একটি শিক্ষামূলক গল্প - সিগারেট

19th May 2020 6:34 pm শিক্ষামূলক গল্প
একটি শিক্ষামূলক গল্প - সিগারেট


তখন আমি বারো ক্লাসে। সবে বাঁধা গরু ছাড়া পেতে শুরু করেছি। পড়ার চাপের পাশাপাশি বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে হঠাৎ বড় হয়ে যাবার একটা অদম্য ইচ্ছা। ব্যবা কোনদিন মারতেন না, খুব জোর গলায় বকতেন এমনও মনে পড়ে না। তবে তাঁর শাসনে ছিল বুদ্ধিমত্তার ছাপ। তাঁকে ভয় করতাম।

বাবা সিগারেট খেতেন। সিগারেটের গন্ধটা আমার খুব ভাল লাগত। বাবার সিগারেটে টান দেওয়া, রিং করে ধোঁয়া ছাড়া, ঠোঁটের কোণে সিগারেট নিয়ে কাগজ পড়া এই সব মিলে বাবাকে খুব ম্যানলি লাগত। তাই কলেজে বন্ধুরা যখন সিগারেট অফার করল, তখন নিজের শরীরেও একটা পৌরুষ ফুটিয়ে তোলার স্বপ্নে, না বলতে ইচ্ছে হয়নি । একটা দুটো করে সিগারেটে টান দিতে শুরু করলাম। আর শুরু করলাম রাত্রে বাবা ঘুমিয়ে পড়লে, বাবার সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট চুরি করতে। একটা, দুটো করতে করতে মাঝে মাঝে তিন চারটেও হয়ে যাচ্ছিল। গভীর রাত্রে পাড়া নিশুতি হয়ে গেলে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই সিগারেটে সুখটান দেবার মধ্যে কি যে একটা মাদকতা ছিল, ছিল একটা টানটান উত্তেজনা।

সেদিন ও রাত্রে বাবা ঘুমিয়ে পড়লে তার ঘরে পা টিপে টিপে ঢুকে সিগারেটের প্যাকেট টা আস্তে করে নিয়ে নিজের ঘরে এলাম। প্যাকেট টা খুললাম রোজকার অভ্যাসমত। কিন্তু সিগারেট বার করতে গিয়ে একটা কাগজ দেখলাম ভাঁজ করে গোঁজা আছে। বার করলাম। দেখলাম তাতে লেখা আছে......
১) সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক।।
২) তবুও যদি একান্ত খেতেই হয়, তা নিজের উপার্জনেই খাওয়া উচিৎ।
৩) প্যাকেটে সাত টা সিগারেট আছে।

কাগজ টা আবার ভাঁজ করে যেমন ছিল সেভাবেই প্যাকেটে রেখে দিলাম। সিগারেট আর বার করা হয়নি। লেখা শব্দগুলো শব্দভেদী বাণের মত বুকে গিয়ে এমনভাবে বিঁধেছিল যে সারা জীবনের মত বেকার অবস্থায় অন্যের পয়সায় সিগারেটে সুখটান দেবার সুখকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলাম।

এর প্রায় ৪০ বছর পর, আমি এখন স্কুলে পড়া এক ছেলের বাবা। আমি নিজের পয়সায় করা সিগারেটের নেশাটা ছাড়ব ছাড়ব করেও ছেড়ে উঠতে পারছিনা। তবে ছেলে বড় হয়েছে বলে বাড়িতে কম খাই। আমার জামার বুকপকেটে বা অফিস ব্যাগে সিগারেটের প্যাকেট লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করি।

একদিন লক্ষ্য করলাম, আমার প্যাকেট থেকে সিগারেট চুরি হচ্ছে। তবে এ চোর নয়, ডাকাত, একটা রেখে সব সিগারেট গুলোই হাওয়া করে দিচ্ছে। কিন্তু কিছু বলতেও পারছিনা। কি বলব.? ছেলে বড় হয়েছে। অনেক ভেবে আমার বাবা'র সেই পদ্ধতির প্রয়োগ করলাম। একটা কাগজে বাবার দেওয়া তিনটে পয়েন্টেই একটু এদিক ওদিক করে লিখে কাগজ টা ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রাখলাম। লিখলাম,

১) টিভি সিনেমায় বিজ্ঞাপনে হরদম দেখাচ্ছে সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক, সেটা কি চোখে পড়েনা.?
২) তবুও বলি যদি একান্ত খেতেই হয়, তা নিজের উপার্জনেই খাওয়া উচিৎ।
৩) সব সিগারেট নিয়ে একটা রাখার কি মানে বুঝলাম না। প্যাকেটে পাঁচটা সিগারেট আছে।

পরেরদিন একটু আগেই ঘুম ভাঙল, ছুটে গিয়ে প্যাকেট টা খুললাম, আমার ওষুধে কতটা কাজ হয়েছে দেখার জন্য।
দেখলাম সব কটা সিগারেট অক্ষত আছে, সাথে আছে ভাঁজ করা একটা কাগজ...

১) সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক তা তো সবার চোখেই পড়ে। তবু জেনেও যে সেই বিষ নিয়মিত খায়, তার কতটা উচিৎ অন্য কাউকে শেখানো.?
২) নিজের পয়সা বলে কি বিষ কিনে খাওয়া যায়.? আর সেই আত্মহত্যার সাথে যদি অন্যের জীবনের ভালমন্দ জড়িত থাকে, তার কি সেটা করা উচিৎ.? তোমার কিছু হলে আমাদের কি হবে.?
৩) আমি সিগারেট খাইনা। আমি সিগারেট গুলো নষ্ট করে ফেলতাম। একটা ছাড় দিতাম রোজ ভোরবেলায় এক বিশেষ কাজে লাগে বলে। আর তা করতাম আমার বাবার ঐটুকু ক্ষতি অন্তত কমানোর জন্য। আজ সব গুলোই ফেরত দিলাম, তাঁর শুভবুদ্ধির অপেক্ষায়...!





Others News

অন্ধ ঘোড়া

অন্ধ ঘোড়া


এক লোকের দুটি ঘোড়া ছিল। দূর থেকে দেখতে ঘোড়া দুটিকে প্রায় একই রকম লাগতো।

কিন্তু কেউ যদি ভাল মত দেখে তাহলে বুঝবে যে দুটি ঘোড়ার মধ্যে একটি ছিলো অন্ধ।

তাদের মালিক অনেক ভালো ছিলো। তাই সে অন্ধ ঘোড়াটিকেও অন্য ঘোড়াটির মতই যত্ন করতো। আস্তাবলে দুটি ঘোড়ার জন্যই আরামদায়ক শোয়ার যায়গার ব্যবস্থা করেছিলো সে। সকাল বেলা দুটি ঘোড়াই সামনের মাঠে ঘাস খেতে চলে যেত।

ঘোড়াদুটি যখন মাঠে ঘুরে বেড়ায় তখন কেউ যদি কান পেতে রাখে তবে সে একটা মৃদু ঘন্টার শব্দ শুনতে পাবে। এই ছোট্ট ঘন্টাটি সুস্থ ঘোড়ার গলায় বাধা ছিলো। ঘন্টার শব্দ অন্ধ ঘোড়াটিকে বুঝতে সাহায্য করতো যে তার সঙ্গী কোথায় রয়েছে।

কেউ যদি মাঠের পাশে দাঁড়ায় তাহলে সে দেখতে পাবে যে সুস্থ ঘোড়াটি সব সময় অন্ধ ঘোড়াটিকে চোখে চোখে রাখছে যাতে সে হারিয়ে না যায়, অন্ধ ঘোড়াটিও মাঝে মাঝে কান খাড়া করে ঘন্টার শব্দ শুনছে এবং ধীরে ধীরে অপর ঘোড়াটির কাছে হেঁটে যাচ্ছে। তার মনে সবসময় এই বিশ্বাস যে তার বন্ধু তাকে কখনো ভুল পথে নিয়ে যাবে না।

সন্ধ্যায় যখন ঘন্টা বাধা ঘোড়াটি যখন বাড়িতে ফিরে আসতে থাকে তখন সে বার বার পেছনে ঘুরে তাকায়, এটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে, সে যেন খুব দূরে চলে না যায় যাতে অন্ধ ঘোড়াটি ঘন্টার শব্দ শুনতে না পারে। এভাবে তারা নিরাপদে বাড়িতে ফিরে আসে।

****ঠিক এই অন্ধ ঘোড়াটির মত যদি আমরা নিখুত না হই অথবা আমদের কোন শারিরীক বা মানসিক সমস্যা থাকে তাহলে সৃষ্টিকর্তা আমাদের কখনোই একা ছেড়ে দেন না।

তিনি আমাদের উপর সবসময় নজর রাখেন এবং আমাদের জীবনে এমন কাউকে পাঠান যাদের সাহায্যের আমাদের প্রয়োজন হয়।

কখনো আমরা সেই অন্ধ ঘোড়াটির মত, যার জীবনে সৃষ্টিকর্তা আরেকজনকে পাঠিয়ে দেন সাহায্যের জন্য। আবার কখনো আমরাই সেই ঘন্টাওয়ালা ঘোড়াটি, যে অন্য কাউকে পথ খুজে পেতে সাহায্য করে।