে একটা আর্তি রয়েছে, একটা আবেদন রয়েছে যেটা মনকে টানে, ভাবায়, মন ছুঁয়ে যায় প্রতিটি শব্দ।
আজ রাতে বইটা পড়তে পড়তে চোখটা একটু ঘুমে জড়িয়ে এসেছিলো, এমনসময় মনে হলো আরামকেদারায় কেউ একজন বসে আছে। বাচ্চা মতন। মাথাটা শরীরের তুলনায় বড়ো, চুল খুব ছোটো করে কাটা। ঘরে খুব হাল্কা ডিম লাইট জ্বলছিলো। কিন্তু মাথার কাছে টেবিল ল্যাম্পের জোরালো আলোর ছটায় এর বেশি দেখা যাচ্ছিলো না। প্রথমে মনে হলো চোখের ভুল। কিন্তু আরামকেদারাটা দুলে উঠলো ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে। মণি সাহস করে জিজ্ঞেস করলো-----"কে কে ওখানে, কে? ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলোনা। আরামকেদারায় যে বসে আছে তার শরীরের নীচের অংশ প্রায় অন্ধকারে ঢাকা, মাথাটা অল্প অল্প দুলছে। মনে হলো আগের থেকে চেয়ারটা যেনো খাটের আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। ঘরটা যথেষ্ট ঠান্ডা, তারমধ্যেও আরও ঠান্ডা একটা তীব্র আমেজ তৈরী হয়েছে। রীতিমতো শীত করছে, চাদর গায়ে থাকা স্বত্তেও। সমস্ত দরজা জানলা বন্ধ। মণির এবার বেশ ভয় লাগলো। আবার প্রশ্ন করলো--------- "কে কে কে তুমি?"
অনেক দূর থেকে কেউ একজন কথা বললো---- "আর মাত্র দুটো প্রশ্ন বাকি, তিনটের বেশি হলেই আমার সাথে চলে যেতে হবে।"
মণি--------- "কোথায়, কোথায় যাবো?"
-------"যেখানে কেউ নেই, শুধু আমি, শুধু একা আমি থাকি।"
মণি------- "তুমি কে, এখানে কেনো?"
------- "আমিই এখানে থাকি, তুমি এখানে এসেছো বলে আমার তাই অসুবিধা হচ্ছে।"
আচমকা ঘুমটা ভেঙে গেলো। তখনও চেয়ারটা অল্প অল্প দুলছে। ঘরটা অসম্ভব ঠান্ডা। মাথার কাছে টেবিল ল্যাম্পের হলদেটে আলো উধাও। বোঝা যাচ্ছে কিছুক্ষণ আগেই নিভেছে। উঠে তেপায়া টেবিলে রাখা বোতল থেকে অনেকটা জল খেলো। বাথরুমে যাওয়ার আগে ঘরের দরজাটা খুলে বাইরেটা দেখে নিলো। এই ঘরের বাইরে একটা সরু প্যাসেজ মতো, তারপরে দুদিকে দুটো ঘর। একটা শোবার ঘর একটা বসার। শোবার ঘরের সাথে লাগোয়া আর একটা ছোটো ঘর আছে। নসু সেখানেই থাকে। বাইরের ঘরের হাল্কা আলো এসে প্যাসেজে ত্যারছাভাবে পড়েছে। প্যাসেজের শেষপ্রান্ত অপেক্ষাকৃত অন্ধকার। প্যাসেজের শেষ প্রান্তে উল্টো দিক থেকে একটা অদ্ভুত ছায়া পড়েছে দেওয়ালের গায়ে,অনেকটা মানুষের মাথার আকৃতি। মণি ঘুম চোখে নির্বিকারভাবে কিচ্ছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো। তারপর ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলো। বাথরুম থেকে বেড়িয়ে আবার চাদরটা গায়ে জড়িয়ে আরামকরে পাশ ফিরলো।

"তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে যাবো কোথায়?
হাত বাড়িয়ে ডাক দিয়ে যাক,
এই পৃথিবী যতোই আমায়।
কোথায় যাবো,যাবো কোথায়!
মর্মমূলে বিঁধে আছে যে প্রেম তোমার,
শরীর জুড়ে অশরীরি ভালোবাসার,
সেই পিছুটান ভাবায় আমায়।
সেসব আমি তুচ্ছ করে,
কোথায় যাবো,যাবো কোথায়?........." কবিতার কথাগুলো পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো কোথায় যেনো তলিয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে মণি। এর আগে কোনোদিন এভাবে কবিতা ভালো লাগেনি। আজ লেখক পরিচিতিতে পড়ে দেখলো ভদ্রলোকের নাম ঋতুরাজ দত্ত। জন্ম আগরতলা। প্রচুর দেশবিদেশ ঘুরেছেন। অগাধ পান্ডিত্য। কবিতা লেখেন শখে। ছবি আঁকেন দুর্দান্ত। মাছ ধরার শখ ছিলো খুব। মাত্র উনত্রিশ বছর বয়েসে মারা যান। ভদ্রলোকের ছবিটি দেখলে বোঝা যায় চোখদুটি খুব বুদ্ধিদীপ্ত, গভীর তার দৃষ্টি। কিন্তু কোথায় যেনো শারীরিক আকৃতিগত একটা ত্রুটি রয়েছে।
সেদিন বিকেল থেকে বৃষ্টি পড়ছিলো। অনেকদিন পড়ে নসু আজ জমিয়ে ভুনো খিচুড়ি আর ডিম ভাজা করেছিলো। একটু বেশি পরিমাণে খাওয়া হয়ে গেলো রাত্তিরে। আজ আর বেশিক্ষণ বই পড়া হলো না। বিছানার মাথার কাছের জানলাটা খোলা ছিলো। ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে শুয়ে পরেছিলো মণি। বাথরুমের দরজা কখন খুলে গিয়ে হাওয়ায় অল্প অল্প দুলছিলো। মণি বুকের ওপর বই রেখে আরামকেদারায় শুয়ে ঘুমিয়ে পরেছিলো। ঠিক কতক্ষণ এভাবে ছিলো মনে নেই, একসময় মনে হলো কে যেনো ঠেলছে। তাকিয়ে দেখলো পাশে দাড়িয়ে সেইদিনের সেই ছেলেটি। একে ছেলে না লোক কি বলা যায় ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। শারীরিক গঢ়ন একটা বাচ্চা ছেলের মতো কিন্তু মুখের আদল বয়স্কদের মতো। প্রায় একসপ্তাহ হলো এইভাবে চলছে। প্রায়ই দেখা হয় মণির সাথে এর। কিন্তু সেটা ঘুমের ঘোরে, নাকি জেগে ঠিক বোঝা যায় না। প্রথম প্রথম ভীষণ ভয় করতো, এখন আর ভয় করে না। প্রত্যেকদিনই দেখে খাটের সামনে চেয়ারটা একটু একটু করে এগিয়ে আসছে আর ছেলেটির মুখ তত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। বাইরে সেদিন প্রচন্ড বৃষ্টি পরছিলো। মণি টেরই পেলো না, সে কখন খাটে এসে শুয়ে পরেছে। চেয়ারটা দুলছে, ছেলেটা বসে আছে চেয়ারে। তার সাথে ছেলেটি ডাইনে বাঁয়ে মাথা নেড়ে যাচ্ছে।
মণি আজও প্রশ্ন করলো-----"কে তুমি?"
ছেলেটি------"তুমি আমাকে চেনো। আর মাত্র দুটো প্রশ্ন বাকি।"
মণি------------ "এখানে কেনো?"
ছেলেটি--------"তুমি তো ডাকো, মনে করো তাই।"

এরপর মণির আর তৃতীয় প্রশ্ন করার সাহস হলো না। আজ এমনিতেই ঘরের মধ্যে ঠান্ডা মেশিন বন্ধ। ঘরের দরজা হাল্কা ভেজানো, জানলা খোলা। আচমকা ভীষণ জোরে একটা বাজ পড়লো। দুম করে ডিম লাইট আর ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলো। বিদ্যুতের আলোয় দেখা গেলো তখনও খালি আরামকেদারাটা অল্প অল্প দুলছে।
আজ শনিবার। গতকাল নসু নিউআলিপুরে ওর ছেলের সাথে দেখা করতে গেছে। আগামীকাল আসবে। রান্না সব করাই আছে।সারাদিনে মণির কোনো কাজ নেই। সকালে চা জলখাবার খেয়ে, একবার পেনশন আর এল.আই সি'র ফাইলগুলো খুলে বসেছিলো। দেখলো নেড়েচেড়ে। সব ঠিকই আছে। আজ খুব একা একা লাগছে। যদিও এই একাকিত্বের সাথে গত বারো বছরের সখ্যতা। এই নিয়মের সাথেই দিব্যি অভ্যেস হয়ে গেছে তবুও মাঝে মাঝে একটু আধটু খারাপ লাগে। যদিও সারাদিনে নসুর সাথে তেমন বিশেষ কোনো কথা হয় না, তবু আজ দুদিন ধরে নসুর অনুপস্থিতিতে বেশ একা লাগছে। একটা মানুষ সারাদিন ঘুরঘুর করে বাড়িতে, আজ যেনো কিসের অভাব। সকালে ঠিকে ঝি এসে ঘরের কাজ সব করে রেখে গেছে। দুপুরে খাওয়ার পরে শুয়ে শুয়ে আবার সেই বইএর পাতায় চোখ রেখে ঘুমের আয়োজন করছিলো মণি। এমনসময় বেশ জোরে চেয়ারটা দুলে উঠলো। সেই ছেলেটি। আজ মুখটা খুব চেনা চেনা লাগলো। কোথায় দেখেছে, কোথায় দেখেছে, কিছুতেই মনে পরছে না... উফ কোথায় যে দেখেছে!!
মণি জিজ্ঞেস করলো------- "আজ আবার কি?"
ছেলেটি------ "কাল থেকে আমি আর আসবো না।"
মণি---------- "কেনো?"
ছেলেটি-------"আসতে পারবো না। তোমাকে সাথে নিয়ে যেতে চাই, যাবে?"
মণি---------"না--না--না আমি কেনো !! আমি যেতে চাই না।"
খুব জোরে নিজের অজান্তে চেঁচিয়ে উঠতেই ঘুমটা ভেঙে গেলো।চোখ মেলে দেখলো সারা গা ঘামে ভিজে গেছে। বুকের ওপর সেই কবিতার বইটা খুলে রাখা। বিছানায় আধশোয়া। মাথার কাছে জানলা খোলা। গাঢ় সবুজ পর্দা হাওয়ায় উড়ছে। বাইরে প্রায় সন্ধ্যের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। ঘরের দরজা হাল্কা ভ্যাজানো। খাটের একেবারে পাশে চেয়ারটা রোজকার মতো সেভাবেই দুলছে। বেশ জোরেই দুলছে আজ। ঠিক একটু আগেই কেউ যেনো চেয়ার ছেড়ে উঠে গেছে। মণি খাটের থেকে নামতে গিয়ে বুকের ওপর উপুর করে রাখা বইটা নিচে পড়ে গেলো। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় লেখক পরিচিতিতে লেখকের ছবিটা আজ আর একটু যেনো স্পষ্ট দেখতে পেলো। একি! এ কার ছবি! এতো সেই ছেলেটি, রোজ ঘুমের ঘোরে যার সাথে কথা হয়। চোখে চশমা দিয়ে আরও পরিস্কার দেখতে পেলো ছবিটা। একেবারে অবিকল সেই ছেলেটি। মাথাটা শরীরের তুলনায় বড়ো। হঠাৎ বাইরে একটা পায়ের আওয়াজ শোনা গেলো। কেমন যেনো ঘরের সামনে দিয়ে কেউ হেঁটে যাচ্ছে, একটু পা টেনে টেনে৷ মণি আসতে করে ভ্যাজানো দরজার সামনে গিয়ে দাড়ালো। পরিস্কার অনুভব করলো ওপাশে কেউ একজন আছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে পড়ে গেলো আজ বাড়িতে নসু নেই। তবে কে ওপাশে, কার সাথে ঘরে এতক্ষণ কথা বললো !! বুকের মধ্যে কে যেনো হাতুড়ি পেটাচ্ছে। কোনোরকমে দরজাটা আস্তে করে খুলে কাউকেই দেখলো না। প্যাসেজের ওপ্রান্তে তাকিয়ে দেখলো একটা মানুষের অবয়ব, ছায়া মতোন আর মাথাটা বেশ বড়ো। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো ধীরে ধীরে ছায়াটা মিলিয়ে ছোটো হয়ে গেলো।
সেদিনই রাতে নসু বাড়ি ফিরে বাবুর অসুস্থতার খবর পেলো। আজকাল বাবুর ঘরের মেঝেতে নসু বিছানা পেতে শোয়, কখন কি দরকার লাগে। পারিবারিক ডাক্তার সামন্ত, বাবুকে বই কম পড়তে বলেছেন। উনার নাকি মাথায় চাপ পরছে।একা থাকেন নানারকম উদ্ভট চিন্তা করেন। নসু আজকাল দ্যাখে, বাবু ঘুমানোর সময় বুকের ওপর দুহাত জরো করে শোয় আর নিজের মনে কথা বলে। এখন নসুর বিছানা পাতা থাকে বলে আরামকেদারাটা আলমারির পাশে সরিয়ে রাখা। বাবু সেটাতে বসেও না। বাবু ঘুমানোর একটু পরেই খুব ভালো করে কান পেতে শুনলে বোঝা যায় বাবু বলছেন------"তুমি কবিতাগুলো বেশ ভালোই লেখো----বেশ ভালো, মন ছুঁয়ে যায়---ঋতু ঋতু ঋতু এইটাই আসল নাম তোমার----------আর মাত্র একটা প্রশ্ন আছে, তোমার কি হয়েছিলো, কিভাবে এমন হলো------?"
নসু দেখেছে বাবু যখন ঘুমের মধ্যে কথা বলেন চেয়ারটা তখন আপনা থেকে দুলতে থাকে। নসুর মোটা মাথায় অতসত ব্যাখ্যা আসে না। সে চাদর গায়ে দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমানোর আয়োজন করে, সকালে তার অনেক কাজ। এদিকে মণির তৃতীয় প্রশ্নের আগেই দরজার ওপাশে পায়ের হাল্কা আওয়াজ হয়। পা টেনে টেনে হাঁটার মতো কেউ একজন চলে যায়। দেখা যায় প্যাসেজের ওইপ্রান্তের দেওয়ালে একটি ছেলের বড়োমাথার ছায়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে ছোটো হতে থাকে। ঠান্ডা ঘরে ঠান্ডা মেশিনের শীতল হাওয়া আরও তীব্র শীতল হয়। চাদরের তলায় নসু ঠান্ডায় রীতিমতো কাঁপতে থাকে। আর এদিকে খাটে বুকের ওপর নাম না জানা কবি ঋতুরাজের লেখা কবিতার বই উপুর করে নিয়ে শুয়ে আধো ঘুমের মধ্যে দর দর করে ঘামতে থাকে মণি, মণিময় সান্ন্যাল। ভয়ে ভয়ে দুটো প্রশ্ন করেই চুপ হয়ে যায়, তৃতীয় প্রশ্ন করার আর সাহস হয় না। সদ্য পড়া কবিতার পঙক্তি এলোমেলোভাবে ঘুরপাক খেতে থাকে মাথায়-------

"কবির জন্য একলা কাঁদে ভূবনডাঙার মেঘলা আকাশ।
একফালি চাঁদ, ঈদের রাতের হিমেল বাতাস।
কবির জন্য শরীর জুড়ে,অশরীরী ভালোবাসা।
দুঃখ নিয়ে ভাঙুক না ঘুম, সুখের স্রোতে না হোক ভাসা।
কবির জন্য জয়পরাজয়,কাঁচের চুড়ি ভাঙার মতো ইচ্ছে ভাঙা।
দেখবে যারা,শুনবে তারা,থাকবে পাশে,
কন্ঠরুদ্ধ বাক্যহারা।
কবির জন্য এমনভাবে হারিয়ে যাওয়া সহজ নাকি!
বাড়ছে বয়স চোখের কোনায়।
কবির রঙে চোখ রাঙিয়ে, সহজ ভাষায় মিশে যাওয়া আজও বাকি।
কবির জন্য এক পৃথিবী ভালোবাসা রাখা আছে ওই তোরঙ্গে মনের কোণে...!"
কবিই শুধু জানে এমন কবিতাকে বাসতে ভালো,
শুধু কবিই জানে----কবিই জানে----কবিই জানে।"





Others News

একটি সুন্দর গল্প - চুল

একটি সুন্দর গল্প - চুল


অনেক ক্ষণ ধরে পুরোনো ফোন নিয়ে ঘাঁটছিলাম। বিরক্ত হয়ে স্ত্রী বললেন - "এবার রাখো। তোমার মেয়ে খাবার নিয়ে তখন থেকে বসে আছে। খেতে চাইছে না। একটু দেখো।"

অগত্যা। গিয়ে দেখি একতাল আতপ চাল আর ঘি মাখানো ভাত নিয়ে সে বিরসবদনে বসে। খুব রাগ হল তার মা এবং আমার নিজের মায়ের প্রতি। সত্যি তো, এমন বিস্বাদ খাবার খেতে কেন যে জোর করে.. !

মাাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম- "মা রে, দুটো খা। অন্ততঃ আমার কথা ভেবে।" মন্ত্রের মত কাজ হল। টলটল চোখে সে বলল - "বাবা, খাচ্ছি। কিন্তু আমার একটি চাওয়া আছে তোমার কাছে। দেবে?"

কোন বাবা তার সন্তানকে না দিয়ে পারে! বললাম - "নিশ্চয় মা। কিন্তু কম্পিউটারের মত দামী কিছু চেয়ে বসিস না। এখনি অতটা সামর্থ্য তো নেই।"

মেয়ের চোখ থেকে এবার মুক্তোদানা ঝরে পড়ল। "আমি কি তোমায় বিব্রত করতে পারি?" - প্রশ্ন সে দৃষ্টিতে। আমি লজ্জিত হলাম।

খাওয়া শেষ করে সে বলল - "এবার বলি?"

তার ঠাকুমা, মা এবং আমার সপ্রশ্ন দৃষ্টি এখন তার দিকে। সে ধীরে ধীরে বলল - "আমি ন্যাড়া হতে চাই।"

ছুঁচ পড়লে শোনা যাবে এমন নীরবতা ভাঙ্গল আমার স্ত্রীর হুঙ্কারে - "মাথা খারাপ হয়েছে তোর। মেয়েরা কেউ ন্যাড়া হয়..!"
আমার মা রেগে গিয়ে বললেন - "যত্তোসব পাগলামি। আমাদের পরিবারে এমন অনাসৃষ্টি কেউ কখনও করে নি। এবার টিভি দেখে বিলেতের অন্ধানুকরণ।"

পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠছে দেখে সামলাতে চাইলাম - "মা রে, তোর ওমন গোছাভরা সুন্দর চুলগুলো কেটে ফেলবি? কিন্তু কেন?"

শান্ত কিন্তু প্রত্যয়ী কণ্ঠে মেয়ে বলল - বাবা, তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে আমায়। তুমি নিজেই তো কতবার আমাকে সত্যবাদী হরিশচন্দ্রের ঘটনাটা বলেছ। শিখিয়েছ - সত্যবাদীতার জন্য জীবনপণ করা যায়। তাহলে এখন নিজের কথা রাখতে চাইছ না কেন?"

জয় হল তার। একমাথা রেশমী চুল মুড়িয়ে সন্ন্যসিনীর মত দেখতে হল তাকে। আমার কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছিল। তার ঠাকুমা, মা তো কথা বলাই ছেড়ে দিল আমার সঙ্গে মেয়ের এমন বিচিত্র আব্দারে তাল দেবার জন্যে।

প্রতিদিনকার মত তাকে স্কুলে ছাড়তে গেলাম। আমার আদরের ন্যাড়ামাথা স্কুলের গেটের দিকে এগোচ্ছে। ঠিক সেই সময় একটি গাড়ি থামল। শুনলাম - আমার কন্যের নাম ধরে কেউ ডাকছে - "সিধুজা।"

মেয়ে থমকাল। তার মুখে অনাবিল হাসি। দেথলাম গাড়ি থেকে নামলেন এক ভদ্রমহিলা আর ছোট্ট একটি ছেলে। তার মাথাটিও ন্যাড়া। আমি ভাবলাম - সিধুজা তবে একা নয়, এটাই নতুন ফ্যাশন!

অচীরেই আমার ভুল ভাঙ্গালেন ছেলেটির মা। বললেন - "বিরলতম অনুূভূতিপ্রবণ আপনার মেয়ে। গতসপ্তাহে আমাদের বাড়ি এসেছিল আমার ছেলেকে দেখতে। ওর কেমোথেরাপি চলছে। ফলে সব চুল ঝরে গেছে। স্কুলে গেলে পাছে বন্ধুরা পিছনে লাগে তাই আসতে রাজী হচ্ছিল না। তা শুনে আপনার মেয়ে সিধুজা তখনই বলেছিল - স্কুলে আসতে। মাথায় চুল না থাকার কারণে পিছনে কেউ লাগবে না। এখন বুঝলাম সমাধানটা। স্কুলের সেরা ছাত্রী নিজেই যদি মুণ্ডিতমস্তক হয়, আমার ছেলেকে কে আর রাগাবে..!!"

আমি নির্বাক। দেখলাম আমার সিধুজা, মহাপ্রাণ সিধুজা তার বন্ধুর হাতটি ধরে গেট পেরোল। মাথা থেকে তার পদপ্রান্তে এসে আমার দৃষ্টি ঝাপসা হল।