কথাকলির একটি ছোটগল্প - মানবী

24th April 2020 গল্প
কথাকলির একটি ছোটগল্প - মানবী


মানবী

কলমে - কথাকলি
গ্যাস মুছে, রান্নাঘর পরিস্কার করে সব্জির ঝুড়িটা নামিয়ে রাখলো রান্নাঘরের নীচের তাকে। আজকের মতো রান্না শেষ। ঘড়িতে তখন মাত্র সকাল ন'টা। মিতা বৌদির বাড়িতে এবেলা যেতে হবে না। ওপরে চারতলায় মাসীমার রান্নাটা হলেই আজকের মতো এদিকের কাজ শেষ। মঞ্জু বুকের মধ্যে রাখা খুচরো পয়সার ছোট্ট ব্যাগের থেকে পয়সা বার করে অটোরিকশার ভাড়া দিলো। -"কি মঞ্জুরাণী মনে ওচ্চে বসন্তো এসসে গ্যাচে।" মঞ্জু অটোওয়ালা শ্যামলের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে সামনে গলির দিকে এগিয়ে যায়। সাড়ে বারোটায় রিজো আসবে স্কুল থেকে। ওর খাবার গরম করে, তারপর স্নানের ব্যাবস্থা করে দোতলায় বড়োকাকার ঘরে দুপুরের খাবার দিয়ে তবে অন্য কাজ। মঞ্জু হন্ হন্ করে এগিয়ে যায়। বসাকদের বাড়িতে এইসময় খুব জোরে টিভি চালায়। নিস্তব্ধ দুপুরে সারা পাড়া কাঁপিয়ে চারিদিক গম্ গম্ করে শোনা যায় সিরিয়ালের জবা, বকুল, শ্যামা,পারুলদের কথা।ওই বাড়ির বড়োমা দুপুরে খেতে বসে বাংলা সিরিয়াল দেখা চাই। মঞ্জু দ্রুত হাতের কাজ সারতে থাকে। ছেলেটা ইস্কুল থেকে এই এলো বলে।
ভিজে কাপড়গুলো ছাতে মেলে, শুকনোগুলো হাতে করে নিয়ে নীচে নামার সময় চোখাচোখি হয় ছোড়দার সাথে৷ বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। ছেলেটার চোখে কি আছে কে জানে, চোখে চোখ পরলেই মঞ্জুর এমন হয়। বুকের কাপড়টা ভালো করে টেনে নেয়। বাড়ি শুদ্ধু সবাই এখন ঘুমাচ্ছে। এইসময় তিনতলায় নিরিবিলিতে ছোড়দা ছবি আঁকে। মঞ্জু জানে এখন এক কাপ চা পেলে খুব খুশি হবে ছোড়দা, কিন্তু মঞ্জুর নিজেকে নিয়ে বড্ড ভয়। ভেতরের অনুচ্চারিত চাপা আবেগ যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে!
"তোর হাত দুটো এতো শক্ত কেনো রে মঞ্জু, ব্যাটাছেলেদের মতো?" মঞ্জু জবাব দেয়, -"পাঁচবাড়িতে কাজ করে গো। আমি কি আর তোমাদের মতো কপাল করে এসেছি সোনাবৌদি।" তিস্তার উন্মুক্ত পিঠ বেয়ে নেমে নিতম্ব,উরু পায়ের পাতা, নিটোল দুই বাহু সবজায়গায় বিদ্যুৎগতিতে খেলা করে যায় মঞ্জুর পুরুষ্টু হাত। নিপুণ দক্ষতায় বডি মাসাজ অয়েল দিয়ে দ্রুত মালিশ করতে থাকে সে। প্রতিদিন সন্ধ্যে ছটায় অন্যান্য বাড়ির কাজ সেরে চলে আসে তিস্তার বাড়ি। সপ্তাহে একবার মালিশ নেয় বৌদি, এটা মঞ্জুর উপরি পাওনা। হাতে হাতে নগদ তিনশো টাকা পায়। সব কাজ হয়ে গেলে একেবারে সন্ধ্যের জলখাবার আর রাতের ভাতটুকু করেই আটটার মধ্যে বেড়িয়ে পরে মঞ্জু। পৌনে নয়টার ক্যানিং লোকাল ধরে অবশেষে বাড়ি।
সন্ধ্যেবেলা ফেরার পথে আবার অটোওয়ালা শ্যামল ধরলো - "এই মঞ্জু শোন না। এতো রাগ করচিস্ ক্যানো বাবা। চল্ না কাল সিনেমা দেখতে যাবি? ম্যাটিনি শো যাবি ? অন্ধকার গলির বাঁকে দাঁড়িয়ে শ্যামল ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে। মঞ্জুর কাঁধে হাত রেখে আস্তে করে অন্য হাত দিয়ে আকর্ষণ করে নিজের দিকে। গদোগদো প্রেম ভাব দেখায়। মঞ্জু এক ঝটকায় হাত সরিয়ে দেয়। ঘুরে গিয়ে হাতের কনুই দিয়ে পেটের কাছে একটা গুঁতো। "সত্যি মাইরি তুই আর জন্মে ছেলে ছিলিস্ নাকি রে, কি প্যাঁচ কষে দিলি গুরু। বাব্বা তোর সাতে কে পেম করবে রে শালা বোক্কা চো.....
মঞ্জু কাউকে বলতে পারেনা সে নারী না পুরুষ। ডানলপের হিজরে বস্তি থেকে পালিয়ে এসেছে আজ বছর দশ হয়ে গেছে। জন্ম থেকেই ওখানে ছিলো। গুরুমা কোলেপিঠে করে মানুষ করেছিলো। বস্তিবাড়িতেই যেটুকু সম্ভব পড়াশোনা শিখিয়েছিলো। মঞ্জুর মতো এমন সুন্দর নারীসুলভ কোমল গঢ়্ন খুব একটা দেখা যায় না। সকলের নয়নের মণি ছিলো সে। চোদ্দ বছর বয়সের পর থেকেই হাতে তালি মেরে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু হলো। মনখারাপ হয়ে যেতো ওর ভীষণ। একি একটা জীবন নাকি ছিঃ। একদম পোসাতো না এসব মঞ্জুর। তখন থেকেই ভেবে রেখেছিলো সুযোগ পেলেই চলে যাবে। তারপর একদিন বেপরোয়া হয়ে বেরিয়ে পরলো অজানার উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে আজ এতোবছর কেটে গেছে। কোলকাতায় লোকের বাড়িতে কাজ করে, লেখাপড়া আর হলো না। তবে একার পেট ভালোই চলে যায়। কিন্তু বোঝে না মঞ্জু, নারী নাকি পুরুষ, কি হতে চায় এই অবাধ্য মনটা। শরীরটা বলে নারীকথা আবার বিদ্রোহ করে পুরুষমন। ভালোবাসার চোরাচাহনিতে ধরা দিতে চায় নারীমন অন্যদিকে দংশন করে পুরুষবিবেক। অন্য নারীর উন্মুক্ত শরীর নিয়ে নিঃসঙ্কোচে নিত্য অবলীলায় খেলা করে তার নারীসুলভ আবেগ, তারই সাথে আবার পুরুষালী অশ্লীলতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় সেই নারী স্বত্তা। কাকে বোঝাবে! কাকে বলবে! কার কাছে একটু নির্ভরতার আশ্রয় পাবে! পরিশেষে কি বলে পরিচয় দেবে নিজেকে সে নিজেই তো জানেনা! মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা দ্বিধাগ্রস্ত সঙ্কোচ নিয়ে দিনেরাতে সে তাড়িত হয়।
দ্রুত হাতে রান্না সেরে নেয় মঞ্জু। আবার একটা কর্মব্যাস্ত দিনের শুরু। এগারোটা বেজে গেছে, সকালের জলখাবার দিতে হবে। এইসময় তিস্তা বাড়ি থাকেনা। টেবিলে পরোটা আলুর তরকারি দিয়ে খেতে ডাকে দাদাবাবুকে, তারপর মঞ্জু চা দেয়। আজ সে বেশ তরিজুত করে চা বানিয়েছে। চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখে টেবিলে। দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে, আর কিছু লাগে যদি। প্রশংসার চোখে তাকায় দাদাবাবু। ফিরে এসে রান্নায় মন দেয় মঞ্জু। কিছুক্ষণ পরে টের পায় একটা সবল পুরুষালী হাত দেহের পিছন থেকে লেহন করছে মঞ্জুর কাঁধ, পিঠ, উন্মুক্ত বাহু, নিতম্ব। মঞ্জুর পুরুষস্বত্তা এক ধাক্কায় সরিয়ে দিতে চায় ওই নোংরা হাতটাকে কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত, বেসামাল নারীমন পারেনা। ভিতরের ঘর থেকে মামণির গোঙানির মতো একটা অস্পষ্ট চিৎকার ভেসে আসে। মঞ্জু তরিৎ গতিতে সরে এসে মামণির খাবারটা নিয়ে ভিতরের ঘরের দিতে পা বাড়ায়। সকালের এইটুকু সময়ের জন্য তিস্তা মঞ্জুর ভরশায় মামণিকে রেখে যায়। মামণি ওদের একমাত্র মেয়ে চোখে দেখতে পায় না, ভালো করে কথাও বলতে পারেনা। মামণি জানে সকালের এইসময়ে মঞ্জুমাসি ওর একমাত্র ভরশা, আরেকটু পরেই তো মা চলে আসবে। মঞ্জু মামণির গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করে, অতি যত্নে খাবার খাইয়ে দেয়। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে মঞ্জুর চোখের কোণায় জল টল টল করে ওঠে। পরিপূর্ণ মাতৃত্বের স্বাদ পেয়ে কানায় কানায় পূর্ণ আজ তার নারীদেহ, নারীমন, অনুচ্চারিত অব্যক্ত এক নারীস্বত্তা। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপভোগ করে মঞ্জু এই ক্ষণিকের মাতৃত্বের স্বাদ। পারিপার্শ্বিক সমাজের নোংরা লোলুপতার থাবা অগ্রাহ্য করে সে তার কোমল নারীত্বের পরিপূর্ণ অনুভুতিটুকু উপভোগ করে এভাবেই। এখানেই তার অর্ধনারীশ্বর দ্বৈত চরিত্রের মানবী স্বত্তার সার্থক উন্মোচন।

কথাকলি
(দেবযানী রায় ঘটক)





Others News

একটি সুন্দর গল্প - চুল

একটি সুন্দর গল্প - চুল


অনেক ক্ষণ ধরে পুরোনো ফোন নিয়ে ঘাঁটছিলাম। বিরক্ত হয়ে স্ত্রী বললেন - "এবার রাখো। তোমার মেয়ে খাবার নিয়ে তখন থেকে বসে আছে। খেতে চাইছে না। একটু দেখো।"

অগত্যা। গিয়ে দেখি একতাল আতপ চাল আর ঘি মাখানো ভাত নিয়ে সে বিরসবদনে বসে। খুব রাগ হল তার মা এবং আমার নিজের মায়ের প্রতি। সত্যি তো, এমন বিস্বাদ খাবার খেতে কেন যে জোর করে.. !

মাাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম- "মা রে, দুটো খা। অন্ততঃ আমার কথা ভেবে।" মন্ত্রের মত কাজ হল। টলটল চোখে সে বলল - "বাবা, খাচ্ছি। কিন্তু আমার একটি চাওয়া আছে তোমার কাছে। দেবে?"

কোন বাবা তার সন্তানকে না দিয়ে পারে! বললাম - "নিশ্চয় মা। কিন্তু কম্পিউটারের মত দামী কিছু চেয়ে বসিস না। এখনি অতটা সামর্থ্য তো নেই।"

মেয়ের চোখ থেকে এবার মুক্তোদানা ঝরে পড়ল। "আমি কি তোমায় বিব্রত করতে পারি?" - প্রশ্ন সে দৃষ্টিতে। আমি লজ্জিত হলাম।

খাওয়া শেষ করে সে বলল - "এবার বলি?"

তার ঠাকুমা, মা এবং আমার সপ্রশ্ন দৃষ্টি এখন তার দিকে। সে ধীরে ধীরে বলল - "আমি ন্যাড়া হতে চাই।"

ছুঁচ পড়লে শোনা যাবে এমন নীরবতা ভাঙ্গল আমার স্ত্রীর হুঙ্কারে - "মাথা খারাপ হয়েছে তোর। মেয়েরা কেউ ন্যাড়া হয়..!"
আমার মা রেগে গিয়ে বললেন - "যত্তোসব পাগলামি। আমাদের পরিবারে এমন অনাসৃষ্টি কেউ কখনও করে নি। এবার টিভি দেখে বিলেতের অন্ধানুকরণ।"

পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠছে দেখে সামলাতে চাইলাম - "মা রে, তোর ওমন গোছাভরা সুন্দর চুলগুলো কেটে ফেলবি? কিন্তু কেন?"

শান্ত কিন্তু প্রত্যয়ী কণ্ঠে মেয়ে বলল - বাবা, তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে আমায়। তুমি নিজেই তো কতবার আমাকে সত্যবাদী হরিশচন্দ্রের ঘটনাটা বলেছ। শিখিয়েছ - সত্যবাদীতার জন্য জীবনপণ করা যায়। তাহলে এখন নিজের কথা রাখতে চাইছ না কেন?"

জয় হল তার। একমাথা রেশমী চুল মুড়িয়ে সন্ন্যসিনীর মত দেখতে হল তাকে। আমার কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছিল। তার ঠাকুমা, মা তো কথা বলাই ছেড়ে দিল আমার সঙ্গে মেয়ের এমন বিচিত্র আব্দারে তাল দেবার জন্যে।

প্রতিদিনকার মত তাকে স্কুলে ছাড়তে গেলাম। আমার আদরের ন্যাড়ামাথা স্কুলের গেটের দিকে এগোচ্ছে। ঠিক সেই সময় একটি গাড়ি থামল। শুনলাম - আমার কন্যের নাম ধরে কেউ ডাকছে - "সিধুজা।"

মেয়ে থমকাল। তার মুখে অনাবিল হাসি। দেথলাম গাড়ি থেকে নামলেন এক ভদ্রমহিলা আর ছোট্ট একটি ছেলে। তার মাথাটিও ন্যাড়া। আমি ভাবলাম - সিধুজা তবে একা নয়, এটাই নতুন ফ্যাশন!

অচীরেই আমার ভুল ভাঙ্গালেন ছেলেটির মা। বললেন - "বিরলতম অনুূভূতিপ্রবণ আপনার মেয়ে। গতসপ্তাহে আমাদের বাড়ি এসেছিল আমার ছেলেকে দেখতে। ওর কেমোথেরাপি চলছে। ফলে সব চুল ঝরে গেছে। স্কুলে গেলে পাছে বন্ধুরা পিছনে লাগে তাই আসতে রাজী হচ্ছিল না। তা শুনে আপনার মেয়ে সিধুজা তখনই বলেছিল - স্কুলে আসতে। মাথায় চুল না থাকার কারণে পিছনে কেউ লাগবে না। এখন বুঝলাম সমাধানটা। স্কুলের সেরা ছাত্রী নিজেই যদি মুণ্ডিতমস্তক হয়, আমার ছেলেকে কে আর রাগাবে..!!"

আমি নির্বাক। দেখলাম আমার সিধুজা, মহাপ্রাণ সিধুজা তার বন্ধুর হাতটি ধরে গেট পেরোল। মাথা থেকে তার পদপ্রান্তে এসে আমার দৃষ্টি ঝাপসা হল।