মায়া - রোজমিন বেগম

22nd May 2020 4:44 pm ছোটগল্প
মায়া - রোজমিন বেগম


ছোটগল্প প্রতিযোগিতা - ১৫

মায়া

রোজমিন বেগম

 

‘খুব খিদে পাচ্ছে ভাই, একটু কিছু খাবার দে, দু দিন না খেয়ে খিদের জ্বালায় মরে যাব’ – কথা গুলো বলতে বলতে অমৃত ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

ইয়াকুব বোতলের জল গলায় ঢেলে নিয়ে বন্ধু অমৃতের কাছে এসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল – ‘কাঁদিস না বন্ধু , আমি দেখছি কোথাও কোন খাবার পাই কি না”। এই বলে ইয়াকুব দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল ।

ইয়াকুব রাস্তায় বেরিয়ে দেখল পুলিশ আছে কিনা । খুব ভালই চলছিল , গুজরাটে একটা কাপড়ের কারখানায় ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছিল তারা । তাদের বাড়ি মধ্য প্রদেশে । ইয়াকুব আর অমৃত এর পরিচয় হয় এই কারখানাতে কাজ করতে গিয়ে । একি জেলায় বাড়ি তাদের । দুজনে একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকে । কাজ করে যা টাকা ইনকাম করে তা তারা বাড়ীতে নিজেদের পরিবারের কাছে পাঠায় । সব ঠিকই চলছিল , কিন্তু করোনা রোগের কারনে সরকার হটাত করে লকডাউন ঘোষণা করে দেয় সারা ভারতে । ফলে তারা আটকে পড়ে । টাকা পয়সা যা ছিল সব শেষ হয়ে যায় । একদিন খাবার পায় তো অন্য দিন না খেয়ে থাকতে হয় তাদের । বাইরে বেরালেই পুলিশ লাঠি নিয়ে খুব পেটায় । এত বড় বিপদে পড়ে যাবে তা কোনদিন ভাবে নি তারা ।

ইয়াকুব হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা এগিয়ে এসেছে । হটাত দেখল কয়েকজন এন জি ও এর লোক পথে বসে থাকা ভিখারিদের খাবারের প্যাকেট দিচ্ছে । ইয়াকুবও সেই ভিখারিদের পাশে গিয়ে বসে পড়ল । কোনদিন যা করে নি তা বন্ধুর জন্য করলো – ভিক্ষা । তার হাতে যখন খাবারের প্যাকেট তুলে দিল তখন ইয়াকুব খাবার নিয়ে দ্রুত রুমের দিকে রওনা দিল । কিন্তু পথে হটাত পুলিশ গাড়ি এসে পড়ল । একজন পুলিশ ইয়াকুবকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো সে রুম থেকে বেরিয়েছে কেন ?

ইয়াকুব বলল খাবারের জন্য । তারপর তার নাম ইয়াকুব জানার পরই পুলিশ বলে উঠল- শালা মুসলমান , এখানে করোনা ছাড়াতে এসেছিস – এই বলে লাঠি দিয়ে জোরে জোরে পিটতে লাগলো । মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে দৌড় দিল ইয়াকুব । তাদের রুমে এসে পৌঁছে দরজা লাগিয়ে দিয়ে হাতে ধরে থাকা রুটি তুলে দিল বন্ধু অমৃত এর হাতে । অমৃত রুটি গুলো নিয়ে দ্রুত খেতে লাগলো । দু দিন না খেয়ে আছে । ইয়াকুব পাশে বসে বন্ধুর খাওয়া দেখছিল ।

রাতে খোঁজ পেল অমৃত - একটা ট্রাক মধ্য প্রদেশ তাদের জেলাতে যাবে । তবে ৪০০০ টাকা করে ভাড়া নেবে । কিন্তু তাদের কাছে তো কোন টাকা নেই । যা ছিল সবই তো শেষ হয়ে গিয়েছে । অমৃত ইয়াকুবকে বলে “বন্ধু আমি বাড়ি যাব , তুই যে কোন একটা ব্যবস্থা কর”।

ইয়াকুব বোনের বিয়ের জন্য সোনার কানের দুল বানিয়েছিল । সেটাই সে ট্রাক মালিককে দিয়ে বলল যে তাদের দুজনকে যেন নিয়ে গিয়ে তাদের বাড়ীতে ছেড়ে দেয় । ট্রাক মালিক রাজি হয়ে গেল । সেই ট্রাকে ৫০ এর মত পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে ট্রাক ছেড়ে দিল । ইয়াকুব ও অমৃত সেই ভিড়ে কোন রকম গাদাগাদি করে দাঁড়িয়েছিল । দু দিন ধরে ট্রাক চলছে । ট্রাকের মধ্যেই কয়েকটা রুটি খেয়ে আছে তারা । রাতের দিকে হটাত ইয়াকুব বন্ধু অমৃতের গায়ে হাত দিয়ে দেখল অনেক জ্বর । সকালের দিকে জ্বর আরও বেড়ে গেল । অমৃত বমি করতে লাগলো ।

ট্রাকের অন্য শ্রমিকরা ট্রাক মালিককে বলল যে – এর মনে হয় করোনা হয়েছে । একে ট্রাক থেকে নামিয়ে দেওয়া হোক ।

তাদের কথা শুনে ইয়াকুব মিনতি করতে লাগলো যাতে তার বন্ধুকে কোন একটা হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দেয় । মাঝ রাস্তায় যেন না নামায় ।

কিন্তু তার কোন কথা না শুনে জোর করে অমৃতকে ট্রাক থেকে নামিয়ে দিল । অসুস্থ বন্ধুকে একা ফেলে কি ভাবে সে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরে যাবে । অমৃতের দিকে চেয়ে খুব মায়া হল ইয়াকুবের । সেও লাফ দিয়ে নেমে পড়লো ট্রাক থেকে ।

ট্রাক চলে গেল । বন্ধু অমৃতের হাত ধরে প্রখর রোদে ইয়াকুব হাই রোড দিয়ে হাঁটতে লাগলো । কিন্তু অসুস্থ অমৃত বেশি দূর হাঁটতে পারলো না । পড়ে গেল মাটিতে । সঙ্গে সঙ্গে ইয়াকুব বন্ধু অমৃতের মাথা নিজের কোলে তুলে নিল । অমৃতের গা জ্বরে যেন পুড়ে যাচ্ছে । ইয়াকুব ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে নিজের রুমাল সেই জলে ভিজিয়ে অমিতের কপালে জলের পট্টি দিতে লাগলো যাতে জ্বর কমে যায় ।
' অমিত খুব কষ্টে দু চোখ মেলে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে বলতে লাগলো - ' বন্ধু আমি মরতে চাই না রে । বাড়ীতে মা আমার জন্য ভাত তরকারি রান্না করে নিয়ে বসে অপেক্ষা করছেন । আমাকে ঘর যেতেই হবে । কতদিন পেট পুরে ভাত খাই নি । আমি বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে ভাত খেতে চাই , আমি মরতে চাই না বন্ধু ...মরতে চাই না ......" ।
ইয়াকুব বন্ধু অমৃতকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে --- " মরতে দেব না তোকে বন্ধু , বাড়ি ফিরবো আমরা "।

  ইয়াকুব রাস্তায় পথ চলতি মানুষের কাছে চিৎকার করে সাহায্য চাইতে লাগলো যাতে করে তার বন্ধুকে কেউ হাসপাতাল পৌঁছে দেয় । কিন্তু কেউ সাহায্য করলো না । অমৃত তার প্রিয় বন্ধু ইয়াকুবের কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো চিরদিনের মত । ইয়াকুব নিজের বন্ধুর নিথর দেহ কোলে নিয়ে রাস্তার পাশে বসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো । তার কান্নার আওয়াজ এ সি রুমে বসে নীতি নির্ধারণকারি নেতা মন্ত্রীরা যারা হিন্দু - মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দাঙ্গা লাগাতে ব্যস্ত - তাদের কানে পৌঁছাবে কি  ?

( গল্পটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা )





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা à§§ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।