প্রবঞ্চক - রাফিয়া সুলতানা

18th May 2020 10:59 am ছোটগল্প
 প্রবঞ্চক -  রাফিয়া সুলতানা


ছোটগল্প প্রতিযোগিতা - ১৩

* প্রবঞ্চক *
লেখা--- রাফিয়া সুলতানা
 

পাড়ার সবচেয়ে ধনী পরিবার, মুকুন্দবাবুর বাড়িতে ঠিকেয় কাজ করতো, চৌদ্দ বছরের ময়না। মিষ্টি চেহারার মতই মিষ্টি ছিলো তার স্বভাব। গৃহকর্মের সব কাজেই ছিলো সে সিদ্ধহস্ত। প্রতিটি কাজেই যেন ছিলো তার সযত্ন হাতের পটুত্বের ছাপ। মুকুন্দবাবুর একমাত্র ছেলে আনন্দ তখন থার্ডইয়ার ডিগ্রীকোর্সের ছাত্র। দাদাবাবু বলতে ময়না যেন অজ্ঞান!বোধহয় তা উঠতি বয়সের ধর্মের কারণেই। কর্তাবাবু ও গিন্নিমার মতই তার সেবা যত্নেরও এতটুকু ত্রুটি হতে দিতো না ময়না। দাদাবাবুর বইয়ের শেল্ফ গুছিয়ে রাখা, পরিপাটি করে- টিফিন সাজিয়ে দেওয়া, জামাকাপড় কেচে পরিস্কার ক'রে আইরন ক'রে ওয়েরড্রবে তুলে রাখা, ইত্যাদি যাবতীয় কাজকর্ম করতো খুবই দরদের সঙ্গে। দেখতে দেখতে কবে যেন সে ঐ বাড়িরই একজন সদস্যা হয়ে উঠেছিলো,সে নিজেও বোধহয় টের পায়নি!

মুকুন্দবাবু একবার সস্ত্রীক গয়া গেলেন তীর্থ করতে,ময়নাকে সংসারের সব খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিয়ে। বেশ ভালোই চলছিলো সব। এরমধ্যে একদিন আবার আনন্দ হঠাৎ ভীষণ রকম ভাবে ভাইরাল ফিভারে আক্রান্ত হলো। । স্বভাবতঃই তাকে সামলানোর সব দায়িত্বই গিয়ে বর্তালো ময়নার একার ঘাড়ে। ডাক্তার ডাকা, ওষুধপথ্য খাওয়ানো সবকিছুই করতে হলো তাকে। ময়নার একনিষ্ঠ সেবাযত্ন আকৃষ্ট করে আনন্দের হৃদয়, ফলে আস্তে আস্তে তারা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। মাস খানেক পরে কর্তাগিন্নী যখন ফিরে এসে দেখেন, সবকিছু একদম ঠিকঠাক আছে তখন তাঁরা যারপরনাই আশ্বস্ত হলেন। কিন্তু লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রকৃতি যে তার খেলাটুকু কখন সেরে রেখেছে, সে কথার একবিন্দুও তখনও তাঁরা টেরই পাননি।

মাসখানেক পর, একদিন যখন ময়নার বাড়ির লোক জানতে পারে,যে বাবুদের ছেলের কারণে তাদের মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা ,তখন তারা তা জানাতে আসে গৃহকর্ত্রী রত্নাদেবীকে। তিনি তখন সব শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। তাদের যারপরনাই অপমান করে দূর দূর বলে, তাড়িয়ে দেন বাড়ি থেকে। ময়নার কাজটুকুও খোয়া যায় যথারীতি। এবং শুধু তাই নয়, এই বলেও শাসানো হয় তাদের, ময়নাকে যেন এরপর থেকে এই এলাকার ত্রিসীমানায় দেখা না যায়! ফলে, ময়নার তখন ঠাঁই হলো গিয়ে তাদের গ্রামের বাড়িতে, তার বিপত্নীক ও নিঃসন্তান - একমাত্র মামার কাছে।

দশবছর পর মামার মৃত্যুতে সে আবার তার নয় বছরের মেয়ে টুকটুকিকে নিয়ে ফিরে আসে নিজের বাবার শহরে। সেখানে এসে সে একটি নার্সিংহোমে আয়ার কাজ নেয়।

পাড়ার লোকেদের কানাঘুষোতে টুকটুকি যখন জানতে পারে, পাড়ার বাবুদের ছেলে,পাঁচ বছরের ফুটফুটে বাবন তারই ভাই,এবং তার বাবা আনন্দবাবু তারও বাবা, তখন তার কিশোরী মন কিছুতেই যেন বুঝে ওঠে না, কেন সে তার বাবার স্নেহ-আদর থেকে বঞ্চিত? তাই সে, প্রতিদিন টেরিবাগানো স্যুটবুট পরিহিত , প্রাইভেট গাড়িতে চড়ে অফিসগামী তার বাবার যাতায়তের পথে, পিতৃস্নেহ কাতর দৃষ্টিতে, তাকিয়ে থাকে রোজ একভাবে, রাস্তার ধারের লাইট পোষ্টটার আড়ালে!আর তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে, যখন বাবন আর তার মা রোজ গেটের বাইরে আসে তাকে সি-অফ করতে।

একদিন বিকেলে, যখন বাড়ির সামনের পাকা রাস্তায় বাবন তার লাল টুকটুকে ট্রাইসাইকেলটা নিয়ে চক্কর দিচ্ছিলো, অদূরেই লোভাতুর দৃষ্টিতে, সেই দিকেই তাকিয়ে ছিলো টুকটুকি। তারও খুব শখ হচ্ছিলো এমন একটা লাল সাইকেল নিয়ে চালাতে!আর মনে মনে ভাবছিলো, যদি তা পারতো, কি মজা হতো তাহলে! এদিকে, এই ভাবে চালাতে চালাতে একসময় টাল সামলাতে না পেরে হঠাৎ হুড়মুড় করে বাবন যখন সাইকেল নিয়ে পড়ে গিয়েছিলো রাস্তার উপরে, টুকটুকি তখন দৌড়ে গিয়ে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার কাটাছড়া হাঁটুতে তুলোয় ক'রে,যত্নসহকারে লাগিয়ে দেয় অ্যান্টিসেপটিক লোসন তার মা ময়নারই ফাস্টএডের বাক্স থেকে । তারপর তাকে পাঁজা কোলা ক'রে কোলে তুলে নিয়ে পৌঁছাতে আসে তার বাড়ির গেটের দিকে । এমন সময় চারচাকা ক'রে তাদের বাড়ির সামনে এসে হাজির হয় আনন্দ ও তার স্ত্রী গায়ত্রী। বোধহয় তারা একসঙ্গে মার্কেটিং এ গিয়েছিলো। তারা তো তাদের দুজনকে এভাবে একসাথে আসতে দেখে রাগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো ! গায়ত্রী বাবনকে টুকটুকির কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে খেঁকিয়ে ওঠে এই বলে,
"কেন হাত দিয়েছো ওর গায়ে ?"
আর তারপর ক্রমাগত রাগে গজগজ করতে থাকে। আনন্দ তাদের দারোয়ানকে ডেকে, চিৎকার ক'রে বকতে থাকে
"কোথায় থাকো তোমরা? কেন মিশতে দাও বাবনকে এইসব ছোটলোকদের সঙ্গে? আর যদি কোনদিন দেখি, দূর করে দেবো সব্বাইকে ! যত্তসব ইতর ছোটলোকের দল !"
তার মায়ের মুখ টিপে ধরে অভিযোগের সুরে তৎক্ষনাৎ বলে ওঠে বাবন,
"তোমরা বকছো কেন দিদিটাকে! কত্ত ভালো ও ! আমাকে ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছে। ডাকো ওকে! ও দিদি! ও দিদি !এসো এদিকে! চলে যেও না! "
চোখ কটমট ক'রে, কড়াং ক'রে তাকে একটা ধমক দিয়ে চটপট অন্দরে প্রবেশ করে গায়ত্রী।

এদিকে, তাদের এই রুঢ় ব্যবহারে হতভম্ব হয়ে যায় টুকটুকি। ততক্ষণে তার মা কাজ থেকে ফিরে এসেছিলো। সে অদূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলো এতক্ষণ। আনন্দের কথাগুলো যেন তীক্ষ্ণ শেলের মত বিঁধলো গিয়ে তার বুকে! ওরা ফিরে গেলে, সে এবার কাছে গিয়ে টুকটুকিকে হাত ধরে টেনে বাড়ি নিয়ে যেতে বলতে থাকে,
"কেন যাস মা ওদের কাছে? যতসব ঠগ, প্রবঞ্চকের দল! "
কাঁদো কাঁদো স্বরে অবুঝভাবে প্রশ্ন করে টুকটুকি, "কেন মা ওরা এমন করলো আমার সাথে ? কি দোষ আমার ? "
"আমরা যে গরিব মা! এটাই আমাদের দোষ!" ময়না আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে উত্তর দেয় তাকে।

কি জানি কত প্রবঞ্চকরা এভাবে সমাজের বুকে দর্পভরে ,বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, আর এই সব ময়না ও টুকটুকি আজীবন বেঁচে থাকে তাদের প্রবঞ্চনার শিকার ও ছোটলোক হয়ে!





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা à§§ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।