মানব দরদী রাজা রামমোহন রায়

22nd May 2020 9:32 am প্রবন্ধ
মানব দরদী রাজা রামমোহন রায়


প্ৰবন্ধ :- "মানব দরদী রাজা রামমোহন রায়"
লেখক :- গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
***
জন্মদিবস উপলক্ষ্যে প্রণাম এবং শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পণ ।
***
স্রেফ প্রচুর ধন সম্পত্তির অধিকারী ধনীব্যক্তি অথবা "রাজা" উপাধীতে বিভূষিত কোন ব্যক্তি নিশ্চয়ই তাঁর সমাজে মান্য রাজা ! হাজার হাজার বছর পূর্বে তখনকার দিনে সেই রাজা রাজত্ব করতেন নির্দিষ্ট পরিসীমার মধ্যে। রাজা , তাঁর নিজস্ব সীমা এবং সীমিত প্রজাদের উপর চলাতেন তাঁর অধিকার , শাসন অথবা তাঁর দ্বারা জারী নিয়ম - কানুন এবং দিশা-নির্দেশ। স্বৈরাচারী তন্ত্র , বাইরে আর কিছু ন​য় ! এমতাবস্থায় উক্ত রাজা নিজের প্রজাদের তো দূর , নিজের রাজত্বের পরিসীমার বাইরের লোকেদের মন জয় করে সকলের মনের রাজা হ​য়ে দেশ বিদেশে শ্রদ্ধার পাত্র হ​য়ে আসল রাজায় পরিনত হতে পারা দুষ্কর ব্যাপার !
কিন্তু ,আজ থেকে ২৪৮ বছর পূর্বে অর্থাৎ (২২/৫/১৭৭২) অখণ্ড ভারতবর্ষের উচ্চকূল জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এক রাজা!। অখণ্ড ভারতবর্ষের ভারতবাসী তথা সমগ্র বিশ্বের মানুষের মন জ​য়ী ,সবার রাজা , রাজা রামমোহন রায়।
যিনি ছিলেন প্রভুত জ্ঞানের অধিকারী , নির্ভিক সমাজ সংস্কারক ,মানব দরদী , প্রচুর ভাষায় অর্থাৎ সংস্কৃত ,বাংলা , ইংরাজী , ঊর্দু , হিন্দী , ফরাসী আদি ভাষাতে অনর্গল পারদর্শী স্বতন্ত্রতা সংগ্রামের পূরধা ভয়মুক্ত সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতার প্রেরক একজন স্বনামধন্য ইতিহাস সাক্ষ্য বহনকারী ব্যক্তিত্ব রাজা রামমোহন রায়।
তৎকালীন ভারতে হাজার হাজার বছর পূর্ব থেকে চলছিল স্বৈরাচারী সমাজে উচ্চ বংশজাতকদের দ্বারা স্বঘোষিত কূলশ্রেষ্ঠ বা ইশ্বরের প্রতিনিধি , ন্যায়দাতা প্রশাসক , রাজা , জমিদার , ব্রাহ্মণকূল ,যাদের হস্তে ন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থা পরিচালনের হাল বা দায়িত্ব। তারাই চালাচ্ছিল স্বহিত সিদ্ধার্থে স্বগঠিত নিয়ম - কানুনের আড়ালে সহজ সরল নিঃষ্পাপ অল্পশিক্ষিত তথাকথিত নীচকূলে জন্মজাত গোষ্ঠীর লোকেদের উপর অত্যাচার। অরাজকাতা ,কুরীতি কুসংস্কারের জালে পরিবেষ্ঠিত সমাজ ব্যাবস্থা। মূক বধীর শাসন বা বিচারের সংরক্ষণে পুষ্ট! নির্মম সমাজ ব্যবস্থাকে মানতে বাধ্য ছিল নিঃশব্দ প্রতিবাদ হীন সমাজের নিন্মস্তরের জনগণ। "সতীদাহ" ! অসহায় অবলা সদ্য বিধবা হওয়া নারীর আর্তনাদে থর্থর করে কেঁপে উঠত ধরতী। যখন সামাজিক কৌলীন্য প্রথার শিকার হওয়া পিতার কূল রক্ষায় এক নিঃষ্পাপ অপরিনত বয়ঃপ্রাপ্ত কণ্যাকে নির্মমভাবে সতী হয়ে দাহ হতে বাধ্য করা হত তার প্রৌঢ পরলোকগতি প্রাপ্ত স্বামীর সঙ্গে একই জ্বলন্ত চিতায় জীবন্ত প্রবেশ করিয়ে সহমরণে ! পরলোকের পথে সহগামী হতে! সমাজ কর্তার স্থীর নির্দেশ ! বিধবার স্বেচ্ছাগমন নচেৎ বংশদণ্ডের নির্মম প্রহার! ! সমাজে ঝরে পরতে লাগল অসম​য়ে শুখিয়ে যাওয়া নবপল্লবিত কোমল পুষ্পগুচ্ছ ! অন্ধ - মূক সমাজ ব্যবস্থা!য় নিষ্ঠুর ন্যায়ের পরিহাস।
নির্মম ক্রন্দনের গুঞ্জনে ব্যথিত হ​য়ে কেঁদে উঠল এক মানব দরদী নির্ভিক কোমল মন। সেই মনের অধিকারী হলেন রাজা রামমোহন রায়। স্থীর প্রতিজ্ঞ হলেন , বিশ্ব থেকে নির্মূল করাতে হবে এরকমের সামাজিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন নির্মম প্রথাকে। জাগাতে হবে সামাজিক চৈতন্যকে , প্রতিষ্ঠিত করাতে হবে নির্ভিক ন্যায়কে। চালু করলেন অভিযান। এদিকে তৎকালীন কুসংস্কারাছন্ন সমাজ ব্যবস্থায় শুরু হল ওনার বিরুদ্ধে সামাজিক বিরোধিতা ,আবহমান কাল থেকে প্রচলিত প্রথাকে পরিবর্তন করা অসম্ভব! ঘোর নাস্তিকতা ! সমাজের সাথে সাথে ওনার পরিবার সংযুক্তভাবে করল ওনাকে সামাজিক বহিষ্কার এবং নতুন পরিচয়ে পরিচিত করল রামমোহনকে " কালা পাহাড় " নামে। কি সাংঘাতিক অপমান !
কুরীতি এবং কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ধর্মে বিতরাগী এবং সমাজের ব্যবহারে অভিমানী রাজা রামমোহন রায়। সমাজে জাত-পাত ,উচ্চ- নীচ প্রথা বা জাতিবাদের কুরীতির ,কুসংস্কারের জালে বন্দি নিরীহ অপমানিত মানুষ বিশেষতঃ নারী জাতি , যারা সামাজিক কুসংস্কারের দাপটে বঞ্চিত মুক্ত মানবাধিকার থেকে। মানব জাতির ঘোর অপমান থেকে রক্ষা করার জন্য প্রতিষ্ঠা করলেন " ব্রাহ্ম সমাজের "। যেখানে ধর্মের গোরামী থেকে মানুষের মর্যাদা বেশী প্রাধান্য পায় , সবাই সমান। প্রত্যেকের সমাজে সমানাধিকার !
শুরুহল কুরীতির এবং কুপ্রথার বিরুদ্ধে অভিযান। ইংরেজ শাসন থেকে আইন পাস করিয়ে বন্ধ করালেন নির্মম অমানুষিক প্রচলিত "সতীদাহ" প্রথাকে। রক্ষা করলেন তৎকালীন অবলা দুর্বল নারী জাতীকে। দিলেন সসম্মানে বিশ্বে বাঁচার অধিকার।
স্বতন্ত্রতা ছাড়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখর হওয়া সম্ভব না। সংবাদপত্রই একমাত্র মুখর হবার মাধ্যম। একে শক্তিশালী করার জন্য স্থাপনা করলেন "প্রেস" । হিন্দী ভাষা ছিল ওনার প্রিয় ভাষা গুলির মধ্যে অন্যতম।
আজকে দেবপ্রতীম মানবদরদী , অবহেলিত মানুষের বিশেষতঃ নারীসম্মান প্রদাতা ,নব ভারতের কল্পনাকার ,কুসংস্কার মুক্ত ধর্মপুনর্জাগরণের প্রেরক দেশপ্রেমে সমর্পিত মুক্তপ্রাণ রাজা রামমোহন রায়ের জন্মদিবসে ওনাকে স্মরণ করে এবং ওনাকে এই ক্ষুদ্র শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পণ করে প্রণাম করতে পেরে নিজেকে ধন্য অনুভব করছি ।
আপনাদের সবাইকে জানাই আমার আন্তরিক অভিনন্দন ।





Others News

লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক

লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক


প্রবন্ধ :-  "লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক" 
লেখক :-  ডঃ .গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
                         ***
     "জন্মদিন উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ "
                             * 
   " স্বরাজ আমার জন্মসিদ্ধ অধিকার, যেটা আমি নিয়েই ছাড়ব।"  পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সিংহের রাজত্বকালে সর্বপ্রথম গর্জে উঠেছিলেন এক নির্ভিক ভারতীয় সিংহ,যিনি একাধারে বিদ্বান, অর্থলোভমুক্ত, ত্যাগী, সমাজ সংস্কারক, সাংবাদিক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী, হিন্দু রাষ্ট্রবাদের জনক, লোকসেবক শক্তিমান পুরুষ, যাঁকে সর্বলোকে সম্মানের সঙ্গে  "লোকমান্য" বলে সম্বোধন করে, তিনি হলেন বাল গঙ্গাধর তিলক (আসল নাম কেশব গঙ্গাধর তিলক, বিবাহের পরে ওনার স্ত্রীর বংশানুসারে " কেশব গঙ্গাধর "  নামের পরিবর্তিত হয়ে "বাল গঙ্গাধর তিলক" নামে পরিচিত হলেন)। মহারাষ্ট্রের  চিক্কন গ্রামে ২৩/০৭/১৮৫৬  সালে ওনার জন্ম হয় এবং ০১/০৮/১৯২০ সালে বোম্বাই এ বর্তমানে ( মুম্বাই) ওনার দেহত্যাগ হয়।  
        ডীকান কলেজ থেকে বি.এ.পাস করার পরে উনি গভর্নমেন্ট " ল " কলেজ ( ইউনিভার্সিটী অফ বোম্বাই (মুম্বাই) থেকে  "ল" পাস করেন, কিন্তু, অর্থ লোভমুক্ত বাল গঙ্গাধর তিলক, যিনি , নিজেকে সমাজ  কল্যাণে সমর্পিত করেছেন, তিনি " ল " পাস করেও আদালতে ওকালতি না করে শিক্ষার প্ৰসারের জন্য স্কুলে শিক্ষকের চাকুরীতে যোগ দিলেন এবং ১৮৮০ সালে স্থাপনা করলেন " ন্যু ইংলীশ স্কুলের" । কিছু বছর পরে স্থাপনা করলেন    " ফারগুইজন " কলেজের। বিদ্বান, ত্যাগী,  সরল,  নিঃস্বার্থ পরোপকারে এবং সমাজের কল্যাণ সাধনে সমর্পিত নিরলস নির্ভিক স্বাধীনতা সংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলক মহাশয়কে মহারাষ্টের লোকে সম্মানের সঙ্গে  "লোকমান্য" নামে সম্বোধন করতে আরম্ভ করল। সেই থেকে উনি "লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক" নামে ভারতে তথা  বিশ্বে পরিচিত হলেন। অসাধারণ সাংগঠনিক কর্মদক্ষতা ছিল লোকমান্যের! স্বাধীনতার জন্য চলছে আন্দোলন কে তীব্র করার জন্য জনমত এবং  জনচেতনাকে জাগিয়ে তুলে সংবাদ আদান প্রদানের পথ সুগম করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রচলিত করেছিলেন " গনেশ উৎসব" এর । 
  ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র জনান্দোলন এবং আলোচনা করার জন্য ইংরেজ সরকার ওনার উপর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ লাগিয়ে ৬ বছরের জন্য দেশের বাইরে করার আদেশ দিয়ে বর্মার মান্ডালে জেলে পাঠিয়ে দিল,  কিন্তু, কর্মতৎপর লোকমান্য তিলক মহাশয় জেলে বন্দী অবস্থায় রচনা করেছিলেন " গীতা রহস্য " এর। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে যখন উনি "গীতা রহস্য" এর প্রকাশণ করেছিলেন তখন ভীষণ জন আলোরণ তৈরী হয় সম্পূর্ণ দেশে। 
     à¦¨à¦¿à¦°à§à¦­à¦¿à¦• সাংবাদিক লোকমান্য তিলক দুটি সংবাদ পত্রের প্রকাশণ করেছিলেন - একটি ইংরাজীতে       " মারাঠা"  নামে এবং অপরটি মারাঠী ভাষায় "দৈনিক কেশরী" নামে। প্রকাশিত সংবাদপত্র গুলির মাধ্যমে লোকমান্য তীব্রভাবে ইংরেজ শাসনের নিন্দা এবং সমালোচনা শুরু করেছিলেন, যার জন্য ওনাকে প্রায়ই জেলে যেতে হত। স্বায়ত্ব বা সুশাসনের দাবী তুলে আন্দোলন চালিয়ে ১৯১৬ - à§§à§® সালে  গঠণ করলেন "অল ইন্ডিয়া রূল লীগের"। ক্রান্তিকারী আন্দোলনের সমর্থক তিলক সম্পূর্ণভাবে গান্ধীজীর অসহযোগ অন্দোলনকে মেনে নিতে পারেননি। লালা লাজপত রায়, বিপিন চন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ, এনী বসন্ত, মহম্মদ আলী জীন্নাহ  ইত্যাদি মহান ব্যাক্তিত্বের সংযুক্ত আন্দোলনে বিচলিত হয়েছিল ইংরেজ প্রশাসন। সম্পূর্ণ ভারতে তখনকার দিনের একটা বহুল প্রচলিত শ্লোগান ছিল "লাল বাল পাল "। বিখ্যাত তিন মহান ব্যাক্তিত্ব !
  ভারত মায়ের মহান সন্তান লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক। ওনার নাম আজ ও স্বাধীন ভারতবাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে । 
  লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক মহাশয়ের শ্রীচরনে জানাই আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ।