অনাথ - আমিরুল ইসলাম

28th April 2020 ছোটগল্প
অনাথ - আমিরুল ইসলাম


ছোটগল্প প্রতিযোগিতা - ০৭

অনাথ
আমিরুল ইসলাম
***************************
রাত তখন নয়টা দশটা হবে রাস্তার ধারে একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে বেঞ্চে বসে বসে পিডিএফ বই পড়ছিলাম। প্রায় রাতেই রাস্তার ধারে এমন ভাবে আড্ডা দিয়ে থাকি বন্ধুদের সাথে তবে আজ ব্যাতিক্রম কেউ নেই। সবাই নিজ নিজ বাড়ি ফিরে গেছে। একাই বসে থাকতে ভালো লাগছে না তাই ভাবলাম হাঁটতে হাঁটতে পড়া যাক। পরিবেশটাও দারুন পূর্ণিমা রাত্রি তবুও জোনাকির টিমটিম চোখে পড়ছে। কোনোদিন এভাবে রাতের বেলায় আগে কখনো হাঁটা হয়নি।ইচ্ছে করছে হেঁটেই যায় হেঁটেই যায় হঠাৎ চোখ পড়লো রাস্তার পাশেই দুটো বাচ্চার দিকে। তারা এত রাতে এখানে কী করছে ? কেনই বা এভাবে বসে আছে? অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।সব প্রশ্নের জবাব ওদের কাছেই পাওয়া যাবে তাই ওদের কাছে গেলাম। তারা দুজনেই জড়সড় হয়ে একটা চাদরের উপর কোনো রকম শুয়ে আছে। তারা ঘুমাই নি এখনও।তাদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে ওরা দুই ভাইবোন। ছোটো ছেলেটা বলছে দিদি রাত কখন ফুরাবে? ঠিক ওই সময়েই আমি ওদের কাছে গেলাম। আমাকে দেখেই তারা উঠে বসে পরলো তাদের চেহারায় একটা দারুন খুশির ঝলক পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। তাদের এমন ভাবে হওয়াতে আমি কিছুটা হলেও আশ্চর্য হয়ে ছিলাম। মেয়েটাকে বললাম
বাবু তোমার নাম কী ?
খুবই মিষ্টি গলায় বলল - আমার নাম...?
হুম তোমার নাম,
- রিংকী।
আচ্ছা তুমি আমাকে দেখে এত খুশি হলে কেন? তুমি কি আমাকে চেনো?
সে বলল জানো দাদা কোনো কোনো রাতে তোমার মত বড়ো লোকেরা এসে আমাকে অনেকসময় পাউরুটি বিস্কুট কলা দিয়ে যায়। আজ খুবই খিদে পেয়েছে..; তোমাকে দেখে ভাবলাম তুমি আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছ।
একটা সাত আট বছরের বাচ্চার মুখে এমন কথা শুনে আমার হৃদয়ে সজোরে একটা তীর ঢুকে যাওয়ার মত ব্যাথা হলো।লজ্জায় দুঃখে আমার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। কী বলবো কিছুই বুঝতে পারছিনা। মেয়েটি আবার বলল আচ্ছা দাদা গরীবের পেট কী খুবই বড়ো ? কেন এত খিদে পায়? তোমাদের তো কখনো শুনিনা খিদে পাওয়ার কথা! তোমরা কী খাও গো যে তোমাদের খিদে লাগে না?
পাশ থেকে ছোটো ছেলেটি বলছে দিদি রাত কখন ফুরাবে?কখন খাবো ? খুব খিদে লেগেছে পেট ব্যাথা করছে! ঘুম আসছে না। খুব জোর হলে ছেলেটার বয়স পাঁচ ছয় হবে।এখন থেকেই সে জীবন যুদ্ধে নেমে পড়েছে। পরিস্থিতি তাদের যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে এনেছে।
ছেলেটাকে কাছে ডেকে বললাম রাত আর বেশি দেরি নেই এই একটু পরেই সকাল। আচ্ছা বাবু রাতে কী ভয় লাগে? ছেলেটি কোনো উত্তর দিল টা শুধু চোখে চোখে তাকাচ্ছে। আমি পারছি না তার করুণ ওই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে। রিংকী বললো জানেন দাদা সেই সকালে খেয়েছি
খুব খিদে লেগে আছে। ও ছোট্ট কিছু বুঝে না.. ও ভাবছে সকাল হলেই খেতে পাবো তাই সকালের অপেক্ষা করছে। ছেলেটি কে এত খিদে লেগেছে যে সে কান্না করতে লাগলো।
রিংকী আমাকে আবার জিজ্ঞেস করছে
আচ্ছা দাদা গরীবের কী চোখে জল বেশি থাকে? তারা এত কান্না করে কেন ? আমাদের পেট অনেক বড়ো তবে খাবার নেই, আমাদের চোখে অনেক জল তবে মুছার কোনো মানুষ নেই। মানুষ এত নিষ্ঠুর কেন দাদা ? আমাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে গেছিলো আমার বড়োলোক কোনো মা বাবা। এক পাগলী আমাকে ওখান থেকে তুলে বড়ো করলো। তার মুখেই শুনেছি, এই ভাইকে দেখছ না? একেও কে ফেলে গেছিলো ওই ডাস্টবিনের ময়লা আবর্জনার সাথেই। ওই পাগলি মা আমাকে একটা ভাই এনে দিলো আজ পাগলিমাটা নেই। সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গেছে। সরকারী দুটো লোক তার লাশটা নিয়ে গেছে।আমাদের দিকে তারা ফিরেও তাকালো না, এভাবেই থেকে গেলাম রাস্তায়।অনেক ভদ্র লোক আমাদের প্রায়ই খাবার দিয়ে যায়।খুব ভালো তারা,অন্তত আমার মা বাবার থেকে তো ভালো।তারা জন্ম দিয়েই আমাকে নোংরা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে।
একটা বাচ্চা মেয়ের এত অদ্ভুত বেদনাদায়ক প্রশ্ন থাকতে পারে এটা আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। রিংকী একের পর এক কথা বলেই যাচ্ছে, তার কথা শুনতে পাচ্ছি না আর। মাথার মধ্যে ঝিঝি পোকা ডাকছে। কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।কান্না রুখতে পারছিনা বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসছে। রাস্তার পাগলিটাও আজ মা হতে হতে মারা গেছে । রাস্তার পাগলীটা কিভাবে অন্তসত্ত্বা হয় ?

রাস্তার এদিক ওদিক দেখলাম কোনো দোকান খোলা নেই। আমার মাথায় একটা দোকানের কথা হঠাৎ মনে পড়লো অনেকদিন আগে একবার ওখানে খেয়েছিলাম তাদের দোকান অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। রিংকিকে বললাম এখান থেকে হেঁটে আট দশ মিনিট লাগবে মনে হয় যাবে আমার সাথে এক জাগা?
খুব স্বাভাবিক ভাবে ধির গলায় বলল- কোথায় ?
চলো আমার সাথে বলেই বাবুটাকে আমি কোলে তুলে নিলাম। জীবনে এত সুখ এত আনন্দ কখনো হয়নি যতটা আনন্দ এদের দুজনকে রেস্তোরাঁতে নিয়ে গিয়ে হলো। মেনু কার্ড থেকে যেকোনো খাবার পছন্দ করতে বললাম রিংকিকে কিন্তু সে এক কথায় বললো দাদা গরীবের পেট এক থালা ভাত হলেই জুড়িয়ে যাবে। ভাতে হাত দিয়েই যেন তারা স্বর্গের সুখ অনুভব করলো। খাওয়া শেষ করে ওদের আমার বাড়ি নিয়ে গেলাম। রাত ফুরিয়ে এলো আর মাত্র ঘন্টা খানেক। বেঁচে থাকা যে এত কঠিন,বাঁচতে গেলে ভাতের যে কত মূল্য রিংকিকে না দেখলে জানতেইপারতাম না।
পরের দিন সকালে অনাথ আশ্রমে ফোন করে এড্রেস বলে দিয়েছিলাম। দশটা নাগাদ দুজন মানুষ এসে তাদের নিয়ে চলে গেলো।
তারা ওখানে অনেক সুখে ,খুশিতে আছে, প্রায়ই তাদের দেখতে যায়। আমাকে দেখে তারা ছুটে এসে গলা জড়িয়ে ধরে।


∆এমন অনেক রিংকি আছে যাদের এক মুঠো ভাতের জন্য পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছে. পারলে তাদের সাহায্য করুন, দেখবেন ওদের খুশি দেখে আপনি কান্না ধরে রাখতে পারবেন না।

নাম- আমিরুল ইসলাম
পিতা- নাইমুল হক
গ্রাম- বাবুপূর
ডাকঘর- গঙ্গপ্রসাদ
থানা- রঘুনাথ গঞ্জ
জেলা - মুর্শিদাবাদ
পিন-৭৪২২১৩





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা à§§ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।