বেকার শিক্ষক - তারিফ আলম

19th May 2020 7:27 pm তারিফ আলম
বেকার শিক্ষক - তারিফ আলম


বেকার শিক্ষক

লেখা - তারিফ আলম

 

স্কুল থেকে ছেলেকে নিয়ে আসার জন্য বাইকটা নিয়ে বেরিয়েছে তপন মণ্ডল । এমন সময় পিছন থেকে বউ অনিতা ছুটে এসে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলল – “ বাড়ীতে আনাজ কিছুই নেই , ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে ফেরার পথে সবজি বাজার করে নিয়ে এসো “।
ছেলে অনুপ ক্লাস ফোর এ পড়ে সেন্ট মেরি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে । মর্নিং স্কুল , এখন ছুটি হয়ে যাবে । তাই আর দেরি না করে তপন দ্রুত বাইক চালিয়ে ছেলের স্কুলে এসে পৌঁছল । ছেলে অনুপ আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল গেটের কাছে । ছেলেকে বাইকে চাপিয়ে ফেরার পথে সবজি বাজারে দাঁড়াল সবজি কেনার জন্য । তপন খুব হিসেবি । দোকানি যদি কুড়ি টাকা কেজি কোন সবজির দাম বলে তখন তপন বলবে ১০ টাকা । তারপর দর কষাকষি করে ১৫ টাকায় দিতে বাধ্য করবে । আজও তাই করছিল বেগুন এর দাম নিয়ে এক সবজি বালার সাথে । এমন সময় তপনের পিছনে একজন লোক এসে পিঠে হাত দিয়ে বলল “ আরে তপনা না , কিরে কেমন আছিস । তুই তো প্রাইমারীতে মাস্টারের চাকরিটা পেয়ে একদম গ্রামের কথা ভুলে গিয়েছিস “।
তপন পিছনে ফিরে দেখল তাদের আসন্দা গ্রামের খালেদ চাচা ।
‘ ভালো আছি চাচা , তুমি কেমন আছ “?
“ ভালো নেই রে ভাই , ডাক্তার দেখাতে এসেছি এখানে “।
“তা এ বাচ্চাটা কে”? অনুপকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলো খালেদ চাচা ।
“ আমার ছেলে , ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে , ওর স্কুল ছুটি হতে ওকে নিয়ে এলাম স্কুল থেকে । বাড়ীতে সবজি নেই , তাই বাজারটা করে বাড়ী ফিরবো “।
চাচা তপনের কথা শুনে ভ্রু কুচকে বলল – “ তুই তো প্রাইমারী স্কুল এর শিক্ষক , তোর বাড়ীর পাশেই তো স্কুল । তাকে তোর স্কুলে ভর্তি না করে এত দূরে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছিস কেন “?
“ চাচা , প্রাইমারী স্কুলে পড়াশুনা হয় নাকি , সেখানে ঐ গরীবের ছেলে –মেয়ে গুলো মিড ডে মিল খাওয়ার জন্য আসে । পড়াশুনার জন্য নয় । তারা বাড়ী ফিরলে তাদের মা- বাবারা জিজ্ঞাসা করে না স্কুলে মাস্টার কি পড়াল । জিজ্ঞাসা করে আজ মিড ডে মিল এ ডিম ছিল কি না “।
খালেদ চাচা এবার একটু বিরক্তির সুরে বললেন – “ এই ভাবে যদি পড়াশুনা হয় তাহলে আন্দোলন কেন করছিলি বেতন বাড়ানোর জন্য । এখন বেতন তো বেড়ে গিয়েছে । একটু ভালো করে পড়ানোর চেষ্টা কর “।

চাচার কথা শুনে তপন খুব বিব্রত হয়ে পড়লো । সবজি না কিনেই ছেলেকে বাইকে চাপিয়ে বাড়ীর দিকে রওনা দিল ।
বাড়ী ফিরে স্নান সেরে স্কুলে যখন গেল তখন ১২ টা বেজে গিয়েছে । বাচ্চারা চেঁচামেচি করছিল । রিনা ম্যাডাম একটা ক্লাসে ছেলেদের অ আ ই ঈ – সুর করে পড়াচ্ছিলেন । তপন উঁকি মেরে দেখে অফিস রুমে গিয়ে বসলো । আর একজন শিক্ষক আজ আসেন নি । তবে কোন সমস্যা নেই । পালা করে এক একজন আসেন না স্কুলে ।
কেউ কোন খবর নেয় না । শুধু মিড ডে মিল ঠিকমত বাচ্চারা পাচ্ছে কিনা - তা গ্রাম পঞ্চায়েত এর সদস্যরা এসে মাঝে মাঝে খবর নিয়ে যান ।
বিকাল তিন টায় স্কুলে ছুটি করে দিয়ে তপন যখন বাড়ী ফিরল তখন দেখল টিউশন মাস্টার রঞ্জিত তার ছেলেকে পড়াচ্ছে । তপন রঞ্জিতকে বলল – “ কালকে টিউশন পড়াতে আসা হয় নি কেন “?
রঞ্জিত খুব ধীর গলায় বলে – “ আমার একটা চাকরির পরীক্ষা ছিল । সেটা দিতে গিয়েছিলাম , তাই আসতে পারি নি “।
তপন এবার একটু রাগত স্বরে বলল – “ ও সব চলবে না , কামাই করলে টাকা কেটে নেব এবারে “। ছেলের নাম্বার টা এবারে ২% কমে গেল কেন । আগের পরীক্ষায় ৮৭% আর এ বারে পেয়েছে ৮৫% । এর জন্য কে দায়ী “?
রঞ্জিত মাথা নত করে বলল – “ আমিই দায়ী , আপনি যদি ৫০০ এর যায়গায় আর একটু বেশি বেতন দেন তাহলে আপনার ছেলেকে সপ্তাহে ৪ দিনের বদলে ৫ দিন করে পড়াতে আসতাম। তাহলে আর একটু গাইড বেশি দেওয়া হতো “।
এবারে তপন খুব রেগে গিয়ে বলল “ তোমার মতো বেকার শিক্ষক অনেক আছে টিউশন পড়ানোর জন্য । তোমাকে কাল থেকে আর পড়াতে আসতে হবে না , তুমি এখন যেতে পারো “।
কথা গুলো শুনে রঞ্জিত চুপ করে চেয়ে থাকলো তপনের পানে । চোখ গুলো ছল ছল করছিল , মুখ দিয়ে কিছু বলতে চাইছিল – হয়তো কাজ টা না ছাড়ার কথা । কিন্তু কিছু বলতে পারলো না । মাথা নত করে সাইকেল টা নিয়ে চুপচাপ চলে গেল ।
বউ অনিতা এসে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলল – “ ছেলেটাকে তাড়িয়ে দিলে । এম এ , বি এড পাশ ছেলে ছিল । অনেক ভালো করে তো পড়াত টিউশন । তোমার ছেলেই তো পড়তে চায় না , রেজাল্ট ভালো হবে কি করে । আর ১০০ টাকা না হয় বেতনটা বাড়িয়ে দিতে পারতে । নিজে তো টুয়েলভ পাশ , ভালো করে ইংরেজিটাও তো জানো না । নিজের ছেলেকে পড়াবে কি করে “?
“ সে তোমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না , অনেক বেকার শিক্ষক চারিদিকে একটা টিউশন এর জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে । এমন এম এ , বি এড পাশ টিউশন শিক্ষকের অভাব নেই , একটা গেলে আর একটা চলে আসবে “।
সেই সময় স্বামীর উপরে রাগ করলেও তারপর দিন স্বামীর কথাই সত্যি হল । বিকালে এল একটা নতুন টিউশন টিচার । এও এম এ ,বি এড পাশ করা । সেই ৫০০ টাকাতেই পড়াবে সপ্তাহে ৫ দিন । সত্যিই এরা ‘বেকার শিক্ষক’।





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?