কৃত্রিম ভালোবাসা - আজিজুল ইসলাম

16th May 2020 8:50 am ছোটগল্প
কৃত্রিম ভালোবাসা - আজিজুল ইসলাম


ছোটগল্প প্রতিযোগিতা - ১১

কৃত্রিম ভালোবাসা

লেখা - আজিজুল ইসলাম

শরীরটা কোনদিনই খুব সবল ছিল না কিন্তু মনের জোর ছিল সাংঘাতিক। তবে আজ সেই মনের জোরটাই শেষ হয়ে গেছে অনীকের।না অনীক মেঘাকে বিয়ে করে কোন ভূল করেনি সে তাকে বিশ্বাস করেছিল যার মূল্য মেঘা কখনো দিতে পারেনি। খুব ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়ে অনীক মা দিদির কাছে মানুষ হয়েছে। ওরা খুব কষ্ট করে অনীক কে লেখাপড়া শিখিয়ে বড়ো করেছে। অনীক পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল কিন্তু যখন সে ডিগ্রি অর্জন করতে গ্রাম থেকে শহরে চলে এলো তখন থেকেই একটু একটু করে বদলে গেল। তবে তার বদলটা চরিত্রের ছিল না ছিল অবাধ বিচরণ ছিল ধনী গরীব নির্বিশেষে মেলামেশা যেটা সে এতোকাল করতে পারিনি। অনীক কে সবাই খুব পছন্দ করতো সে শুধু পড়াশোনায় ভালো ছিল বলে না তাঁর একটা খুব সুন্দর মন ছিল। সে সবসময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতো। ওকে দেখে মনে হতো ওই অসহায় মানুষ গুলো যেন অনীকের খুব আপন খুব কাছের কারণ অনীক অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে না পারলেও তার হৃদয় ভেজানো কথা দিয়ে মানুষ গুলোর মুখে হাসি ফোটাতে পারতো। একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল ওর মধ্যে। এমনি করেই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে গেল। কষ্টগুলো অনীক নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখে জীবনের লড়াইয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো। সত্যি বলছি কখনো একটিবারের জন্যও অনীক কাউকে কিছু বুঝতে দেয়নি যে, সে সকালে মেসের দাদাদের রান্না করে দিয়ে কলেজ এ আসতো বিনিময়ে ফ্রি খাওয়া আর যদি কখনো টিটি ধরতো বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়ার জন্য তখন সে এমন ভাব দেখাতো মনে হতো একজন বড়ো নেতা। কিন্তু সব কিছুই ছিল আড়াল করার কৌশল যা হয়তো অনীকের মতো মানুষদের পক্ষেই সম্ভব। অনীক শহরে থাকলেও তার মন পড়ে থাকতো তাঁর মা দিদির কাছে। দিদির বিয়েটা দিতে হবে মায়ের জন্য কিছু করতে হবে। কিন্তু কি করবে অনীক একটা ভালো চাকরি জোগাড় করতে তো হিমসিম অবস্থা। কোন রকমে একটি মার্কেটিং কাজ করে দিন চলে যাচ্ছে।যা মাইনে পায় যদি দুবেলা ঠিক করে খাই তাহলে তো বাড়িতে কিছুই পাঠানো যাবে না তাই সে একবেলা ভাত খেতো আর অফিসের ব্যাগে রেখে দিত মুড়ি আর গ্যাসের ঔষধ। অনীক খুব ভালো করেই জানে অফিসের চা কফিতে ক্ষিদে অনেকটাই মরে যায় তবে একটু গ্যাস হয় তার জন্য আছে সস্তা গ্যাসের ঔষধ।এমন ভাবে অনীকের দিন চলছিল হঠাৎ একদিন মেঘার সাথে অনীকের দেখা নন্দনের সাহিত্যের পরিবেশে। আস্তে আস্তে পরিচয়টা ভালোবাসায় পরিনত হয়।মেঘা মফস্বলের একটি ধনী পিতার একমাত্র আদরের মেয়ে। অনীক কোন ভাবেই মেঘাকে জীবনে জড়াতে চাই না কিন্তু দূরেও ঠেলে দিতে পারে না।মেঘা খুব শান্ত ভদ্র লাজুক স্বভাবের মেয়ে কথা খুবই কম বলে।ও শুধু অনীকের কথাই শুনতে চাই। মেঘা অনীক কে পাগলের মত ভালবাসে। অনীক ছাড়া কিছুই বোঝে না, অনীক কি খেয়েছে,পয়সা আছে কিনা কোন জামা পড়লে অনীক কে আরো সুন্দর লাগবে এই সব নিয়ে পড়ে থাকে। অনীক মেঘার এই ভালোবাসায় ভর করে ওকে ওর পরিবারের অমতে বিয়ে করে ফেলে। মেঘা বলেছিল অনীককে ওর মা দিদির পাশে মেয়ের মতো করেই থাকবে তারা যেন কোন চিন্তা না করে। অনীক ভরসা পেয়েছিল মেঘার নরম কথায়। কিন্তু যেই মেঘার বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেলো ঠিক তার পর থেকে মেয়েটি পুরো অচেনা মানুষ হয়ে গেল। মেঘা অনীক কে বলতো ওর বাবা মা কখনো এই ভিখারী ছেলে কে মেনে নিতে পারবে না কিন্তু অনীক ওদের মধ্যে তেমন কোন ইঙ্গিত খুঁজে পেল না যেমনটা মেঘা অনীক কে বলতো। বিয়ের পর মেঘার সাথে ওর বাবা মা কলকাতায় অনীকের ভাড়া বাড়িতে চলে এলো। অনীক এর মধ্যে একটা ভালো ব্যবসা শুরু করেছে ওর এক বন্ধুর সহযোগিতায়। রোজকার বেশ ভালো কিন্তু সে তো বেহিসাবি হতে পারে না কারণ চাতকের মতো চেয়ে বসে আছে মা দিদি পরিবার। ওরা ভাবে এবার যদি একটু শান্তি পাই। কিন্তু না সেই কপাল তাদের হয়নি। মেঘা জোর করে দামি তিন কামরার বাড়ি ভাড়া নিতে বাধ্য করালো অনীক কে মেঘার বাবা মা থাকবে বলে।সবসময় বাবা মা কে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকলো মেঘা। অনীক বলে যে একটা ছেলে এই বাড়িতে থাকে তা বোঝা যায় না। যখন তখন জোরজবরদস্তি করে ভালো ব্র্যান্ডের জামাকাপড় সোনা দানা আদায় করে নিতে শুরু করে দিল। অনীক কিছু বলতে গেলেই নোংরা ভাষায় গালাগালি করতো। অনীক কিছু বুঝতে পারতো না যে এই কি সেই মেঘা যার মুখ থেকে কথা বের হতো না। আজকে ওর কথার জোরে পাশের বাসা থেকে কমপ্লেন আসতে লাগলো কিন্তু ও দমার পাএ নয়। অনীককে কোন ভাবেই ওর মা দিদির সাথে যোগাযোগ করতে দিতো না, অনীক চুরি করে বাড়িতে টাকাপয়সা পাঠাতো। হায়রে ভাগ্য মানুষ যে এমন ও হতে পারে তা হয়তো মেঘাকে না দেখলে বিশ্বাস করা যেতো না। যখন যেটা চাই ঠিক তখনই তা দিতে হবে। অনীক বাড়িতে কোন কথাই বলতে পারত না অভাব অভিযোগ তো অনেক দূরের কথা। মেঘা সব কিছুই অনীকের থেকে নিত কিন্ত কখনো সে খুশি হতো না।সব সময় এটাই বলতো তুই কি দিয়েছিস তোর মতো ফালতু ছেলেকে বিয়ে করে জীবন টা নষ্ট করে ফেলেছি আমি।তোর বংশ খারাপ। আরো অনেক কিছু যা বলতে গেলেও মুখে লাগে। অনীক যে মেঘা কে বোঝাই নি তা কিন্তু নয় লক্ষ বার কোটি বার বুঝিয়েছে কিন্তু ও অনীকের কথাই শোনেনি কখনো।সবার সঙ্গে ও ভালো করে কথা বলে ভালো ব্যবহার করে শুধু অনীক হলো ওর চোখের বিষ। একটা বাচ্চা আছে আর আছে একটু উচ্চ বেতনের চাকরি তাই মেঘা এখন দিনে দুবার করে জামা-কাপড় আলমারি থেকে বের করে দিয়ে অনীক কে বলে যা হারামীর বাচ্চা ঘর থেকে বের হয়ে যা, তোকে দেখলে আমার শরীর জ্বলে রক্ত ফিনকি দিয়ে ওঠে।সবার মরণ হয় তুই কেন অক্সিডেন্ট করে মরিস না। অনীক নীরবে সহ্য করে, ফেলে দেওয়া জামাকাপড় গুলো আবারও তুলে রাখে কারণ ছেলেটা যে বাপের মতোই । বড়ো অসহায়।।

 





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা ১ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।