সর্ষে ইলিশ - পাপিয়া মণ্ডল

27th April 2020 ছোটগল্প
সর্ষে ইলিশ - পাপিয়া মণ্ডল


ছোটগল্প প্রতিযোগিতা - ০৫

গল্প - সর্ষে ইলিশ
লেখা - পাপিয়া মণ্ডল


আদ্যপান্ত ভদ্রলোক বলতে যা বোঝায়, শশীভূষণ বাবু ঠিক তাই। খুব শান্ত-শিষ্ট, মিতভাষী। মধ্য চল্লিশের, মাঝারি মাপের বেশ গোলগাল চেহারার অধিকারী উনি। মাথার মাঝে একটা মস্ত টাক। কিন্তু আশেপাশের চুলগুলোর উনি মাত্রাতিরিক্ত যত্ন নেন।পকেটে একটা চিরুনি ওনার থাকবেই। পাড়ায় শশীদা,শশীকাকু বলেই উনি পরিচিত। সবাই ওনাকে খুব সমীহ করেন। আর করবে নাই বা কেন, সরকারি দপ্তরে উঁচু পোস্টে চাকরি করলেও কোনোরকম অহংকার নেই । পাড়ার যে কোনো উন্নয়নে, পুজোতে সবসময়ই মোটা অঙ্কের চাঁদাও দেন। সবার সুখে-দুঃখে খোঁজ নেন। স্ত্রী আরতি আর একমাত্র মেয়ে সুনৃতাকে নিয়ে ওনার সংসার।
আরতি দেবীও খুবই ভালোমানুষ। চল্লিশ ছুঁই -ছুঁই, ছিমছাম ,সাদামাটা , ঘরোয়া গৃহবধূ। সংসার, স্বামী, মেয়ে আর পুজো- আচ্চা নিয়ে ওনার ব্যস্ততা সারাদিন। শুধু মাঝে মাঝে স্বামী আর মেয়ের উপর একটু চিৎকার-চেঁচামেচি করেন।
সুনৃতা দেখতেও মিষ্টি আর স্বভাবেও তাই।
সবে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। পড়াশোনায়ও খুব ভালো ও। ওর বাবা-মা ওকে খুবই ভালোবাসেন।

শশীভূষণবাবু খুব খাদ্যরসিক মানুষ। ছুটির দিনে উনি বাজারে যান আর ব্যাগ ভর্তি করে সব্জি, মাছ, মাংস নিয়ে আসেন। আরতি দেবী মাঝে মাঝেই একটু বিরক্ত হন। এতো বাজার গুছিয়ে, ধুয়ে রান্না করতে উনি হিমসিম খেয়ে যান। মাছের মধ্যে ইলিশের প্রতি তীব্র দূর্বলতা আছে শশীভূষণবাবুর। রাঢ়বঙ্গের মফস্বলে বাড়ি। তাই বছরে বার দুয়েক দিন কয়েকের জন্য দেখা মেলে এই রূপোলী রানীর। উনি তখন পারলে অফিস ফেরতা একবার ঢুঁ মেরে আসেন মাছ বাজারে। এমনই এক বর্ষার সন্ধেতে, প্রমাণ সাইজের একটি ইলিশ মাছ কিনে,খোশমেজাজে বাড়ি ঢুকলেন।
আরতি দেবী একটু গজগজ করে, ওনাকে চা-জলখাবার দিলেন। তারপর মাছ কেটে ,ধুয়ে ফ্রিজে রাখলেন।
রাতে খেতে বসে শশীভূষণবাবু বললেন-"এখন এক পিস করে ভাজা পেলে মন্দ হতো না।"
আরতি দেবীর কটমটে চাহনিতে একদলা ভাত গিলে ইচ্ছেটাকে ভিতরে চালান করলেন।

পরদিন সকালেই পেটে তীব্র ব্যথা। ওনার পেট খারাপ। বারকয়েক টয়লেটে গেলেন। এদিকে রান্নাঘর থেকে সর্ষে -ইলিশের গন্ধ ভেসে আসছে। গিন্নিকে কিছু জানালেন না। মেয়েকেও না।
একটা বোতলে ও.আর.এস গুললেন । ওষুধের বাক্স থেকে মেট্রোজিলের স্ট্রিপটা বের করলেন। অফিসে ফোন করে বললেন-"আজ অফিসে আসবো না। শরীরটা খুব খারাপ।"
এরপর স্ট্রিপ থেকে একটা ট্যাবলেট সবে হাতে নিয়েছেন, অমনি সুনৃতা ঘরে এসে ওনাকে ওষুধ হাতে দেখে বললো--- "কি হয়েছে বাবা? ওষুধ খাচ্ছো কেন?"
উনি বললেন----"তেমন কিছু না।"
ও তখন তাড়াতাড়ি ওর মাকে ডাকলো। শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে এসে দেখলেন, হাতে ওষুধ নিয়ে দাঁড়িয়ে উনি।
আরতি দেবী স্ট্রিপটা নিয়ে, দেখে বললেন---"সেইজন্য এতোবার করে বাথরুমে যাচ্ছো? তোমার আজ আর ইলিশ খেয়ে কাজ নেই, কাঁচা কলা, পেঁপে দিয়ে চারাপোনার পাতলা ঝোল করে দিচ্ছি।"
ধপ করে বিছানায় বসে পড়লেন শশীভূষণবাবু। যেন হঠাৎ করে বাজ পড়লো ওনার মাথায়। হাতে ধরা ওষুধটা জল দিয়ে গিলে দিয়ে বললেন----"দেখো, পেট খারাপ যখন তখন, সারাবছরই হতে পারে। ওষুধ খেলেই সেরে যায়। কিন্তু ইলিশ তো আর তা নয়! আমি অফিস যাবো না। ও .আর.এস খাবো, ওষুধ খাবো। দরকার হলে, হাসপাতালেও যেতে পারি। কিন্তু, কোনোমতেই ইলিশের বদলে চারাপোনার পাতলা ঝোল খাবো না।"
ওনার কথা শুনে আরতি দেবী আর সুনৃতার চোখ কপালে উঠলো। ওরা হাসবে না কাঁদবে তা বুঝতে পারলো না।
**********
পাপিয়া মণ্ডল





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা à§§ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।